কোরবানির পশু পর্যাপ্ত আতঙ্কে খামারি ও কৃষকরা

আপডেট : ২৬ জুন ২০২০, ০৬:২১ এএম

কোরবানির জন্য পর্যাপ্ত পশু সরবরাহ করার সক্ষমতা অর্জন করার পর করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কে আছেন খামারি ও প্রান্তিক কৃষকরা। কারণ বৈশ্বিক এই মহামারী দেশের ভেতরে যেভাবে বিস্তৃত হচ্ছে তাতে সামনের দিনগুলোতে লকডাউন বা সামাজিক দূরত্ব রক্ষাসহ অন্যান্য বিধিনিষেধ বাড়তেই থাকবে। এসব বিধিনিষেধের মধ্যে ক্রেতারা কতটুকু সাড়া দেবেন তা নিয়েই তাদের দুশ্চিন্তা। পর্যাপ্ত ক্রেতার অভাবে বাজার নাও জমতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

এদিকে করোনাভাইরাসের মধ্যেই স্বাস্থ্যবিধি মেনে রাজধানীসহ সারা দেশে কোরবানির পশুরহাট আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। বিভিন্ন সিটি করপোরেশনসহ পৌরসভা এসব হাটের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার সারা দেশের কোরবানিযোগ্য পশুর তথ্য সংগ্রহ করেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২০ লাখ। এর মধ্যে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও অন্যান্য পশুর সংখ্যা গতকাল পর্যন্ত আলাদা হিসাব  করার সময় পায়নি অধিদপ্তর। আগামী রবিবার এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য মৎস্য ও পশুপালন মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (খামার) ড. এ বি এম খালেদুজ্জামান। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘গত বছর কোরবানিযোগ্য গবাদিপশুর সংখ্যা ছিল ১ কোটি ১৮ লাখ। এবার ১ কোটি ২০ লাখ কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে। সারা দেশে এই মুহূর্তে ৫ লাখ ২২ হাজার গবাদি পশুর খামার রয়েছে। এসব খামারে পশুগুলোকে কোরবানি উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। পশুদেরকে শেষ মুহূর্তের পরিচর্যা করা হচ্ছে।’

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আবদুল জব্বার শিকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত দুই-তিন বছর আমাদের কোরবানির পশু অন্য দেশ থেকে আনতে হচ্ছে না। গত বছরও ১০ লাখের মতো পশু অবিক্রীত ছিল। আমরা গবাদিপশুতে একটা স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে পেরেছি। এবারও পশু চাহিদার চেয়ে বেশিই আছে। পশু কীভাবে বিক্রি হবে বা বিক্রি ব্যবস্থাপনা ঠিক করার দায়িত্ব বিভিন্ন সংস্থার। রাজধানী ঢাকায় বাজার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব দুই সিটি কপোরেশনের। আমরা সিটি কপোরেশনের ঠিক করা হাটে গবাদিপশুর স্বাস্থ্যজনিত চিকিৎসা নিশ্চিত করে থাকি। এবার করোনারভাইরাসের বিস্তারের কারণে চিকিৎসার হার বাড়ানো হবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে গরু বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ পশু কোরবানি ও জীবন রক্ষা দুটিই জরুরি। আশা করি সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়টি মাথায় নিয়েই কাজ করবেন।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনাভাইরাসের কারণে সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব চলছে। বিপাকে পড়েছে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি। শহর বা গ্রামাঞ্চলে সর্বত্রই কয়েকজন মিলে (শেয়ারে) কোরবানি দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। করোনাভাইরাসের কারণে নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই কোরবানি দিতে পারবেন না। এছাড়া দলে দলে প্রবাসীরা দেশে ফিরে আসছেন। যারা বিদেশে আছেন তারাও রয়েছেন টানাটানির মধ্যে। এসবের প্রভাব পড়বে কোরবানির পশুর বাজারে। এতে কোরবানির পশু বিক্রি কমে যেতে পারে। এতে পর্যাপ্ত গরু থাকার পরও দাম পাবেন না খামারিরা। এমন উদ্বেগের মধ্যে কোরবানিযোগ্য পশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন দেশের গরু খামারি ও প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক।

কিশোরগঞ্জ জেলার খামারি মনজিল মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা বছর গরু লালন-পালন করি কোরবানির জন্য। এটাই আমাদের ব্যবসায়িক সিজন। আমাদের সব বিনিয়োগ এই সিজনকে কেন্দ্র করেই। এ সময় যদি বাজার ভালো না থাকে তাহলে পথে বসে পড়তে হবে। এবার ১৪টি বড় ও মাঝারি সাইজের গরু বিক্রি করব। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এসব গরুর ভালো দাম পাব কি-না বুঝতে পারছি না।’

গাজীপুরের কালীগঞ্জের মোক্তারপুরের খামারি আহমদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে জানান, তিনি গত কোরবানির ঈদের পরই ২০টি ছোট গরু কিনেছেন। এর মধ্যে একটা মারা গেছে। অবশিষ্ট ১৯ গরু নিয়ে তিনি উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। সবচেয়ে বড় উৎকণ্ঠা হচ্ছে করোনাভাইরাস। ঈদ আসতে আরও এক মাসের বেশি সময় আছে। এ সময় করোনাভাইরাস বাড়বে না কমবে তা তিনি বুঝতে পারছেন না। এটা বোঝার জন্য তিনি প্রতিদিন দুপুর আড়াইটায় টেলিভিশনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিং শোনেন বলে জানিয়েছেন। খামারি আহমদ হোসেন আরও জানান, সেখানে মৃত্যুর হার বাড়ার খবর শুনে তিনি আঁতকে ওঠেন। জুলাই মাসে যদি পরিস্থিতি আরও খারাপ হয় তখন সরকার কঠোর লকডাউন দেবে বলে তার ধারণা। কিংবা রেড জোন ঘোষণা করলেও তার গরু বিক্রির বাজার বসবে না বলে তিনি মনে করেন। আহমদ হোসেনের দ্বিতীয় উৎকণ্ঠা গরুর ডাকাতরা এবার বেশ তৎপর। বিভিন্ন খামারে গরুচুরি হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। এ কারণে সারা দিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করলেও সারা রাত তিনি গরু পাহারা দেন। কীভাবে গরুগুলো নিয়ে আগামী এক মাস পাঁচ দিন সময় পার করবেন তা নিয়ে বেশ চিন্তিত বলেও জানান আহমদ হোসেন।   

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দেশ মাংসের চাহিদায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পর থেকে ভারতীয় গরুর অনুপ্রবেশ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। আগে প্রতি বছর ২০ থেকে ২৫ লাখ ভারতীয় গরু আসত। ২০১৯ সালে সেটা এক লাখের নিচে নেমে এসেছে। গত বছর সারা দেশে কোরবানিযোগ্য ৪৫ লাখ ৮২ হাজার গরু-মহিষ, ৭৮ লাখ ছাগল বা অন্যান্য পশু ছিল।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে যে পরিমাণ গরু-মহিষ-ছাগল রয়েছে তাতে বাইরের কোনো গরুর দরকার নেই। চাহিদা না থাকার কারণে গত বছর কোরবানির হাট থেকে এক-দশমাংশ গরু ফেরত নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোরবানিতে লাগে ১ কোটি ২০ লাখ প্রাণী। আমাদের আছে দেড় লাখ। কাজেই বাইরের কোনো প্রাণী আমাদের দরকার নেই।’

খামারিরা আশঙ্কা করছেন, কারোনাভাইরাসের কারণে দাম কম পাওয়ার। এ বিষয়ে সরকারের করণীয় কী জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী বলেন, ‘খামারিরা যেন ভালো থাকেন সেই চেষ্টা আমরা করছি। গোখাদ্যের ওপর একটা সাবসিডি দেওয়ার কথা আমরা চিন্তা করছি। তাদের কোনো প্রাণী অসুস্থ হলে যেন চিকিৎসা পায় এবং প্রাণী পরিবহনে যেন কোনো সমস্যা না হয় তা দেখছি। যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের আমরা স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা এবং বেকারদেরকে কর্মমুখী করার জন্য প্রাণিসম্পদ এবং মৎস্য খাতের কোনো বিকল্প নেই। কাজেই রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই খাতকে সর্বোচ্চ পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া প্রয়োজন।’  

ঈদুল আজহার পশুর সংখ্যা নিরূপণ, কোরবানির হাটবাজারে স্বাস্থ্যসম্মত পশুর ক্রয়-বিক্রয়, করোনাভাইরাসে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশুর হাট বসানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে আগামী সপ্তাহে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব রওনক মাহমুদ বলেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে পূর্ণাঙ্গ পশুর তালিকা পাওয়ার পর আন্তঃমন্ত্রণালয়ে বৈঠক হবে। সেখানে বিস্তারিত আলোচনা হবে। তার মতে, ঈদের আগে করোনা পরিস্থিতি উন্নতি না হলে কোরবানির পশুর ওপর একটা প্রভাব পড়বে। তারপরও ভারত থেকে কোনো পশু আসবে না এটা খামারিদের জন্য সুখবর।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত