আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চামড়া শিল্পে অর্থায়নের সুযোগ দিতে এ খাতের খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার বিশেষ সুবিধা দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বছর বছর ঋণ নিয়ে ফেরত না দিলেও আবারও মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে চামড়া ব্যবসায়ীরা ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ পাচ্ছেন। এর আগেও দুইবার এমন সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। তবে পুনঃতফসিলের পর আবারও খেলাপি হয়ে পড়েন অধিকাংশ ট্যানারি মালিক। এবারও এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ খেলাপি ঋণ সর্বোচ্চ ৮ বছরে পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হলো।
চামড়া শিল্প মালিকদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি সরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের সঙ্গে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকেই চামড়া শিল্পে অর্থায়নের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ট্যানারি শিল্পে নতুন করে ঋণ প্রদানে রাজি হলেও কোরবানির চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবি জানান। এরপরই কোরবানি ঈদের আগে ট্যানারি মালিকদের অর্থায়ন করতে খেলাপি ঋণ নিয়মিতকরণের সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রসঙ্গত, চামড়া খাতে দেওয়া ঋণের অধিকাংশই সরকারি ব্যাংকগুলোর।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করা হয়েছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ এর ৪৫ ধারায় ক্ষমতাবলে এ নির্দেশনা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে। সার্কুলারে বলা হয়েছে, বিভিন্ন কারণে চামড়া খাতে বিদ্যমান ঋণ নিয়মিতভাবে পরিশোধিত না হওয়ায় কিছু কিছু ঋণ বিরূপমানে শ্রেণিকৃত হয়ে পড়ছে। ফলে এ খাতে স্বাভাবিক ঋণপ্রবাহ বজায় রাখা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানিকৃত পশুর চামড়া কেনাবেচা ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে কাঁচা চামড়া কেনার জন্য প্রকৃত চামড়া ব্যবসায়ীদের অর্থপ্রবাহ সচল রাখার উদ্দেশে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ সুবিধা দিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
সার্কুলার অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৩০ জুন ভিত্তিক ঋণ স্থিতির ন্যূনতম ২ শতাংশ নগদ ডাউন পেমেন্টে পুনঃতফসিল করার বিষয়ে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ব্যাংকগুলো নিজেরাই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে। এক্ষেত্রে ইতিপূর্বে সংশ্লিষ্ট ঋণ হিসাবে আদায়কৃত কিস্তি ডাউন পেমেন্ট হিসেবে গণ্য হবে না। গ্রাহকের নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কারণে ঋণ হিসাব শ্রেণিকৃত হয়ে থাকলে এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সচল বা চলমান থাকলে এ সার্কুলারের আওতায় পুনঃতফসিল সুবিধা প্রদান করা যাবে। কেইস-টু-কেইস ভিত্তিতে এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ তলবি ও চলমান ঋণ সর্বোচ্চ ৬ বছর মেয়াদে এবং মেয়াদি ঋণ সর্বোচ্চ ৮ বছর মেয়াদে পুনঃতফসিল করা যাবে।
কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া কেনার উদ্দেশে নতুন ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে কম্প্রোমাইজড অ্যামাউন্ট গ্রহণের শর্ত শিথিল করা যাবে। আগামী ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে স্ব-স্ব ব্যাংকের কাছে এ সার্কুলারের আওতায় গ্রাহকদের ঋণ পুনঃতফসিলের আবেদন করতে হবে। ওই ডাউন পেমেন্টের মাধ্যমে নতুন করে ঋণও নিতে পারবেন চামড়া শিল্প মালিকরা।
জানা গেছে, রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকেই ট্যানারি মালিকদের দফায় দফায় ঋণসুবিধা দিচ্ছে সরকার। কোরবানির ঈদের চামড়া সংগ্রহকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর ব্যাংকগুলো ট্যানারি মালিকদের অর্থায়ন করলেও কোরবানির চামড়ার দাম পাচ্ছেন না। গত বছর চামড়ার অস্বাভাবিক দরপতনের পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই কোরবানি পশুর চামড়া রাস্তায় ফেলে দেন, কেউ কেউ মাটিতেও পুঁতে ফেলেন। আবার চামড়া কেনার জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও তা ফেরতও দিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। ফলে এ শিল্পে দেওয়া ঋণের বড় অংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সার্বিকভাবে চামড়াশিল্পে ব্যাংকঋণের পরিমাণ ৭ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু কাঁচা চামড়া কেনার জন্যই ট্যানারি মালিকদের দেওয়া হয়েছে ৩ হাজার ৬১২ কোটি টাকা। বাকি ৪ হাজার ৯৪ টাকা বিতরণ করা হয়েছে চামড়াজাত পণ্য তৈরিতে। বিতরণ করা ৭ হাজার ৭০৭ কোটি টাকার মধ্যে ৮০ শতাংশই খেলাপি। যদিও এই ঋণের বড় অংশই বিশেষ সুবিধায় মাত্র ৭ শতাংশ সুদে বিতরণ করা হয়েছিল।
জানা গেছে, চামড়া খাতে বিতরণ করা ঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ গেছে ক্রিসেন্ট গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠানে, যাদের বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকা অর্থপাচারের মামলা রয়েছে।
জানা যায়, ২০০৮ সাল থেকেই ট্যানারি শিল্পের ঋণে বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। সে সময় হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প সাভারে স্থানান্তরের বিষয়ে সৃষ্ট ব্যাংকঋণ সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে বেশ কিছু সুবিধা দিতে সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল।
এরপর ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় একই রকমের সুবিধা দিয়ে নির্দেশনা জারি করে। ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, যেসব ট্যানারি সাভারে স্থানান্তর পর্যায়ে রয়েছে বা স্থানান্তর হয়ে গেছে, সেসব ট্যানারির অনিয়মিত ঋণ ব্লক হিসেবে স্থানান্তর, গ্রেস পিরিয়ড সুবিধা প্রদান ও ঋণের জন্য নমনীয় পরিশোধ সূচি নিরূপণ করা যাবে এবং ব্লক হিসেবে স্থানান্তরিত ঋণের জন্য এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ সর্বোচ্চ ৮ বছর পরিশোধ সময়কাল হিসেবে বিবেচনা করা যাবে। এছাড়া এ ধরনের ঋণের প্রযোজ্য ক্ষেত্রে অনারোপিত সুদ, স্থগিত সুদ খাতে রক্ষিত সুদ ও দণ্ড সুদ আংশিক বা সম্পূর্ণ মওকুফ করা যাবে। ট্যানারি মালিকরা এ সুযোগ নিলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। খেলাপি ঋণ এ খাতে বেড়েই চলেছে।
গতকালের সার্কুলারে উল্লেখ করে বলা হয়, চামড়া শিল্প দেশীয় কাঁচামাল ভিত্তিক রপ্তানিমুখী শিল্প। জাতীয় প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং মূল্য সংযোজনের নিরিখে এটি একটি সম্ভাবনাময় খাত। চামড়া শিল্পে সারা বছর ধরে ব্যবহৃত কাঁচামালের প্রায় অর্ধেক জোগান আসে প্রতি বছর ঈদুল আজহায় কোরবানির পশুর চামড়া থেকে। এ সময় কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হলে একদিকে মূল্যবান কাঁচামাল সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে, অন্যদিকে কোরবানিকৃত পশুর চামড়া বিক্রির মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী আর্থিকভাবে উপকৃত হবে।
