প্রতাপশালী পাঁচ ঠিকাদারকে ‘অতীব জরুরি তলব’ দুদকে

আপডেট : ০২ জুলাই ২০২০, ০৭:১৭ এএম

বিভিন্ন হাসপাতালে নিম্নমানের মাস্ক-পিপিইসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহের অভিযোগ অনুসন্ধানে প্রভাবশালী পাঁচ ঠিকাদারকে ‘অতীব জরুরি ভিত্তিতে তলব’ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল বুধবার কমিশনের অনুসন্ধান দলের প্রধান মীর মোহাম্মদ জয়নাল আবেদী শিবলী স্বাক্ষরিত এক নোটিসে তাদের তলব করা হয়েছে।

এ পাঁচ ঠিকাদার হলেনÑ মেসার্স জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রাজ্জাক, তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের সমন্বয়কারী (মেডিকেল টিম) মো. মতিউর রহমান, এল্যান করপোরেশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান/ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম আমিন, মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেডের পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির এবং ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের চেয়ারম্যান ও লেক্সিকোন মার্চেন্ডাইজ ও টেকনোক্র্যাট লিমিটেডের মালিক মো. মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু।

এ প্রসঙ্গে দুদকের পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে জানান, দুদক পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী স্বাক্ষরিত এ তলবি নোটিসে বলা হয়েছে, ‘স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে কভিড-১৯-এর চিকিৎসার নিমিত্ত নিম্নমানের মাস্ক, পিপিই ও অন্যান্য স্বাস্থ্য সরঞ্জামাদি ক্রয়সহ বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ করার নামে অন্যদের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎপূর্বক অবৈধ সম্পদ অর্জন করেন। এ অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে বর্ণিত অভিযোগ বিষয়ে তাদের বক্তব্য শ্রবণ ও গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।’ প্রণব কুমার জানান, এজন্য আবদুর রাজ্জাক, মতিউর রহমান ও আমিনুল ইসলাম আমিনকে ৮ জুলাই কমিশনে হাজির হয়ে রেকর্ডপত্রসহ বক্তব্য দিতে অনুরোধ করা হয়েছে। হুমায়ুন কবির ও মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুকে ৯ জুলাই দুদকে হাজির হয়ে রেকর্ডপত্রসহ বক্তব্য দিতে বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে হাজির হয়ে বক্তব্য দিতে ব্যর্থ হলে বর্ণিত অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই মর্মে গণ্য করা হবে।

দুদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রভাবশালী ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল মিঠু মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেডেরও মালিক। তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। দেশে তার ব্যবসা তদারকি করেন তার ভাই বেনজির আহমেদ।

দুদক কর্মকর্তারা জানান, করোনা মহামারীর শুরুর দিকেই ভুয়া এন-৯৫ মাস্ক সরবরাহ করে মেসার্স জেএমআই হসপিটাল রিক্যুইজিট ম্যানুফ্যাকচারিং লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে এ কাজ করেন। চিকিৎসক ও নার্সরা বাধ্য হয়ে এসব মানহীন মাস্ক ব্যবহার করে নিজেরা ঝুঁকিতে পড়েন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, রোগীর নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য এন-৯৫ মাস্ক পরা জরুরি। কিন্তু মার্চের শেষভাগে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার থেকে বিভিন্ন হাসপাতালে যেসব মাস্ক পাঠানো হয়, তার প্যাকেটে ‘এন-৯৫’ লেখা থাকলেও ভেতরে ছিল সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক।

দুদক কর্মকর্তারা আরও জানান, অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এল্যান করপোরেশন লিমিটেডের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে গত ২৯ মে বনানী থানায় মামলা করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। মামলায় বলা হয়, দেশে করোনা সংক্রমণ দেখা দিলে গত ১৮ এপ্রিল ৫০ হাজার কেএন-৯৫ মাস্ক সরবরাহের কাজ পায় মেসার্স এল্যান করপোরেশন। তবে কাজ পাওয়ার আগেই পুরান ঢাকার হাজারীবাগে তাজুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে চুক্তি করেন আমিনুল। ১৩ মে মাস্কের সিই মার্কিং সনদ, ফ্রি সেল সার্টিফিকেট ও মাস্কের টেস্ট রিপোর্টসহ মাস্ক খালাসের জন্য আবেদন করে প্রতিষ্ঠানটি। ১৮ মে ঢাকা শুল্ক বিভাগ থেকে মাস্কগুলো খালাসের জন্য অনাপত্তিসূচক সনদও দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর জানতে পারে, অনাপত্তি নেওয়ার জন্য এল্যান করপোরেশন যেসব কাগজপত্র দেখিয়েছে তার সবই ভুয়া। ফ্রি সেল সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন কাগজপত্র জাল করে প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি এল্যান করপোরেশন কেএন-৯৫ মাস্ক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সনদও জাল করেছে। পরে গত ২৭ মে মাস্ক আমদানির অনাপত্তিসূচক সনদপত্র বাতিল করে ২৯ মে মামলা করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর।

দুদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রভাবশালী ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠুর সিন্ডিকেট নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শহীদউল্লাহ গত ৩০ মে জনপ্রশাসন সচিবের কাছে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পিএস তাকে মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার নির্দেশ দেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও তার ছেলে ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে বলে তাকে জানান ওই দুই কর্মকর্তা।’ চিঠিতে শহীদউল্লাহ আরও জানান, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওই দুই কর্মকর্তা মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেডসহ তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ অব্যাহত রাখেন। ওই কোম্পানির পাঠানো তালিকা ও মূল্য অনুযায়ী দ্রব্যাদি কেনাকাটা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তিনি (ব্রিগেডিয়ার শহীদুল্লাহ) এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং ক্রয় তালিকায় সেগুলো অন্তর্ভুক্ত করেননি। এতে মেডিটেক ইমেজিং লিমিটেডসহ সহযোগী ঠিকাদাররা ক্ষুব্ধ হন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সম্প্রতি মন্ত্রণালয় কভিড হাসপাতালের আইসিইউর জন্য ডিপিএমে (সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি) কিছু চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয়ের চাহিদা দেয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কয়েক কর্মকর্তা মৌখিকভাবে মেডিটেক ইমেজিংয়ের কাছ থেকে ওইসব সামগ্রী ক্রয়ের নির্দেশ দেন। কিন্তু মেডিটেক ইমেজিংয়ের যন্ত্রপাতি ছিল নিম্নমানের এবং দাম বেশি। ফলে তারা বাদ পড়ে। দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, এ অবস্থায়ও মিঠুর প্রতিষ্ঠান মেডিটেক ইমেজিংকে বিভিন্ন হাসপাতালে ২৫০ আইসিইউ মেশিন সরবরাহের কাজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত