ঘন ঘন নীতি পরিবর্তন

অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ হুমকিতে

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২০, ০৬:৪০ এএম

দেশে ব্যবসার পরিবেশের নাজুক অবস্থার চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ব্যবসা সহজীকরণ সূচকে। এখানে ১৯০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ব্যবসা-বাণিজ্য বিকাশে সরকারের ঘন ঘন নীতি- কৌশল পরিবর্তনই এক্ষেত্রে বড় বাধা। বারবার নীতি-কৌশল পরিবর্তন করলে ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে, বিনিয়োগে আগ্রহ হারান। বিশ্বের যেকোনো দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণের মূলমন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয় দেশি বিনিয়োগকারীদের সন্তুষ্ট করা। দেশি বিনিয়োগকারীদের হাত ধরেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী হন। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টো। সরকার দেশজুড়ে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে বেশ আগে। ১০ বছর কর রেয়াতসহ নানা সুবিধা দেওয়ায় সেসব অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়াও ফেলেছে। কিন্তু অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ঘন ঘন নীতি-কৌশল পরিবর্তনের পাশাপাশি ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে জমির লিজ ভাড়ার ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট চাপাতে যাচ্ছে সরকার। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে অর্থনৈতিক অঞ্চলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে নিরুৎসাহী হবেন মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজার) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী  বলেন, ‘বাংলাদেশে এমনিতেই ব্যবসা করা কঠিন। তার ওপর করোনার কারণে  ব্যবসায় মন্দা চলছে। সেখানে জমির ওপর বাড়তি ১৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ করলে ব্যবসা করা আরও কঠিন হয়ে যাবে। ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করতে আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় অনুরোধ করেছি। আশা করছি, এই ভ্যাট প্রত্যাহার করা হবে।’

নতুন করে ভ্যাট আরোপে উদ্বিগ্ন অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করা ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো। নতুন করে ভ্যাট আরোপের পাশাপাশি বেশ কিছু নতুন জটিলতার কারণে ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। এ ছাড়া বিনিয়োগের ফলে বিনিয়োগকারীরা যে সুবিধা পেয়ে আসছেন তা-ও অনিশ্চয়তায় পড়ে গেল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে (পিএমও) পাঠানো চিঠিতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। সরকারের নতুন নীতির কারণে কীভাবে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ হুমকিতে পড়ছে এবং লাখ লাখ চাকরি সৃষ্টির সম্ভাবনা নষ্ট হতে বসেছে, তারও উল্লেখ রয়েছে চিঠিতে। ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নে কাজ করছে বেজা। সংস্থাটি এরই মধ্যে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব পেয়েছে। কিন্তু স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা বলছেন, ঘন ঘন নীতি-কৌশল পরিবর্তনের কারণে তারা আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছেন। ভ্যাট নিয়ে বেজার কাছ থেকে নতুন চিঠি পাওয়ার পর তাদের আগ্রহ কমছে। বেজার কর্মকর্তারাও বলছেন, জমির মূল্যের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ হলে ব্যবসার খরচ বাড়বে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, একদিকে ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন, অন্যদিকে নতুন শঙ্কা তৈরি করেছে সরকারের শুল্ক ও ভ্যাট নীতি থেকে সরে আসা। এতে অর্থনৈতিক অঞ্চলে তাদের বিনিয়োগ হুমকিতে পড়ল।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, ‘অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ টানতে হলে অবশ্যই নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও নিশ্চয়তা থাকতে হবে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ন্যায্য দাবির প্রতি এফবিসিসিআইয়ের সমর্থন সব সময় রয়েছে।’

ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের ফলে ট্যাক্স হলিডে সুবিধা পাওয়ার কথা। তা পাওয়ার জন্য আমরা অপেক্ষা করছি, যেখানে বিবেচনা করা হবে না কোনো ধরনের পণ্য উৎপাদন করা হচ্ছে।’ বেজার প্লট বুঝিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও বিলম্ব করা হচ্ছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

২০১৮ সালে বাস্তবায়ন শুরু হওয়া নতুন ভ্যাট আইনে জমিকে উপকরণ বা ‘ইনপুট’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে জমিকে ইনপুট হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। ফলে আগে পণ্যের উৎপাদন খরচের সঙ্গে ভ্যাটের সমন্বয়ের সুযোগ থাকলেও নতুন বাজেটে সেই সুযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এতে ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ বাড়বে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত