শন পোলকের রক্তে ক্রিকেট। চাচা গ্রায়েম পোলক ছিলেন সর্বকালের সেরাদের একজন। স্বয়ং ডন ব্র্যাডম্যান তাকে সেরা বাঁহাতি ব্যাটসম্যান মানতেন। যদিও ২৩ টেস্টে ২২৫৬ রানে গ্রায়েমকে চেনা যায় না। প্রতিভার আভাস দেয় তার ৬০.৯৭ গড়। বর্ণবৈষম্যের জন্য দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত না হলে দুনিয়া হয়তো সত্যিকারের গ্রায়েমকে দেখত। ফার্স্ট ক্লাসে ২৬২ ম্যাচে ৬৪ সেঞ্চুরি তার শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য বহন করছে। গ্রায়েম পোলকের ছোট ভাই পিটার ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার পেসার। সেই পিটারের ছেলে হচ্ছেন শন। তাই বড় ক্রিকেটার না হয়ে তার উপায় ছিল না।
নিজের সময়ের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হয়ে পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষা করেছেন শন পোলক। ১০৮ টেস্টে ২৩.১১ গড়ে ৪২১ উইকেট নিয়েছেন। ৩০৩ ওয়ানডেতে তার উইকেট সংখ্যা ৩৯৩। এক দিনের ক্রিকেটে ২৬.৪৫ গড়ে ৩৫১৯ রান করেছেন। টেস্টে ৩২.৩১ গড়ে রান করেছেন ৩৭৮১। টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে প্রথম ৪০০ উইকেট নেওয়া বোলার তিনি। কিছু দিন হলো তার রেকর্ড ভেঙেছেন ডেল স্টেইন। অলরাউন্ডার হিসেবে গড়া তার রেকর্ডও ঈর্ষণীয়। পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি অনায়াসে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ঢুকে যেতে পারবেন। কপিল, ইমরান কিংবা ইয়ান
বোথামদের চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিলেন না। দলের ওপর তার প্রভাবের কথা বললে একটা বিলবোর্ডের গল্প বলতে হবে।
২০০৩ সালে বিশ্বকাপের আসর বসেছিল দক্ষিণ আফ্রিকায়। শন পোলক তখন স্বাগতিক অধিনায়ক। কেপটাউন এয়ারপোর্টের বাইরে সাউথ আফ্রিকান এয়ারওয়েজ অদ্ভুত একটা বিলবোর্ড লাগিয়েছিল। তাতে লেখা ছিল ‘পলি, ওদের সবাইকে আমরা এ দেশে নিয়ে আসছি কিন্তু ওদের ফেরত পাঠানোর দায়িত্ব তোমার।’ কিন্তু পরিতাপের বিষয়, পলির দল সুপার সিক্সে উঠতে ব্যর্থ হয়। দায় অবশ্য অধিনায়কের ছিল না। বড় টুর্নামেন্টে দক্ষিণ আফ্রিকা সব সময়ই ‘চোকার্স’।
১৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে পোলকের সাফল্য অনেক। অ্যালান ডোনাল্ড আর মাখায়া এনটিনির সঙ্গে ভয়ংকর বোলিং জুটি গড়েছেন। এই শতাব্দীর শুরুতে তাদের দাপট ছিল দেখার মতো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৮০০’র বেশি উইকেট নিয়েছেন। তিনিসহ আর ছয়জন বোলারের এত উইকেট নেওয়ার রেকর্ড আছে। বলাবাহুল্য, সেই ছয়জন সর্বকালের সেরা। মুত্তিয়া মুরালিধরন, শেন ওয়ার্ন, অনিল কুম্বলে, ওয়াসিম আকরাম, গ্লেন ম্যাকগ্রা এবং জেমস অ্যান্ডারসন। টেস্টে ৪০০ উইকেট আর তিন হাজার রান আছে মাত্র পাঁচ ক্রিকেটারের। এই পাঁচজনের একজন শন পোলক।
সেঞ্চুরিয়নে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ১৯৯৫ সালে টেস্ট অভিষেক শন পোলকের। ৯৮ রানে ৩ উইকেট নিয়েছিলেন সে টেস্টে। টেস্ট ক্যাপ মাথায় তোলার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে পরে বলেছিলেন, ‘আমি আমার চাচা এবং বাবার মতো হতে চাইতাম। প্রথম যেদিন টেস্ট ক্যাপ মাথায় পরে মাঠে পা রাখলাম সেদিন আমার স্বপ্ন সত্যি হয়েছিল। ওটা আমার কাছে বিশেষ মুহূর্ত। প্রথম কয়েকটা বলের কথা মনে আছে। অফস্টাম্পের বাইরে বল রাখার চেষ্টা করছিলাম। উত্তেজনায় আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছিল। উইকেটে ছিল গ্রাহাম থর্প। আমার ডাউন দ্য লেগ সাইডের একটা বল খেলতে গিয়ে সে আউট হলো। আমি টেস্টে প্রথম উইকেট পেলাম।’
কাউন্টিতে টানা চার বলে চার উইকেট নেওয়ার রেকর্ড আছে পোলকের। ওয়ার্কশায়ারের হয়ে লিস্টারশায়ারের বিপক্ষে ২১ রানে ৬ উইকেট নিয়েছিলেন। এজবাস্টনের সেই কীর্তি সম্পর্কে পোলক বলেন, ‘আমি কাউন্টি খেলতে এসেছিলাম লারার সেই (৫০১*) পারফরম্যান্সের পর। তখন কাউন্টি ক্রিকেটের প্রতি সবার মনোযোগ ছিল। ওয়ার্কশায়ারের হয়ে অভিষেক ম্যাচে প্রথম চার বলে নিয়েছিলাম চার উইকেট। অভিষেকে এমন পারফরম্যান্সের পর ড্রেসিংরুমে আমার প্রভাব বেড়ে গিয়েছিল।’
১৯৯৮ সালের অ্যাডিলেড টেস্ট শন পোলকের পারফরম্যান্সে উজ্জ্বল হয়ে আছে। ব্যাটে ৪০ রানের পাশাপাশি ৮৭ রানে ৭ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে যোগ করেন আরও ২ উইকেট্। টেস্টে এটাই পোলকের সেরা বোলিং। ম্যাচ ড্র হয়েছিল। পরে পোলক বলেছিলেন, ‘সেরা বোলিং ফিগারের জন্য এই টেস্ট আমার কাছে স্পেশাল। উইকেট ফাস্ট বোলিংয়ের আদর্শ ছিল না। তবু উইকেট পেয়েছিলাম। আমার বাউন্সার মার্ক ওয়াহর কনুইয়ে গিয়ে লাগে। হাত থেকে ব্যাট খসে স্টাম্পের ওপর পড়েছিল। যদিও টেস্টটা জিততে পারিনি। তবে বোলিংয়ে আনন্দ পেয়েছিলাম।’
শন পোলকের ক্যারিয়ারে বোলিং ঐশ্বর্যের অভাব নেই। লাল বল হাতে তিনি ছিলেন সময়ের সেরা। ব্যাট হাতে তার কৃতিত্ব ঢাকা পড়েছে বোলিং-কীর্তির আড়ালে। আজ সেই ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডারের ৪৭তম জন্মদিন।
