চামড়া শিল্প দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিমুখী শিল্প খাত। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য খাতের উন্নয়নে দীর্ঘদিন ধরে নানা রূপরেখা প্রণীত হলেও অত্যন্ত সম্ভাবনাময় এই শিল্পের সংকট কাটছে না। গত বছর কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে চামড়া শিল্পে নজিরবিহীন সংকট দেখা যায়। কাঁচা চামড়ার দাম অস্বাভাবিক কমে যাওয়ায় চামড়া রাস্তায় ফেলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। অনেক চামড়া রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। দুঃখজনক বিষয় হলো গত বছর যেসব কারণে ওই সংকট তৈরি হয়েছিল সে-সবের বেশিরভাগেরই কোনো সুরাহা হয়নি। এদিকে বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে দেশে-বিদেশে চামড়া শিল্পের সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। এ অবস্থায় আর মাত্র তিন সপ্তাহ পরই আসছে চামড়া শিল্পের সবচেয়ে বড় সংগ্রহ মৌসুম, ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। চামড়া শিল্পের উদ্যোক্তা এবং শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করোনার কারণে এবার সংকট আরও বাড়তে পারে।
রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘ঈদে চামড়া নিয়ে এবারও সংকটের আশঙ্কা’ শিরোনামের প্রতিবেদনে চামড়া শিল্পের এ সংকটের কথা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত বছর কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে তৈরি হওয়া সংকট উত্তরণ এবং চামড়া শিল্প রক্ষায় গত বছরের অক্টোবরে চারটি মন্ত্রণালয় ও বেশ কয়েকটি বিভাগের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় গত বছরের মতো এবারও কোরবানিতে পশুর চামড়া নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন তিনজন মন্ত্রী। কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, সভায় এ খাতের সমস্যা সমাধানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু সেসবের বেশির ভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে শিল্প সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, তথ্য মন্ত্রণালয় ও জেলা উপজেলায় এ-সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া হলেও বেশিরভাগ বিষয় বাস্তবায়ন হয়নি। এ ছাড়া চামড়াশিল্পের জন্য ব্যাংকঋণ একটি অন্যতম ইস্যু ছিল। কিছু সমস্যা সমাধানে অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু ব্যাংকগুলোর কঠিন শর্তের কারণে সুফল পেতে সমস্যা হয়।
কোরবানি ঘিরে চামড়া নিয়ে সংকটের নেপথ্যে মূল কারণ চামড়া কেনায় ব্যবসায়ীদের অনীহা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দুই বছর ধরে তারা চামড়া বিক্রি করতে পারছেন না। এবার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনা সমস্যা। আগে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীরা চামড়া সংগ্রহ করত। এবার সেটা হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। লক্ষ করা দরকার, ফেব্রুয়ারিতে টাস্কফোর্সের প্রথম সভায় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ট্যানারি মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে ছিল ঈদের এক মাস আগে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে ব্যাপকভাবে প্রচার, এক মাস আগে ট্যানারির মালিক ও আড়তদারদের চামড়া কেনার প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ সরকারের আর্থিক সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া। এছাড়া মৌসুমি ব্যবসায়ী ও ট্যানারির মালিকরা যথাসময়ে চামড়া কিনতে অনাগ্রহী হলে সরকারিভাবে কিনে ২-৩ মাসের জন্য চামড়া গুদামজাত করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল টাস্কফোর্স। পাশাপাশি সারা দেশে মসজিদের ইমাম, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, এতিমখানা ও মাদ্রাসার প্রধানদের চামড়া নিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছিল। আর সরকার নির্ধারিত মূল্যে চামড়া বেচাকেনা হয় কি না, তা মনিটরিং করতে জেলা প্রশাসক ও ইউএনওদের সম্পৃক্ত করার কথা। কিন্তু ঈদের মাত্র তিন সপ্তাহ বাকি থাকলেও সিদ্ধান্তগুলো এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সারা বছর দেশে প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া জবাই হয়। এর অর্ধেকই হয় কোরবানির ঈদে।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, বিগত ২০১৯-২০ অর্থবছরের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে সব মিলিয়ে আয় হয়েছে ১০ কোটি ৬১ লাখ ডলার। এর মধ্যে ৭ কোটি ২৩ লাখ ডলারের চামড়ার জুতা, ২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের চামড়াপণ্য ও ৯০ লাখ ডলারের চামড়া রপ্তানি হয়েছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বেড়েছে ১৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ গত বছরের কোরবানির মৌসুমের নজিরবিহীন সংকটের পরও চামড়াজাত পণ্যের বাজারে তার তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। এক্ষেত্রে প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারকদের আগের মজুদ বড় ভূমিকা রেখেছে। ফলে দেশের ও আন্তর্জাতিক বাজারে করোনাকালীন সংকট বিরাজমান থাকলেও যথাযথভাবে চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে পারলে তা আগামীতে ইতিবাচক ফল দেবে। এজন্য টাস্কফোর্সের সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করা এবং ট্যানারি মালিক, চামড়ার আড়তদার এবং পাইকারি চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়ে দ্রুত মাঠে নামা প্রয়োজন সরকারের। একই সঙ্গে সাভারের ট্যানারি প্রকল্পে সব কারখানার ইটিপি বাস্তবায়ন করে চামড়া রপ্তানিতে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কমপ্লায়েন্সের সংকটও দ্রুত দূর করতে হবে।
