আমরা যারা ষাট-সত্তর দশকের কলকাতায় বড় হয়েছি, তাদের কাছে এখনো কানে বাজে রেডিওতে শোনা শ্রাবন্তী মজুমদারের বিজ্ঞাপনী লাইন দুটো ‘সুরভিত অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম বোরোলিন....।’ কিছু কিছু বিজ্ঞাপন মনের মধ্যে কেমন যেন গেঁথে আছে। যেমন: ‘হাঁটা মানেই বাটা’ কিংবা অনেক পরের ‘ঠান্ডা মতলব কোকা-কোলা’। কার একটা লেখায় যেন পড়েছিলাম যে, আগামী দিনে যিনি ঐতিহাসিক বা প্রতœতাত্ত্বিক বর্তমান সময়ের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করবেন, তার কাছে সবচেয়ে বড় উপাদান হতে পারে বিজ্ঞাপনের বিপুল বদল। বিজ্ঞাপনের বদলে যাওয়া ভাষা চিন্তা ও দর্শন নিয়ে বিশ্লেষণ করলেই একটা দেশের অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন উপলব্ধি করা সহজ হয়ে যায়। সিনেমা, সাহিত্য, নাটককে সমাজের দর্পণ বা আয়না বলা হয়। একটা সমাজের দৃশ্যপট ওই শিল্প ও সংবাদমাধ্যমে ঠিকঠাক ধরা পড়ে। অথচ দুর্ভাগ্য এই তালিকায় কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আমাদের মতো মধ্যবিত্তরা বিজ্ঞাপনকে ফেলি না।
কয়েক দশক আগেও বিজ্ঞাপন বলতে বুঝতাম কাগজে কিছু কপি করা। সত্যজিৎ রায় ‘পথের পাঁচালী’ করার আগে কপি লিখতেন বলেই বোধহয় একটু আধটু বিজ্ঞাপন এজেন্সির সম্বন্ধে সাধারণ লোকজন কৌতূহলী ছিলেন। কিন্তু আজও অন্তত পশ্চিমবঙ্গীয় বাঙালি সমাজে বিজ্ঞাপনের নির্মাণ প্রক্রিয়া নিয়ে অধিকাংশেরই কোনো আগ্রহ নেই। ক্যারিয়ার হিসেবে বিজ্ঞাপন এখনো গণমাধ্যমবিষয়ক শিক্ষার্থীদের কাছে অনেক পেছনের সারিতে। দিল্লি, ব্যাঙ্গালোর, চেন্নাই, মুম্বাইয়ের তুলনায় কলকাতা বেশ পিছিয়ে আছে বিজ্ঞাপন নির্মাণে। অথচ একেকটা বিজ্ঞাপন জন্ম নেয় একাধিক লোকের মিলিত প্রচেষ্টায়। স্ট্রাটেজিস্ট, কপি রাইটার, আর্টিস্ট, অ্যানালিস্ট, অ্যাকাউন্ট্স ম্যানেজার, মার্কেটিং ডিরেক্টর সব মিলিয়ে একটা বিজ্ঞাপনের নেপথ্যে থাকে অনেক মস্তিষ্ক।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কে কাকে প্রভাবিত করছে! সমাজ বিজ্ঞাপনকে, না বিজ্ঞাপন সমাজকে? ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে ভারতীয় বিজ্ঞাপনের বদলটা খুঁটিয়ে দেখলে এই সামাজিক পরিবর্তনের ধারা সম্পর্কে একটা সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। একেবারে প্রথম দিকে ভারত রাষ্ট্রের দেহ থেকে তখনো গ্রাম-সমাজের গন্ধ পুরোপুরি যায়নি, একধরনের আদর্শবোধ থেকে নতুন ভারত গড়ে তোলার স্বপ্ন তখনো দেশনেতাদের চোখে। সে সময় দেশবাসীকে কতটা শিক্ষিত, স্বাস্থ্য সচেতন করা যায় তা নিয়ে বিজ্ঞাপন নির্মাতাদের চিন্তাগত তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। বিশেষ করে জনরুচি পাল্টাতে গ্রামীণ জনগণের বহু শতাব্দীর পুরনো অভ্যেস নুন, মিশি, গুড়াখু, দাঁতনের জায়গায় কলগেট ব্রাশ, পেস্ট বা গুঁড়ো পাউডার এনে ব্যাপক প্রচার চালাতে লাগল। পাশাপাশি ডালডা স্বাস্থ্য সচেতন করতে বিজ্ঞাপনের প্রচারে নানা কৌশল নিল। বিজ্ঞাপনের ইমেজে তখনো ঔপনিবেশিক ছাপ স্পষ্ট ছিল। নানা কোম্পানির বিজ্ঞাপনে রাজা-নবাব, ঠাকুর-দেবতা, গ্রামীণ দৃশ্যের মতো প্রতীক ছিল। মডেল হিসেবে তখনো নারীদের কোনো ভূমিকা ছিল না। পুরুষদের সুস্বাস্থ্য ছিল সমাজের কাছে একধরনের হি-ম্যান ইমেজ। ফলে ঘরে ঘরে পৌঁছে যেতে লাগল লাইফবয়ের আবেদন ‘লাইফবয় যেখানে স্বাস্থ্যও সেখানে।’ এই স্বাস্থ্য বা পৌরুষত্ব সম্বন্ধে এক ধরনের সম্ভ্রম জনমনে গড়ে তোলার নেপথ্যের দর্শন কিন্তু একধরনের সাবেক আর্যাবর্তের বীরগাথার পুনর্নির্মাণ। স্বাধীনতার আগে হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রচার হিসেবে পাড়ায় পাড়ায় ব্যায়ামাগার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যে শরীরচর্চার প্রচলন ছিল, তার স্পষ্ট ছাপের ভিন্ন ভিন্ন প্যাকেজিং স্বাধীনতার তিন দশক পরেও জনপ্রিয় ছিল। এই নায়কোচিত শারীরিক কল্পনায় ভারতের দলিত-সংখ্যালঘু-আদিবাসীদের কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না । প্রকৃতঅর্থে, স্বাধীনতার পর থেকেই চেতনে-অবচেতনে এক হিন্দু ভারত নির্মাণপ্রক্রিয়ার সূক্ষ্ম বাসনা ছিল। যদিও তখন জওয়াহেরলাল নেহরুর ভাবনায় ইউটোপীয় সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদের প্রতি একধরনের আকর্ষণ থাকায় বিজ্ঞাপনে কোনো ধর্মীয় ভাবনা সেভাবে প্রচার করা হয়নি। আর সব বিজ্ঞাপনেরই সীমাবদ্ধতা ছিল যে তখন টেলিভিশন না থাকায় তা খুব বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারত না। তখনো দেশে শিক্ষিত মানুষ হাতেগোনা ছিল। গ্রামীণ সর্বহারার মধ্যে বিজ্ঞাপনের কোনো প্রভাব পড়েনি। সিনেমার হলে যাওয়া দর্শক ও সংবাদপত্রের পাঠকের মধ্যেই বিজ্ঞাপনের প্রভাব সীমাবদ্ধ ছিল ।
আসলে বিজ্ঞাপনী মস্তিষ্কের পেছনে থাকে দর্শন। এই যে ভারত-চীন যুদ্ধংদেহী হাওয়া এখন দেশজুড়ে বহমান, তার মধ্যে কেউ যদি শান্তির বাণী প্রচার করে তাহলে তাকে স্রোতের বিপরীতে হাঁটতে হবে, যা বাজারের বিরুদ্ধে যাওয়া। ফলে কেউ এই ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। সুতরাং বিজ্ঞাপন তৈরি হয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী। জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের রুচি মেনে। সেজন্য দশকে দশকে বিজ্ঞাপনের ভাষা বদলাতে লাগল। ১৯৯১ সালে মুক্তবাজার অর্থনীতি পুরো পাল্টে দিল বিজ্ঞাপনের যাবতীয় পুরনো মূল্যবোধ। গোলোকায়নের যুগে প্রযুক্তির দ্রুতগতির বিস্তার আর বহুজাতিকের হুড়মুড়িয়ে ভারতীয় বাজারে প্রবেশের ফলে বিজ্ঞাপনের জগৎটাই আমূল বদলে গেল। মানুষ হতে লাগল নিছক মডেল নয়, বাজারি পণ্য। নারীর শারীরিক সৌন্দর্য পণ্য বিপণনের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে হাজির হলো দেশের প্রচার মাধ্যমে। কনডম থেকে অন্তর্বাস, পারফিউম থেকে সাবান সব ক্ষেত্রেই বিজ্ঞাপনের ভাষায় বিপুল বদল এলো। ১৯৯৩ সালের পর ভারতীয় নারীদের পোশাক বিপ্লব ঘটল। শাড়ির পরিবর্তে জিনস আর চুড়িদার জায়গা পেতে লাগল। বিজ্ঞাপনদাতারা ভারতীয়দের মানসিক গঠনের পাঠ নিতে বেশি সময় নিলেন না। বস্তুত ভারত রাষ্ট্রের একমাত্রিক চেহারা নির্মাণেও বড় ভূমিকা বিজ্ঞাপনের। ১৯৮৭ সালে ভারতের সরকারি মিডিয়ায় ধারাবাহিকভাবে দেখানো শুরু হলো রামায়ণ। বলা যায়, এক বছরের কাছাকাছি চলা ওই সিরিয়ালের হাত ধরেই এদেশে ধর্মীয় মেরুকরণের সূচনা। এরপরে এলো মহাভারত। এই দুই মহাকাব্যের আড়ালে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ নীতির পিছু হটাতে বিপুল অর্থলগ্নি করেছিল বিজ্ঞাপন নির্মাতারা। বাজারের প্রয়োজন ও পণ্য বিপণনের জন্যই ফেডারেল ভারতের বদলে শক্তিশালী চেহারা নিতে লাগল এককেন্দ্রিক ভারত।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট দলের অলরাউন্ডার ড্যারেন স্যামি অনেক দিন ধরেই ভারতের বর্ণবাদী আচরণ নিয়ে বলে আসছেন। এবার তিনি সরাসরি আঙুল তুলেছেন ভারতের বর্ণবাদী সমাজের দিকে। তার বক্তব্য, একটা সমাজ কয়েক দশক ধরে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলির মতো বর্ণবিদ্বেষী প্রসাধনীকে কীভাবে পছন্দ করে আসছে! তাদের মধ্যে এ ধরনের বিদ্বেষ লুকিয়ে না থাকলে তো এটা সম্ভব নয়। কথাটা শুনলে অনেকে ক্রোধান্বিত হয়ে যেতে পারেন। অভিযোগটা কিন্তু পুরো উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিজ্ঞাপনের নেতি ও ইতি, দুদিক নিয়েই দীর্ঘ লেখা লিখে ফেলা যায়। কয়েক বছরে বিজ্ঞাপনের আঙ্গিকে যে বদল ঘটেছে তা কিন্তু প্রশংসার। আসলে ইদানীং উচ্চ শিক্ষিত মেধার সম্মিলন ঘটেছে ভারতীয় বিজ্ঞাপন জগতে। সবশেষে, আমাদের যৌবনকালের এক বিজ্ঞাপনের শেষ দু-লাইন না শুনিয়ে পারছি না ‘কোয়ালিটি কোম্পানির হিম ঠান্ডা মিষ্টি আইসক্রিম’। এই প্রবীণ বয়সেও তাই কোয়ালিটি আইসক্রিমের বড় ভক্ত হয়ে রয়ে গেলাম স্রেফ বিজ্ঞাপনের গুণে।
লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা
