বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি অনলাইন পাঠদানে প্রস্তুত

আপডেট : ২৭ জুন ২০২০, ১২:০৬ এএম

অনেকেই বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন অনলাইন ক্লাস নিচ্ছে না বলে প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ আবার অনলাইন ক্লাস না নেওয়ার জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থাকেও দায়ী করছেন। আমরা জানি, অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার জন্য যেসব জিনিস সবচেয়ে জরুরি, সেগুলো হলো : ১. ল্যাপটপ/ট্যাব/ডেস্কটপ, ২. শক্তিশালী ইন্টারনেট কানেকশন ৩. জুম-এর মতো সফটওয়্যার। প্রথম দুটি থাকলেই তৃতীয়টি পাওয়া কোনো ব্যাপার নয়। এখন প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের বাস্তবতায় আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রের কি প্রথম দুটি আছে? দুটির মধ্যে একটি থাকলে কিন্তু হবে না। জুম-এ ক্লাস করার জন্য শক্তিশালী নেটওয়ার্ক কি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আছে? আর থাকলেও সব ছাত্রছাত্রী কি এর ব্যয়ভার বহন করতে পারবে? এগুলো থাকলেও শিক্ষকদের যে প্রযুক্তিগত সহায়তা দরকার, বিশ্ববিদ্যালয় কি সেই সাপোর্ট সিস্টেম গড়ে তুলতে পেরেছে? সবকিছু শুরু করার আগে যে প্রস্তুতিমূলক হোমওয়ার্ক লাগে, তা কি করা হয়েছে?

দেশের অনেক শিক্ষার্থী আসে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার থেকে। অনেকেই এত দরিদ্র পরিবার থেকে এসেছে যে, পিতা-মাতার পক্ষে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার মতো আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা নেই। উল্টো তারাই সন্তানের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য কামনা করে এবং সন্তান যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পরিবর্তে সংসারের হাল ধরে, সেটাই তাদের কাম্য ছিল। এদের মধ্যে কেউ কেউ ভেবেছে যে, পরিবার থেকে আর্থিক সাহায্য না নিয়ে কষ্ট করে হলেও পড়াশোনা চালিয়ে যাবে। এমনকি  প্রাইভেট পড়িয়ে নিজের পড়ার খরচ চালিয়েও পরিবারকে সহায়তা করার উদাহরণ অনেক আছে। এমন উদাহরণ পৃথিবীতে খুবই বিরল।

যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিউশন ফি এত বেশি যে, সেখানকার অনেক বাবা-মায়ের পক্ষেই সন্তানদের ওসব প্রতিষ্ঠানে পড়ানো সম্ভব হয় না। তারা স্কলারশিপের মাধ্যমে বা ব্যাংকঋণ নিয়ে পড়ে। পড়াশোনার পাশাপাশি উপার্জনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তারা তা পরিশোধ করে। অনেকে সেমিস্টার ব্রেকে চাকরিও করে। কিন্তু নিজের পড়ার খরচ চালানোর পর পরিবারের জন্য বাড়তি আয় করতে হয় না। বাংলাদেশের মতো ছাত্রাবস্থায় নিজের পড়ার খরচ চালানোর পাশাপাশি পরিবারের হাল ধরার উদাহরণ পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যাবে না। করোনা সংক্রমণের কারণে এসব পরিবারের ছেলেমেয়েরা বাড়ি ফিরে গেছে। ফলে প্রাইভেট পড়িয়ে আয় বন্ধ হয়ে গেছে। এরা পড়েছে চরম বিপাকে।

এই ছাত্রদের অনেকের ল্যাপটপ বা ট্যাব নেই। তাদের খাদ্য সংস্থানের অর্থ যেখানে নেই, সেখানে তারা ইন্টারনেট ক্রয়ের বিলাসিতা দেখাতে পারবে? আর পড়াশোনা ও ক্লাস করার পাশাপাশি একটি ভালো মানসিক পরিবেশেরও প্রয়োজন হয়। ছাত্রছাত্রীদের কতজন এখন এই পরিবেশে আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়ার মতো একটি অফিস লাগবে যেখানে দক্ষতাসম্পন্ন লোকজন থাকবে। শিক্ষকদেরও অনেকের আর্থিক সহযোগিতা লাগতে পারে। ক্লাস তৈরির জন্য লাইব্রেরির একসেস লাগে। অর্থাৎ একজন ছাত্র যেকোনো জায়গা থেকে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির একসেস পেতে পারে এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে। ইউরোপ আমেরিকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যাদের লাইব্রেরি ডিজিটালাইজড। অর্থাৎ একজন ছাত্র যেকোনো জায়গা থেকে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির একসেস পেতে পারে। শ্রেণিকক্ষের লেকচার-এর পাশাপাশি লাইব্রেরির বই পড়তে পারার সুযোগ পড়াশোনার একটি অত্যাবশ্যক কম্পোনেন্ট। অনেকেই বলে প্যান্ডেমিক চলে গেলেও আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আর আগের মতো থাকবে না অর্থাৎ পড়াশোনা ধীরে ধীরে অনলাইন-নির্ভর হয়ে যাবে। যদি তাই হয়, সেটা কি ধনাত্মক পরিবর্তন হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা ক্যাম্পাসনির্ভর। একজন ছাত্র শ্রেণিকক্ষে যা শেখে তার চেয়ে অনেক বেশি শেখে শ্রেণি কক্ষের বাইরে। এছাড়া সোশ্যালাইজেশনও পড়াশোনার একটি বড় কম্পোনেন্ট। এগুলো তো আর অনলাইনে সম্ভব নয়।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাসের কী অবস্থা তা বিদেশি বন্ধুদের মাধ্যমে জানার একটু চেষ্টা করেছি। কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল দুই-একটি আর্টস ডিপার্টমেন্ট অনলাইন শুরু করছিল, কিন্তু তাদের উপাচার্য বলেছেন যে, ‘আমাদের যাদবপুরে ছাত্ররা বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্তর থেকে এবং গ্রাম থেকে পড়তে আসে, যাদের কাছে ইন্টারনেট ও নিজস্ব ল্যাপটপ নাও থাকতে পারে।’ তাই তিনি অনলাইন ক্লাস নিতে আপত্তি করেন। মনে রাখতে হবে, এশিয়ার র‌্যাঙ্কিংয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ১৯৬ আর আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৪০১! আর অর্থনৈতিক অবস্থার দিক দিয়ে আমরা যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে এগিয়ে সেটা দাবি করতে পারব না। ওদিকে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭০ শতাংশ শিক্ষক অনলাইন ক্লাসের বিরুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়টি এশিয়ার র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৮৭তম অবস্থানে রয়েছে। তবে জানা গেছে, ভারতের উচ্চ শিক্ষার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান অনলাইন ক্লাস চালু রেখেছে। প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের বিষয়টি একটু ভিন্ন। সেসব প্রতিষ্ঠান যদি ক্লাস চালু না রাখে, তাহলে ছাত্ররা টিউশন ফি ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ফি দেবে না এবং তাতে তাদের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিতে সমস্যা হবে। তাদের কাছে চালিয়ে নেওয়াই বড় কথা না হলে তারা বড় সমস্যায় পড়বে। আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটিতে অনলাইন ক্লাস চলছে। ইউরোপ আমেরিকার অনেক প্রতিষ্ঠানেও চলছে। যেগুলোতে চলছে সেগুলোর বেশিরভাগই প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান। আর পাবলিক বা স্টেট প্রতিষ্ঠানগুলোর যেগুলোতে চলছে সেগুলোতে আগে থেকেই কিছু অনলাইন শিক্ষা চালু ছিল। তাই তাদের সাপোর্টিং সিস্টেম বেশ শক্ত। তাছাড়া সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমনিতেই কিছু অনলাইন কোর্স চালু ছিল। তাই তাদের সক্ষমতার সঙ্গে আমাদের তুলনা চলে না। তাদের ছাত্রদের আর্থিক অবস্থা ও টেকনোলজিক্যাল সাপোর্ট সিস্টেম আমাদের ছাত্রদের তুলনায় যোজন যোজন ভালো।

হঠাৎ করে অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার জন্য সরকার, ইউজিসিসহ বিভিন্ন মহল থেকে এক ধরনের চাপ দেখছি। সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চেয়ে তারা বেশি ব্যথিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় শত বছরের পুরনো একটি ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের এখনো একটি ইমেইল আইডি দিতে পারা গেছে? অথচ বিদেশ কেউ এক সেমিস্টারের জন্য কোনো সাধারণ মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ভর্তির দিন থেকেই তাকে একাডেমিক ইমেইল আইডি দিয়ে দেওয়া হয়।

আমাদের শিক্ষার্থীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য দরখাস্ত করে। একটি একাডেমিক ইমেইল থাকলে অনেক সুবিধা। আর এটা তো তাদের অধিকার, এটা একটা পরিচয়। শুধুই কি ইমেইল আইডি? আমাদের ছাত্রছাত্রীরা কেমন করে হলে থাকে, কী খায় সেই সম্বন্ধে কি সরকার জানে না? আবাসিক হলগুলোতে একটা সিটের জন্য সাধারণ ছাত্ররা যে পরিমাণ নির্যাতনের শিকার হয় তা পৃথিবীর কোথাও দেখা যায় না। দিন যত যাচ্ছে গণরুমের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। চারজন ছাত্রের থাকার রুমে ২০-৩০ জন ছাত্র গাদাগাদি করে থেকে শিফ্টে ঘুমায়। সেটা কতটা অমানবিক? অনলাইন ক্লাস না নিলে যত ক্ষতি হচ্ছে তার চেয়ে ঢের বেশি ক্ষতির সম্মুখীন এখানকার শিক্ষার্থীরা যে হচ্ছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

৩৫ হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ মাত্র ৬০০ কোটি টাকার মতো। আগামী অর্থবছরে দেশের ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৮ হাজার ৫৫৪ কোটি টাকা। ২০১৯-২০ সালের তুলনায় ২০২০-২১ অর্থবছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য মোট বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৪৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে প্রায় নিশ্চিতভাবে বলা যায়, বরাদ্দ কমেছে। বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বরাদ্দের দিকে চোখ বোলানো যাক। ২০১৮-১৯ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দ ছিল ২৫ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা আর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ২৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ আমাদের ৫০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যেই বাজেট তার প্রায় তিন গুণ বাজেট কেবল অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা হলো প্রায় ২৫ হাজার আর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা হলো প্রায় ২৩ হাজার। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে কোন যুক্তিতে আন্তর্জাতিক মানের হবে বলে আশা করি! এত কম টাকা দিয়ে যে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো টিকে আছে, ছাত্রছাত্রীরা সার্টিফিকেট পাচ্ছে তা এক আশ্চর্যের বিষয়। অথচ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক দল, প্রশাসন বা ছাত্ররা কোনো প্রকার প্রতিবাদ জানাচ্ছে না। এত বাধ্য ছাত্র শিক্ষক প্রশাসন পৃথিবীর আর কোথাও পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ! পৃথিবীর অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আছে যার একটি বিভাগের গবেষণা বাজেটও এর চেয়ে বেশি। এত স্বল্প বাজেট বরাদ্দ দিয়ে প্রতিবছর এত ছাত্রছাত্রীকে ডিগ্রি দেওয়া সম্ভবত একটি বিশ্ব রেকর্ড। এত স্বল্প বাজেট বরাদ্দ সত্ত্বেও অনেক ছাত্র এখান থেকে পাস করে বিদেশে সুনামের সঙ্গে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। তাই অনলাইন শিক্ষাই একমাত্র সমস্যা নয় যে, এটা করলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের  ভবিষ্যত উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

লেখক

অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত