করোনা পরীক্ষার সনদ জালিয়াতির মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ডে থাকা ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ওরফে সাবরিনা শারমিন হুসাইনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও ৭ দিনের রিমান্ড চেয়ে আজ শুক্রবার আদালতে পাঠাবে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগ (ডিবি)। সাবরিনা ও তার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরীকে ডিবি কার্যালয়ে কয়েক দফায় মুখোমুখি ও আলাদাভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তারা সেখানে পরস্পরকে দোষারোপ করেন। তখন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাদের অপরাধের একটি প্রমাণ হাজির করলে দুজনই চুপ হয়ে যান। তবে সাবরিনা পুলিশকে বলেন, তিনি আরিফের ষড়যন্ত্রের শিকার। মামলা তদন্তের দায়িত্বে থাকা এক ডিবি কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানান।
জেকেজির করোনা সনদ জালিয়াতি মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, ‘তাদের মুখোমুখি করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। যাতে তদন্তে কোনো ফাঁকফোকর না থাকে।’
দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদে কী তথ্য পাওয়া গেছেএমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চিরাচরিত যা হয়, একে অপরকে দোষ দেওয়া, এখানেও তাই হয়েছে। তবে সেখান থেকে তথ্য নিয়ে কাজ করতে হবে এবং আমরা তাই করছি।’
ডা. সাবরিনা জেকেজির সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় বলে দাবি করলেও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে মাসে মাসে টাকা নেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ। জেকেজি হেলথ কেয়ারের অফিস থেকে জব্দ করা কাগজপত্রের সঙ্গে সাবরিনার ‘টাকা তোলার রসিদ’ পাওয়া গেছে। সেগুলো তার সামনে উপস্থাপন করেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। তবে সেগুলোকেও ভুয়া বলার চেষ্টা করছেন ডা. সাবরিনা। ডা. সাবরিনার স্বাক্ষরযুক্ত টাকা তোলার কমপক্ষে তিনটি রসিদ তার সামনে তুলে ধরা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা পরীক্ষার সনদ জালিয়াতি থেকে উপার্জিত টাকার ভাগ নিয়ে আরিফ ও সাবরিনার মধ্যে বিরোধ ছিল। সাবরিনাকে পাঁচ লাখ টাকার একটি চেক দেন আরিফ। কিন্তু ওই চেকটি প্রত্যাখ্যাত হয়। সে কারণে তিনি আরিফকে উকিল নোটিস পাঠান। তাছাড়া আরিফ গ্রেপ্তার হওয়ার পরই নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তিনি তড়িঘড়ি করে আরিফকে তালাকের নোটিস পাঠান।
তদন্ত তদারকির দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাবরিনা ও আরিফ খুবই চতুর। তারা কৌশলে এড়ানোর চেষ্টা করছেন। সেজন্য আমরা মনস্তাত্ত্বিক কৌশল প্রয়োগ করে তাদের কাছ থেকে কথা বের করার চেষ্টা করছি।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে তারা পরস্পরকে তুই-তোকারি করে কথা বলেন। একজন অপরজনকে ‘জীবন ধ্বংস’-এর জন্য দায়ী করছেন।’
তদন্ত সংশ্লিষ্ট আরেকজন কর্মকর্তা জানান, জেকেজি ওভাল গ্রুপের অঙ্গ-সংগঠন (সিস্টার কনসার্ন)। ওভাল গ্রুপের সাত পরিচালকসহ অনেকেরই করোনা সনদ জালিয়াতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। ওভাল গ্রুপের সাত কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত আছে। ডিবি কর্মকর্তারা আশা করছেন তারা ওভাল গ্রুপের পরিচালকদের শিগগিরই গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হবেন। এছাড়া ডা. সাবরিনা ও আরিফকের কয়েক বন্ধু ও সহকর্মীর বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছে দুদক।
জেকেজির সঙ্গে সংশ্লিষ্টা ও করোনা সনদ জালিয়াতির কারণে গত ১২ জুলাই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর সাবরিনাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সঙ্গে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ।
দুদকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ : করোনার নমুনা সংগ্রহ করে কোনো পরীক্ষা না করেই ১৫ হাজার ৪৬০ জনকে ভুয়া রিপোর্ট সরবরাহ করে ৮ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ ডা. সাবরিনা ও আরিফের অবৈধ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। এজন্য কমিশনের উপপরিচালক সেলিনা আক্তার মনিকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে বলে কমিশনের পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য জানিয়েছেন। তিনি আরও জানান, জেকিজির করোনা সনদ জালিয়াতিসহ নানা অনিয়মের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলো তারা আমলে নিয়ে তদন্ত করছেন। কমিশনের অপর একজন কর্মকর্তা জানান, ইতিমধ্যে ডা. সাবরিনা ও আরিফের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে। তাদের আয়কর নথি তলব করা হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মাধ্যমে তাদের ব্যাংক লেনদেনের তথ্য সংগ্রহ ও অর্থ পাচারসহ সম্পদের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।
করোনা পরীক্ষার সনদ জালিয়াতির অভিযোগে গত ২৩ জুন জেকেজির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল হক চৌধুরীসহ প্রতিষ্ঠানটির ৬ কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ব্যাপারে মামলা হওয়ার পর ২৪ জুন করোনার নমুনা সংগ্রহের জন্য জেকেজির অনুমতি বাতিল করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পুলিশি তদন্তে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবে করোনা সনদ জালিয়াতিতে ডা. সাবরিনার নাম আসে। এরপর গত ১২ জুলাই তাকে গ্রেপ্তার করে ১৩ জুলাই তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। জেকেজির সিইও আরিফুল হক চৌধুরীকে গত বুধবার দ্বিতীয় দফায় চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে ডিবি পুলিশ। ডিবি কার্যালয়ে দুজনকেই জিজ্ঞাসাবাদ চলছে।
