অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিদের স্বপদে প্রত্যাবর্তন

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২০, ০৭:২৬ এএম

দেশ যখন করোনা-দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন কিছু জনপ্রতিনিধি দুর্যোগকেন্দ্রিক ত্রাণ তৎপরতাকে আখের গোছানোর মওকা হিসেবে নিয়েছেন। দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে অভিযোগ উঠেছে, এই জনপ্রতিনিধিরা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির চাল তছরুপ করেছেন, সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির আওতায় ১০ টাকা কেজির চাল নিজেদের ঘরে গুদামজাত করে রেখেছেন, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির তালিকায় নিজেদের আত্মীয়স্বজন ও সচ্ছল ব্যক্তিদের নাম ঢুকিয়েছেন। এসব দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বেশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধিকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে। কিন্তু সম্প্রতি সংবাদ পাওয়া গেছে, আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে অনেক জনপ্রতিনিধি স্বপদে ফিরে আসছেন।

গত শুক্রবার দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত ‘বরখাস্ত জনপ্রতিনিধিরা আদালতের কাঁধে ভর দিয়ে ফিরছেন স্বপদে’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩৫ জন ইউপি চেয়ারম্যান, ৬৬ ইউপি সদস্য, ১ জন জেলা পরিষদ সদস্য, ৪ পৌর কাউন্সিলর, ১ উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যানসহ ১০৭ জনকে বরখাস্ত করেছিল সরকার। কিন্তু তারা আবারও স্বপদে ফিরতে শুরু করেছেন। করোনার সময়ে ভার্চুয়াল আদালতের মাধ্যমে সরকারের আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে আসছেন তারা। আবার দায়িত্ব বুঝে নিচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষ আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে, অপরাধ করে এভাবে পদ ফিরে পেলে এসব দুর্নীতিবাজ আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবেন।

সারা দেশে প্রায় দেড় কোটি পরিবারের সোয়া ছয় কোটি মানুষকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার একটি শুভ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু সরকারের এ মহতী উদ্যোগের সফলতা ম্লান হয়ে যাচ্ছে দুর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধির কারণে। ত্রাণ কার্যক্রমে অনিয়ম ঠেকানোর জন্য তাদের বিরুদ্ধে সরকার নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ত্রাণে অনিয়ম ঠেকাতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাশাপাশি বিতরণ ও তালিকা তৈরিতে কিছু পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনা হচ্ছে। দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন এলাকায় সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের সহায়তা সুষ্ঠুভাবে বিলি-বণ্টন করতে ওয়ার্ড পর্যায়ে গঠন করা হয়েছে কমিটি। স্থানীয় কাউন্সিলরের নেতৃত্বে এ কমিটিতে আছেন এনজিও প্রতিনিধি, মসজিদের ইমাম, বিশিষ্ট তিনজন ব্যক্তি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের প্রতিনিধি, নারী সমাজকর্মী ও শিক্ষক প্রতিনিধি। ঢাকার দুই সিটিসহ ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রও এ কাজের সঙ্গে জড়িত হয়েছেন। এছাড়া জেলা পর্যায়ের অফিস প্রধান ও উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। এ কাজে উপজেলা পর্যায়ে সমবায় কর্মকর্তা, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, সাব-রেজিস্ট্রার, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের প্রকৌশলী, উপজেলা প্রকল্প উন্নয়ন কর্মকর্তাসহ ৩০ কর্মকর্তাকে যুক্ত করা হয়েছে। এরপরও গত কয়েক মাসে ১০৭ জনপ্রতিনিধি নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ এর ধারা (২৫)১ মামলা করা হয়েছে। বিধিমতে এসব মামলা তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। জেলাপ্রশাসকের কাছ থেকে লিখিতভাবে অভিযোগ পাওয়ার পর ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অপরাধমূলক কার্যক্রম জনস্বার্থের পরিপন্থী বিবেচিত হওয়ায় স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন ২০০৯-এর ৩৪(১) ধারা অনুযায়ী তাদের পদ হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, যেসব জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে, তাদের মধ্যে ৯০ জনই ক্ষমতাসীন রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পর দলের উচিত তাদের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া। দলীয় গঠনতন্ত্রে আছে, কোনো পদাধিকারী অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলে তিনি দলে থাকতে পারবেন না। কিন্তু এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বা অন্য কোনো দল কারও বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে বলে শোনা যায়নি। দল কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাময়িক বরখাস্ত হওয়া জনপ্রতিনিধিরা নানাভাবে স্বপদে ফিরে আসার এবং ত্রাণকাজে অংশ নেওয়ার জন্য চেষ্টা-তদবির চালাচ্ছেন। এই দুর্নীতিবাজরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী। আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে একবার পদে ফিরতে পারলে তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রভাবিত করতে পারেন বলেও আশঙ্কা আছে।

সরকার ইতিমধ্যে করোনা দুর্যোগের সময় ত্রাণ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে। প্রধানমন্ত্রীও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকার স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে যেমন কঠোর ভূমিকা গ্রহণের প্রত্যয় ব্যক্ত করছে, তেমনি এই ত্রাণ-দুর্নীতির বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা জরুরি। যেসব জনপ্রতিনিধি ইতিমধ্যে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন, তাদের কারও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ত্রাণকাজে জড়িত হওয়া প্রত্যাশিত নয়। প্রয়োজনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে অধিকতর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। উচ্চ আদালতে যাওয়ার ক্ষেত্রে দুর্নীতিগ্রস্ত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে জোরালো সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করা জরুরি, যাতে এই জনপ্রতিনিধিরা তাদের পুরনো পদে ফিরে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে অনৈতিক উপায় অবলম্বন করতে না পারেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত