হাবীবুল্লাহ বাহার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ

তিন মাস বেতন বন্ধ, কষ্টে শিক্ষক-কর্মকর্তারা

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২০, ০৬:২৩ এএম

করোনা পরিস্থিতিতে রাজধানীর শান্তিনগর মোড়ে অবস্থিত হাবীবুল্লাহ বাহার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে তিন মাস ধরে বেতন বন্ধ। এতে প্রতিষ্ঠানটির দুই শতাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীর মানবেতর জীবন কাটছে। অনেক শিক্ষক স্ত্রী-সন্তান নিয়ে গ্রামে ফিরে গেছেন। তাদের কেউ কেউ হালচাষ শুরু করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে করোনার বিস্তার রোধে মার্চের শুরুতেই বন্ধ করা হয় কলেজের ক্লাস। এরপরই বেতন নিয়ে বিপাকে পড়েন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এমনকি ঈদুল ফিতরেও দেওয়া হয়নি বেতন-বোনাস। জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী কলেজটিতে বেতন দেওয়া হয়। কিন্তু বেতন চাইলে অধ্যক্ষ সাফ জানিয়ে দেন, কলেজের ফান্ডে টাকা নেই। এমনকি শিক্ষকদের তিনি বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে না জানাতে নির্দেশ দেন।

এদিকে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে কলেজ কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। বিষয়টি তদন্তে ৬ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে কলেজের গভর্নিং বডি।

এ বিষয়ে কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কলেজ ফান্ডে টাকা নেই। বেতনের বাজেট আসেনি। আগের বাজেটের বকেয়াও আসেনি। এরপরও বেতন দেওয়ার চেষ্টা চলছে।’ আর্থিক অনিয়মের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তদন্ত কমিটি হয়েছে। অভ্যন্তরীণ অডিট হবে।’

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হয়তো আর্থিক সংকটে কলেজটিতে বেতন হচ্ছে না। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।’

১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে এইচএসসির পাশাপাশি ২৭টি বিভাগে অনার্স, প্রফেশনাল বিবিএ ও ডিগ্রিতে ৩টি বিভাগে শিক্ষার্থী রয়েছেন ১২ হাজারের বেশি। দেড় শ শিক্ষকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন প্রায় ২২২ জন। তাদের মধ্যে ১২০ শিক্ষক নন-এমপিওভুক্ত। ৭২ কর্মচারীর মধ্যে মাত্র ৯ জন এমপিওভুক্ত। এমপিওভুক্তরা সরকারের দেওয়া শুধু বেসিক বেতন পাচ্ছেন। অন্যরা সর্বশেষ মার্চের শুধু বেসিক বেতন পেয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করে একাধিক শিক্ষক দেশ রূপান্তরকে জানান, শিক্ষার্থীদের বেতন ও পরীক্ষার ফি বাবদ বছরে ২০ কোটি টাকার বেশি আয় হয়। সব খরচ বাদে বছর শেষে কলেজের ৮/১০ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকার কথা। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, ফান্ড ফাঁকা। তাও মার্চেই প্রথম জানা গেল। মূলত কলেজের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীনরা হরিলুট করেছেন। ক্যাসিনো খালেদের মতো মানুষও গভর্নিং বডির সদস্য ছিলেন। ভবন তৈরির নামে তিনি কোটি কোটি টাকা লুট করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা আরও জানান, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কলেজের বর্তমান ও সাবেক অধ্যক্ষের সম্পদের হিসাব নিলেই সব তথ্য বের হয়ে আসবে। এসব অনিয়মের বিষয়ে সাধারণ শিক্ষকরা গত ৯ জুন গভর্নিং বডিকে অবহিত করেন। এরপর আর্থিক অসংগতি খতিয়ে দেখতে গত ১৫ জুন ৬ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

কলেজের দর্শন বিভাগের প্রভাষক মো. রাশেদ আলম বলেন, ‘মার্চে সর্বশেষ বেসিক বেতন পেয়েছি। এরপর আর কোনো টাকা পাইনি। আমার মতো সব শিক্ষকই কষ্টে আছেন। কলেজ অধ্যক্ষ ফান্ডে টাকা নেই জানিয়েছেন। এত দিন কষ্ট করে পরিবার নিয়ে থাকলেও জুনের শেষদিকে গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে চলে এসেছি।’ মার্কেটিং বিভাগের এক প্রভাষক বলেন, ‘এত দিন ঋণ করে চললেও আর হাত পাতার জায়গা নেই। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে কিছু বললে বরখাস্ত হতে পারি। খুবই বিপদে রয়েছি।’

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নাম প্রকাশ না করে এক প্রভাষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অর্থকষ্টে গ্রামে এসে চাষাবাদ শুরু করেছি। মাত্রই মাঠ থেকে এলাম, শরীরে কাদা। আমার মতো অনেকেই এ কাজ করছেন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করে এখন গ্রামে ফেরায় স্বজনরা লজ্জা দিচ্ছেন, নিজেকে খুবই ব্যর্থ মনে হয়।’

বোটানি বিভাগের অফিস সহকারী রেজাউল করিম বলেন, ‘সর্বশেষ মার্চে সাড়ে ৬ হাজার টাকা পেয়েছি। এক মাস আগে বিকাশ নম্বর নিয়েছিল কলেজ কর্র্তৃপক্ষ। শুনেছিলাম আড়াই হাজার করে টাকা দেবে। কিন্তু এখনো পাইনি। স্ত্রী ও দুই মেয়ে নিয়ে খুব কষ্টে আছি। অন্য পেশায় যাওয়ার চেষ্টা করছি।’

এ বিষয়ে হাবিবুল্লাহ বাহার বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যক্ষ ড. আব্দুল জব্বার মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে কলেজের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোস্তফা ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সম্প্রতি কলেজের ভবন নির্মাণে অনেক টাকা ব্যয় হওয়ায় ফান্ডে টাকা নেই। ঠিকাদারকেও বিল দিতে পারছি না। কলেজে শিক্ষার্থী ভর্তি কমে গেছে। বন্ধের কারণে তারা বেতনও দিচ্ছে না। এ জন্যই সংকট দেখা দিয়েছে। তবে সরকার থেকে একটি সহায়তা এসেছে। তা থেকে প্রত্যেক শিক্ষককে ৫ এবং কর্মচারীদের আড়াই হাজার করে টাকা দেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত