সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। দেশে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। আবার একই সময়ে দেশে খেলাপি ঋণ বিপুল পরিমাণে বেড়েছে এবং ব্যাংকিং খাত ও পুঁজিবাজারে ভয়াবহ তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ যেমন থমকে গেছে তেমনি রপ্তানি প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে না। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও কোনো অগ্রগতি নেই। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধির উন্নতি এবং অগ্রগতির অন্যান্য পরিসংখ্যানের সঙ্গে দেশের অর্থনীতির বাস্তবতা যেমন মিলছে না তেমনি জনগণও এসবের সুফল পাচ্ছে না। অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, আর্থিক খাতে নানা দুর্নীতি-অনিয়মের রাশ টানতে না পারা এবং সুশাসনের অভাবের কারণেই দেশের অর্থনীতির চাকা বারবার থমকে যাচ্ছে। অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন, দেশে বিপুল পরিমাণে কালো টাকা বাড়তে থাকা এবং বিদেশে অর্থপাচার রোধ করতে না পারা এই সংকটের অন্যতম বড় কারণ।
সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, বিদেশে অর্থপাচারে দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। সুইস ব্যাংকগুলোতে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা রাখার ক্ষেত্রে গত চার বছরে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আমানত কমলেও এ সময়ে সেখানে বাংলাদেশিদের সঞ্চয় বেড়েছে। গত ২৫ জুন প্রকাশিত সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও প্রবাসী নাগরিকদের সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে ২০১৯ সালে মোট আমানতের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্র্যাংক, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা (প্রতি ফ্র্যাংক ৮৯ টাকা হিসাবে)। ২০১৫ সালের পর থেকে ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর আমানত কমলেও বাংলাদেশের বেড়েছে। এ সময়ে বাংলাদেশিদের সুইস ব্যাংকে আমানত বেড়েছে সাড়ে ৯ শতাংশ। উল্লেখ্য, সুইস ব্যাংকগুলোতে ২০০০ সালে বাংলাদেশিদের আমানত ছিল ৫ কোটি ১৮ লাখ ফ্রাংক। ২০১১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৫ কোটি ২০ লাখ ফ্র্যাংকে। পরবর্তী বছরগুলোতেও বাংলাদেশিদের আমানত বাড়তে বাড়তে তা এখন ৬০ কোটি ৩০ লাখ ফ্র্যাংকে এসে দাঁড়িয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দেশ থেকে প্রতি বছর যে পরিমাণ অর্থপাচার হয়, তার খুব কম পরিমাণই সুইস ব্যাংকে জমা হয়। চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, ২০০৬-২০১৫ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের প্রায় সমান। জিএফআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪টি প্রক্রিয়ায় এই অর্থপাচার হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদেশি পণ্যের আমদানিমূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রপ্তানিমূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হুন্ডি ও অন্য মাধ্যমে বিদেশে লেনদেন এবং ভিওআইপি ব্যবসা। এ ছাড়া টাকা পাচারে বিশ্বের শীর্ষ ৩০ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশের নাম। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশই কোনো না-কোনোভাবেই পাচার হচ্ছে।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে জানা যাচ্ছে, প্রতি বছর দেশে আসা রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেকের সমপরিমাণ অর্থ বিভিন্ন মাধ্যমে বিদেশে পাচার হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে, প্রতি বছর দেশে গড়ে ১৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। কিন্তু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে দেশ থেকে গড়ে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি পাচার হয়ে যায়। সম্প্রতি টাকা পাচারের আরও একটি বড় মাধ্যম হয়ে দেখা দিয়েছে রেমিট্যান্স। একটি চক্র বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দেয়। আর এ দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকায় এর দায় শোধ করা হয়। কিন্তু দেশে অর্থপাচার রোধ আইন থাকলেও তার কোনো প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না। অনেকে বলে থাকেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলে বিদেশে অর্থপাচার বন্ধ হবে। কিন্তু দেশে এ যাবৎ মোট ১৬ দফায় কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হলেও তার তেমন কোনো সুফল মেলেনি। এবার প্রস্তাবিত বাজেটেও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থপাচার ধরা পড়লে ৫০ শতাংশ জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। কিন্তু সেই জরিমানা আদায় করা হবে আয়কর আইনে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন বাজেটের এই নীতি সাংঘর্ষিক। এই অবস্থায় দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নের চাকা ঘোরাতে অর্থপাচার রোধ আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রমাণ রাখা জরুরি।
