স্বাস্থ্যের ঠিকাদার চক্র

আউটসোর্সিং জনবল সরবরাহের টেন্ডারেও জালিয়াতি

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২০, ০৬:০৯ এএম

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আউটসোর্সিং পদ্ধতির জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। অধিদপ্তরের লাইফস্টাইল হেলথ এডুকেশন ও প্রমোশন বিভাগে ৪৩ জনকে নিয়োগে টেন্ডার কমিটির কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব জালিয়াতি করেছে বলে প্রাপ্ত নথি বিশ্লেষণে জানা গেছে। এ বিষয়ে গত সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক  (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের

কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন জনবল সরবরাহকারী গালফ সিকিউরিটি সার্ভিসেস প্রাইভেট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান শেখ মঞ্জিলা ফারুক। এরপর অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠনের জন্য অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছেন ডিজি।

প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রটোকল অফিসার-১ পরিচয় দেওয়া মঞ্জিলা ফারুক লিখিত অভিযোগে বলেন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতাধীন লাইফস্টাইল, হেলথ এডুকেশন ও প্রমোশনের অপারেশনাল প্লানের সংস্থান অনুযায়ী আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ৪৩ জনবল নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। পদগুলো হচ্ছেÑ অডিও ভিজ্যুয়াল অপারেটর পাঁচজন, হিসাবরক্ষক একজন, গাড়িচালক ২৮ জন, অডিও ভিজ্যুয়াল হেলপার পাঁচজন, নিরাপত্তাকর্মী দুজন ও সুইপার দুজন। এজন্য ১ জুলাই দরপত্র দাখিলের তারিখ নির্ধারণ করে স্বীকৃত জনবল সরবরাহকারী ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পুনঃদরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্রের শর্তে বলা হয়, গত পাঁচ বছরের মধ্যে একক কার্যাদেশে মেডিকেল সেক্টরে আউটসোর্সিংয়ে ১০০ জনবল সরবরাহের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। একই সঙ্গে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ঠিকাদার সংস্থার হালনাগাদ (২০১৯-২০ অর্থবছরের) সনদ থাকতে হবে। এছাড়া ১ কোটি টাকার সমপরিমাণ ব্যাংক সলভেন্সি সনদ থাকতে হবে। কিন্তু দরপত্রে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান আল-মমিন আউটসোর্সিং সার্ভিসেস লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের কোনো অভিজ্ঞতা ও কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের ঠিকাদার সংস্থার হালনাগাদ সনদ ছিল না। এমনকি শর্ত অনুসারে ১ কোটি টাকার লিকুইড অ্যাসেটস ও ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ক্রেডিট লাইনও তাদের ছিল না। আল-মমিনের মতো আরও একাধিক প্রতিষ্ঠান জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া নথিপত্র দাখিল করে দরপত্রে অংশ নেয়। আল-মমিন সিকিউরিটিসহ দরপত্র দাখিল করা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নথিপত্র যাচাই করে নকল ও ভুয়া নথিপত্র দাখিলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেছেন তিনি।

প্রাপ্ত নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, আল-মমিন আউটসোর্সিং সার্ভিসের ১ কোটি টাকার লিকুইড বা অনুমোদিত ক্রেডিট সুবিধার বিষয়ে যাচাই করতে গত সোমবার সিটি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইফস্টাইল, হেলথ এডুকেশন ও প্রমোশন বিভাগের লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. আবু জাহের। পরদিন তাকে সিটি ব্যাংকের ধানমণ্ডি শাখার রিলেশনশিপ ম্যানেজার সৈয়দ মাহফুজ কামাল স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ‘আল-মমিন সিকিউরিটিজের সঙ্গে ক্রেডিট লিমিটেডের চুক্তি আগেই শেষ হয়েছে। এখন তাদের সঙ্গে কোনো ক্রেডিট চুক্তি নেই।’

তবে মঞ্জিলা ফারুকের অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করে আল-মমিন সার্ভিসের আউটসোর্সিং স্বত্বাধিকারী মোমিনুল ইসলাম মুমিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিযোগের কপি আমি নিজেও সংগ্রহ করেছি। তবে সেখানে আমার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যেসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বানোয়াট। দরপত্রের শর্ত অনুসারে আমি আমার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যেসব নথিপত্র জমা দিয়েছি তার সবকিছুই আসল এবং সঠিক, যা সঠিক তদন্ত করলেই বেরিয়ে আসবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইফস্টাইল, হেলথ এডুকেশন ও প্রমোশন বিভাগের লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. আবু জাহের বলেন, ‘আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে ৪৩ জনবল নিয়োগ টেন্ডারে একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ জমা হয়েছে আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি এই বিভাগে নতুন যোগ দিয়েছি। আগে অনেক অনিয়ম হয়েছে। এখন অনেক কিছুই পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এখানে কোনো অনিয়ম, দুর্নীতি ও জাল-জালিয়াতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগের যেসব অভিযোগ মিলেছে সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে বা অনিয়মের সঙ্গে বিভাগের কারও সম্পৃক্ততা মিললে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত