বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন বিশিষ্ট শিল্পপতি ও যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম বাবুল (৭৪)। ‘গার্ড অব অনার’ শেষে গতকাল মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় তাকে দাফন করা হয়। এর আগে বাদ জোহর যমুনা ফিউচার পার্ক প্রাঙ্গণে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। সামাজিক দূরত্ব মেনে তার জানাজায় সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অংশ নেন।
জানাজায় নূরুল ইসলামের ছেলে যমুনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শামীম ইসলাম বাবার অসমাপ্ত কাজ চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। যমুনা পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা মনোবল হারাবেন না। আমার বাবা আজীবন দেশের জন্য কাজ করেছেন। আমরাও সবাই মিলে দেশের মানুষের কল্যাণে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাবার দেখানো পথে কাজ করে যাব।’
রাষ্ট্রীয় মর্যদায় বনানীতে শিল্পপতি বাবুলের দাফন
মারকাজুল ইসলাম হাসপাতালের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত লাশবাহী গাড়িতে করে এভারকেয়ার হাসপাতালের হিমঘর থেকে নুরুল ইসলামের মরদেহ নিয়ে আসা হয় যমুনা ফিউচার পার্ক প্রাঙ্গণে। সেখানে সাদা কাপড়ে মোড়ানো মঞ্চ আগেই তৈরি করে রাখা ছিল। ওই মঞ্চের ওপর রাখা হয় নুরুল ইসলামের কফিন। ওই কফিন মুড়িয়ে দেওয়া হয় লাল-সবুজের পতাকায়। এই মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের অংশ হিসেবে ঢাকা জেলা প্রশাসন মরহুমের মরদেহ জাতীয় পতাকায় ঢেকে দেয়। এছাড়া জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. শহীদুল ইসলামের পক্ষ থেকে নুরুল ইসলামের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।
দুপুর পৌনে ২টার দিকে জানাজার নামাজ শুরু হয়। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন যমুনা ফিউচার পার্ক জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব মুফতি ইয়াকুব শরীফ। এতে মন্ত্রিসভার সদস্য ও বিভিন্ন রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, সামাজিক, স্বেচ্ছাসেবী ও সাংস্কৃতিক দল ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
জানাজার নামাজ শেষে রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া হয়। ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ইশতিয়াক আহমেদের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল এই মুক্তিযোদ্ধাকে বিদায়ী অভিবাদন ও সংগ্রামী সম্মান জানান।
যুগান্তর পরিবারের পক্ষ থেকে যমুনা গ্রুপেরর এমডি শামীম ইসলাম ও যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম এবং চিফ রিপোর্টার মাসুদ করিম শ্রদ্ধা জানান। যমুনা টেলিভিশন পরিবারের পক্ষে প্রধান বার্তা সম্পাদক ফাহিম আহমেদের নেতৃত্বে সাংবাদিক ও কর্মকর্তারা শেষ শ্রদ্ধা জানান।
নুরুল ইসলামকে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শন ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের আয়োজন করায় পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, ঢাকা জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসনের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা হয়।
যমুনা গ্রুপের পরিচালক ড. মো. আলমগীর আলম বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়, ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা প্রশাসন এবং ঢাকা মহানগর পুলিশসহ পুলিশ প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এভারকেয়ার হাসপাতালে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান চিকিৎসাধীন ছিলেন। সুস্থতার জন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। এছাড়া চীনের তিনটি হাসপাতাল এবং সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের চিকিৎসকরা টেলি কনফারেন্সের মাধ্যমে পরামর্শ দিয়েছেন।
বনানীর কবরস্থানে খোঁড়া কবরে নূরুল ইসলামের মরদেহ নামাতেই ব্যাকুল হয়ে ওঠেন তার স্ত্রী অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি। বিলাপ করে বলতে থাকেন, ‘তোমায় ছাড়া কী করে থাকব, আমাদের এতিম করে চলে গেলে। তুমি ভালো মানুষ, আল্লাহ তোমায় ভালো রাখবে।’ এসময় তার ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি ও পরিবারের অন্য সদস্যরাও কান্নায় ভেঙে পড়েন।
শিল্পপতি বাবুল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ১৪ জুন রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে (সাবেক অ্যাপোলো) ভর্তি হয়েছিলেন। সোমবার বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নূরুল ইসলাম ১৯৭৪ সালে যমুনা গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন। ৪৬ বছরে একে একে গড়ে তোলেন ৪১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ১৯৪৬ সালে নবাবগঞ্জের চুড়াইন ইউনিয়নের কামারখোলা গ্রামের এক মধ্যবিত্ত সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নুরুল ইসলাম। তার বাবার নাম আমজাদ হোসেন। মায়ের নাম জমিলা খাতুন। তার স্ত্রী সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী, বর্তমান জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত এমপি যমুনা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমা ইসলাম। ছেলে শামীম ইসলাম যমুনা গ্রুপের এমডি। তিন মেয়ে সারীয়াত তাসরীন সোনিয়া, মনিকা নাজনীন ইসলাম এবং সুমাইয়া রোজালিন ইসলাম যমুনা গ্রুপের পরিচালক।
