কদিন আগে শুনলাম আরও ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় খোলার অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো নারায়ণগঞ্জে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়, নাটোর জেলার সদর উপজেলায় ডক্টর ওয়াজেদ আলী কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের নির্বাচনী এলাকা মেহেরপুরে আরেকটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এই সংবাদ শুনে নিজের দেখা একটি ঘটনার কথা মনে পড়ল। বছরখানেক আগে আমি ভোরবেলা চন্দ্রিমা উদ্যানে হাঁটতে যেতাম। ওখানে অনেক ভিক্ষুক লাইন ধরে বসে ভিক্ষা করতে দেখেছি। তো একদিন দেখি এক লোক সব ভিক্ষুককে দুই টাকার একটি করে নোট সবাইকে দিচ্ছেন। বর্তমানে আসলে দুই টাকার তেমন কোনো মূল্য নেই। যাহোক ভদ্রলোক যখন তাদের টাকা দিয়ে যাচ্ছেন আমি লক্ষ করলাম ভিক্ষুকদের প্রায় সবাই পেছন থেকে তাকে গালি দিচ্ছে আর হাসাহাসি করছে। অথচ ওই ভদ্রলোক ভাবছেন সবাইকে খুশি করবেন এবং বেশি করে সওয়াব কামাবেন কিন্তু তিনি আসলে কাউকেই খুশি করতে পারেননি।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের সরকারগুলো যেন সেই ভদ্রলোক আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা অনেকটা সেই ভিক্ষুকদের মতোই। তবে বর্তমান সরকার জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় খোলার কথা বলে এ পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু আদতে এগুলো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একেকটা কলেজেরই নামান্তর। কিছু মানুষকে শিক্ষক কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ দিয়ে, কিছু অবকাঠামো নির্মাণ করে কয়েকটি বিভাগ খুলে ছাত্রছাত্রী ভর্তি করলেই আর একটি প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয় নাম দিলেই বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে যায় না। এতদিন শুনতাম জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হবে এবার তো দেখছি প্রতি জেলায় একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় খোলার এজেন্ডা বাস্তবায়ন চলছে। এক অর্থে আমরা কিন্তু জেলায় জেলায় না বরং উপজেলায় উপজেলায় বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দিয়েছি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যেসব কলেজে আন্ডারগ্রাজুয়েট বা অনার্স ও মাস্টার্স পড়ানো হয় সেগুলো তো এক অর্থে বিশ্ববিদ্যালয়ই। কল্পনা করা যায় যেসব কলেজে একেকটি বিভাগে বড়জোর ৪ থেকে ৬ জন শিক্ষক আছেন সেখানে রীতিমতো অনার্স আর মাস্টার্স খুলে ভর্তিচ্ছু কাউকে না ফিরিয়ে বরং সবাইকে ভর্তি করে পড়ানো হচ্ছে। আর সেই ৪ থেকে ৬ জন শিক্ষকের সবার সর্বোচ্চ ডিগ্রি মাস্টার্স। মাস্টার্স পাস একজন শিক্ষক কেবল অনার্সের কোর্সই না মাস্টার্সের বিষয়ও পড়াচ্ছেন। তাছাড়া বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে পর্যাপ্ত ল্যাবও নেই। এসব কি পৃথিবীর কোথাও কল্পনা করা যায়?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যে সাতটি কলেজ আছে সেগুলো ঢাকার বাহিরের মফস্বলের যেকোনো কলেজ থেকে ভালো অবস্থায় আছে তারপরও অনার্স মাস্টার্স পড়ানোর শিক্ষক ও ল্যাব সুবিধা নেই। কিন্তু এভাবেই আমরা লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীকে প্রতি বছর অনার্স মাস্টার্সের ডিগ্রি দিয়ে যাচ্ছি। একটি রাষ্ট্র কীভাবে তার নিজ দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সঙ্গে প্রতারণা করে তার জ্বলন্ত উদাহরণ হলো আমাদের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্র ভর্তি ও পরীক্ষার ফি ইত্যাদি দিয়ে এটির আয় কিন্তু বিশাল। এই বিশাল অংকের আয় যদি ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণে ব্যয় করা হতো তাহলে খুশি হতাম। এরা পারত দেশ ও বিদেশ থেকে সেরা সেরা কিছু শিক্ষককে চুক্তিভিত্তিক এনে শ্রেণিকক্ষের পাঠদানটা অন্তত ঠিকঠাক করাতে। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয় তো কেবল শ্রেণিকক্ষের পাঠদান নয়। গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান সৃষ্টি ছাড়া একটি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় হতে পারে না। এই অর্থে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ বলা বিশাল এক প্রতারণারই নামান্তর বলে আমি মনে করি।
ইদানীং যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হচ্ছে সেগুলোর বেশ কটি হয় বঙ্গবন্ধুর নামে নতুবা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বা তার পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে। এমন হতেই পারে এবং এতে দোষের কিছু দেখি না। কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নামে বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান করার বিষয়ে কিছু কথা বলা জরুরি। যেমন বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি কেমন মানুষকে সেখানে ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আমরা এও জানি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দ এবং এর মান কেমন। বঙ্গবন্ধুর নামে যে প্রতিষ্ঠান করবেন সেটি কেন নামকাওয়াস্তে একটি বিশ্ববিদ্যালয় হবে? কেন বঙ্গবন্ধুর নামে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় করছেন না যার সুনাম সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে এবং যেখান থেকে লেখাপড়া করে হাজার হাজার ছেলেমেয়ে শত শত বছর ধরে উপকৃত হবে। আমরা কেউ থাকব না কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু সুনামের সঙ্গে বেঁচে থাকবেন। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত এই কাজটিই করেছে। ভারত বেঙ্গালুরুতে জওয়াহেরলাল নেহরু ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড সায়েন্টিফিক রিসার্চ ((Jawaharlal Nehru Centre for Advanced Scientific Research) নামে একটি ইনস্টিটিউট করেছে যেখানে পৃথিবীসেরা গবেষকদের মিলনমেলা। ওখানে একজন পদার্থবিদ আছেন যাকে আমি চিনি। তার নাম হলো শ্রীকান্ত শাস্ত্রী। তিনি বোস্টন ইউনিভার্সিটিতে ছিলেন। তাকে ওখানকার প্রশাসন বিশেষ সুবিধা দিয়ে ভারতে এনেছে। শুনেছি এইরকম আরও অনেক ফ্যাকাল্টির ক্ষেত্রেই ঘটেছে। অর্থাৎ সবাইকে এক কাতারে মাপলে হবে না। অধিকতর যোগ্যদের অধিক মর্যাদা দিতে হবে। আমাদের এখানে শিক্ষক নিয়োগে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যোগ্যতার মাপকাঠিই ঠিক না। একজন বিদেশে পিএইচডি করে একাধিক পোস্ট-ডক করে দেশে ফিরে এলে তার চাকরি সহজে হবে না। আর যদিও-বা হয় সে হবে তারই এক সহপাঠী যে আজ পর্যন্ত পিএইচডিও হয়তো করতে পারেনি আর করলেও পোস্ট-ডক অভিজ্ঞতা বা গবেষণাপত্রে পিছিয়ে তার জুনিয়র। এছাড়াও বেঙ্গালুরুতে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স, মুম্বাইতে টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ সেন্টার জগৎবিখ্যাত। ঐসব প্রতিষ্ঠানে এখন ইউরোপ আমেরিকা থেকে পোস্ট-ডক করতে আসে।
একটি দেশে কতটি বিশ্ববিদ্যালয় খোলা যাবে সেটি প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়ার মতো কতজন যোগ্য শিক্ষক আছেন। এই সরল অঙ্কটা সবার আগে করতে হবে। এটি না করে গ-ায় গ-ায় বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেখা গেছে নিয়োগ দেওয়ার মতো যথেষ্ট ভালো শিক্ষক নেই। ফলে যাদের কলেজেও শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা আছে কি না সন্দেহ তারা হয়ে গেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এদের অধিকাংশের পিএইচডি নেই আর থাকলেও সেই পিএইচডি মানসম্পন্ন কি না তা নিয়ে আমার বিস্তর সন্দেহ আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ফেইসবুক কেন্দ্রিক কিছু ক্লোজড গ্রুপ আছে সেখানে অনেকের আলোচনা, কমেন্টস ও লেখার মান দেখে মনে হয়েছে এরা আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের আবরণে দলান্ধ রাজনীতিক। কিছু করারও নেই। আমরা এত এত বিশ্ববিদ্যালয় খুলে ফেলেছি যে এখন নিয়োগ দেওয়ার মতো এত যোগ্য শিক্ষক পাওয়া যায় না। তার ওপর আবার বিদেশ থেকে যারা পিএইচডি এবং/অথবা পোস্ট-ডক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন তাদের নেওয়াই হয় না। আমি এমন অনেক অভিযোগ পাই যে তারা দরখাস্ত করে ইন্টারভিউয়ের জন্য কার্ডই পান না।
তাহলে আমাদের এখানে এত এত বিশ্ববিদ্যালয় কেন খোলা হচ্ছে? কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয় খুললে ভবন ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার নির্মাণের কাজ হয়। সেখানে অনেক দলীয় লোকদের কাজ দেওয়া যায়, দলীয় শিক্ষকদের ভিসি-প্রোভিসি বানানো যায়, দলীয় লোকদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যায়। এখানে ভিসি হওয়ার যোগ্যতা কী? ভালো অ্যাকাডেমিক হলে আপনার ভিসি হওয়ার সম্ভবনা আছে বলে মনে করেন? না। একদম না। আপনাকে শিক্ষক রাজনীতি করে দুই-একবার নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে দলীয় আনুগত্য প্রমাণ সাপেক্ষেই আপনার ওই পদ পাওয়ার সম্ভাবনা। তাহলে শিক্ষকরা কেন গবেষণা করবেন? অর্ধশতাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এইবার সরকার ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে যা ‘গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এ স্থান পাওয়ার মতো। কল্পনা করা যায়? এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দ হলো ৮৩০ কোটি টাকা। ৩৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী যে বিশ্ববিদ্যালয়ের, যে বিশ্ববিদ্যালয় দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনসহ দেশের সব সংগ্রামের সঙ্গে সম্পৃক্ত সে বিশ্ববিদ্যালয়কে এত লজ্জাকর বরাদ্দ? এই বরাদ্দ দিয়ে কোনোরকমে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল যে কাজ, জ্ঞান সৃষ্টি, সেই কাজে বরাদ্দ কত? এত নগণ্য বরাদ্দ দিয়ে কীভাবে ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিং-এ থাকবে বলে আশা করবেন?
ওই যে একটু আগে বললাম প্রত্যেক ভিক্ষুককে ২ টাকা করে দেওয়ার কথা এটা ঠিক সেরকম। ২ টাকা করে দিলে যেমন কোনো ভিক্ষুকের কোনো লাভ হয় না তেমনি এই অল্প টাকা দিয়ে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়েরই লাভ হচ্ছে না। সবগুলোই ধুঁকে ধুঁকে মরতে গিয়েও প্রাণে বেঁচে আছে। এভাবে বেঁচে থেকে না দেশের লাভ হচ্ছে না ছাত্রছাত্রীদের লাভ হচ্ছে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে যে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় তার চেয়ে ঢের অনেক বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয় পৃথিবীর অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগকেই। আমাদের অর্ধশতাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে যে বরাদ্দ দেওয়া হয় তার তিন চারগুণ বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয় কেমব্রিজ বা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে!
আমাদের সমস্যাটা কি টাকার? বাংলাদেশে যে পরিমাণ লুটতরাজ হয়, বিদেশে টাকা পাচার হয় সেসব দেখে তো টাকার অভাব মনে হয় না। গত ছয় বছরে সরকার ৬২ হাজার কোটি টাকা কেবল বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের কেন্দ্র ভাড়া দিয়েছে যেগুলোর পূর্ণ সক্ষমতার ৩০ শতাংশও চালানো সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অলস বসিয়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এসব টাকা দিয়ে কেউ কেউ ধনী দেশের সেরা ধনীতে পরিণত হয়েছেন। আমাদের এক সাবেক ক্রিকেটার প্লাস বর্তমান সংসদের এমপি যার দুর্নীতির কাহিনী এখন প্রতিদিনের সংবাদের একটি অংশ তিনিও নাকি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক। গত দুই বছরে ১১ হাজার কোটি টাকা কেবল সুইস ব্যাংকেই পাচার হয়েছে। দেশ থেকে পণ্য রপ্তানি আয়ের ১৭ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা গায়েব হয়ে গেছে। এরমধ্যে ৪০ হাজার কোটি টাকার কোনো হিসাবই নেই। আমাদের রাজনীতিবিদরা বুঝে গেছেন দলের মাঝে যত বেশি লুটেরা ধনী থাকবেন দল ততই শক্তিশালী হবে। আর দেশে যত সত্যিকারের শিক্ষিত মানুষ হবেন দেশের মানুষকে বোকা বানানো ততই কঠিন হবে। তাই তো সরকার শিক্ষার প্রসার ঠিকই ঘটাতে চায় কিন্তু এটাও নিশ্চিত করতে চায় যে সঙ্গে যেন শিক্ষার মানের প্রসার না ঘটে। এই জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দে এত কার্পণ্য।
লেখক
অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
