করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে আশা ও আশঙ্কা

আপডেট : ২২ জুলাই ২০২০, ০৬:৪০ এএম

এই শতাব্দীর দুনিয়াব্যাপী আতঙ্ক ছড়ানো নাম করোনা বা কভিড-১৯। খুব ক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক এই ভাইরাসের উৎপত্তি চীনের উহানে গত বছরের ডিসেম্বর মাসে, কিন্তু মাত্র ছয় মাসে তা ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর সব প্রান্তে এবং প্রায় সব দেশে। প্রথমেই আশঙ্কা করা হয়েছিল যে এটি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। কতটা যে ভয়াবহ তা এতদিনে বুঝতে পেরেছে বিশ্ববাসী। ইতিমধ্যে ১৮৮টি দেশে প্রায় দেড় কোটি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন আর ৬ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটিয়ে এবং অর্থনীতিকে বিধ্বস্ত করে করোনা তার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। এই ভাইরাস যখন চীন সীমান্ত অতিক্রম করে ইউরোপ ও আমেরিকায় পাড়ি জমায়, তখন বিজ্ঞানীরা এর জিন সিকোয়েন্সিং করে তার নামকরণ করেন ডি-৬১৪। কিন্তু এই ভাইরাস যত ছড়িয়ে পড়ছে ততই তার নিজের গঠন ও চরিত্রে কিছু পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, কিছু নতুন বৈশিষ্ট্য অর্জন করছে, বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাকে বলা হয় রূপান্তর। বিজ্ঞানীরা সতর্ক পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে লক্ষ করেছেন যে, মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের সময় একেক অঞ্চলে এই ভাইরাসটি একেক ধরনের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। দফায় দফায় রূপান্তরের পর এখন যে ধরনের করোনাভাইরাস দ্বারা বিশ্বব্যাপী মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন, বিজ্ঞানীরা তাকে চিহ্নিত করেছেন জি-৬১৪ হিসেবে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শুরুর সময়ের চাইতে বর্তমানে এটি আরও বেশি মাত্রার সংক্রমণ ক্ষমতাসম্পন্ন।

যে কোনো ঘটনার পরস্পরবিরোধী দুটো দিক থাকে। এদের মধ্যে অবিরাম চলতে থাকে দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্বের কারণেই ঘটে পরিবর্তন। এই পরিবর্তনই প্রকৃতিতে এনেছে গতিময়তা। কোনো কিছুই এক জায়গায় স্থির থাকছে না। আকস্মিক ঘটনায় প্রাথমিকভাবে হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেও পরিবর্তনের নিয়ম জানাটাই বিজ্ঞানের কাজ। করোনাভাইরাস পরিবর্তনের সেই সত্যকে আবার দৃশ্যমান করে তুলেছে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়লেও বিজ্ঞানীদের কাজ থেমে থাকেনি। অদৃষ্টের দোহাই দিয়ে বসে থাকা বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞানীর ধর্ম নয়। তাই দেশে দেশে বিজ্ঞানীরা নিরলস পরিশ্রম আর ঝুঁকি নিয়ে এই নতুন বিপদের হাত থেকে মানবজাতিকে রক্ষার চেষ্টা চালিয়েছেন। ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে দুটো বিষয় মানুষের বিবেচনায় আছে। একটি হলো একে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দেওয়া আর একটি হলো প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো। ভ্যাকসিন এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাই ভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে দেশে দেশে। মানুষ আশায় আছে, সফলতা নিয়ে এটি বাজারে কবে আসবে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা বলছেন করোনাভাইরাস গত চার মাসে বাংলাদেশে প্রায় ৫৯০ বার নিজের মিউটেশন ঘটিয়েছে। এর মধ্যে ৮ বারের মিউটেশন ছিল একেবারে ইউনিক, অর্থাৎ নতুন ধরনের। ১৯ জুলাই সকালে বিসিএসআইআর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির বিজ্ঞানীরা এই তথ্য জানান। তারা আরও জানান, এই নতুন ধরনের মিউটেশনের তথ্য অন্যান্য দেশের বিজ্ঞানীদের জানাবেন যা করোনার প্রতিষেধক আবিষ্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনার জিনোম সিকোয়েন্স করা হয়েছে ২২২টি। এর মধ্যে বিসিএসআইআর করেছে ১৭৩টি। সর্বমোট ৩০০টি জিনোম সিকোয়েন্স করার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন তারা। ভাইরাসের মিউটেশনের নিয়মটা বুঝতে পারলে একে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।

সারা বিশ্ব থেকে করোনার ৬০ হাজার ভিন্ন জেনেটিক সিকোয়েন্স সংগ্রহ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষক দল ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকরা এর গতি-প্রকৃতি বুঝার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন অবিরাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষকরা বলেন, সব ভাইরাসের বিবর্তন বা মিউটেশন ঘটতে থাকে। করোনার মতো আরএনএ ভাইরাস অন্য ভাইরাসের চাইতে দ্রুত মিউটেশন ঘটায়। ভাইরাস আরও ভালোভাবে তার প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে এবং আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। যে কোনো মিউটেশন তাকে যে কোনো অর্থপূর্ণ আচরণ পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যেতে পারে। ভাইরাসের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক মিউটেশন আশা করা যায়। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা হচ্ছে করোনা ভাইরাসের কিছু বিশেষ দিক আছে যা অনেক জটিল। যেমন স্পাইক প্রোটিন যা থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে। যদি ভাইরাসের বিশেষ মিউটেশন ঘটে থাকে, তবে ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে তার প্রভাব পড়বে। কিন্তু পরিবর্তনের এই প্রকৃতিতে মানুষ পরিবর্তনের নিয়ম জানার চেষ্টা করেছে সবসময়। কার্যকারণ যত ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে তত ভালোভাবেই মানুষ সমস্যা সমাধান করতে পেরেছে। কখনো কখনো কারণ বুঝতে সময় লেগেছে অনেক কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ পথেই মানুষ সমস্যা মোকবিলা করেছে। যেমন সিফিলিস সারা ইউরোপ তো বটেই বিশ্বকেই ৬০০ বছর প্রচণ্ড যন্ত্রণা দিয়েছে। অবশেষে বিজ্ঞানী ফ্লেমিংয়ের পেনিসিলিন আবিষ্কার মানুষকে এই মারণঘাতী সিফিলিসের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছে। একথা বলা যায় সব ক্ষেত্রেই। যক্ষ্মা, প্লেগ, কুষ্ঠ, ম্যালেরিয়া, কলেরা, ডায়রিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এসব এখন মানুষের জ্ঞানের আওতায় এবং সাধ্যের নিয়ন্ত্রণে। যদিও পথটা সরল এবং কাজটা সহজ ছিল না। গোঁড়া ধর্মবিশ্বাসীরা অসুস্থতাকে পাপের ফল হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, স্রষ্টা মানুষকে পরীক্ষা করছেন বলে মানুষকে ধৈর্য ধরতে বলেছেন। গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দের সংকট তো ছিলই, উপরন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণার পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। জীবন সংশয়ের ঝুঁকি সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত গবেষণাতেই মিলেছে মুক্তি, এসেছে স্বস্তি।

জিন সিকোয়েন্স জানার পর করোনার গতি-প্রকৃতি এখন অনেকটাই ধারণা করতে পারছেন বিজ্ঞানীরা। ফলে ভ্যাকসিন নিয়ে সারা বিশ্বে এখন চলছে তুমুল গবেষণা। ২০০টির মতো প্রতিষ্ঠান উদ্যোগ নিয়েছে করোনার টিকা বানানোর। এক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে আছে। ভ্যাকসিন বা টিকার ক্ষেত্রে তিনটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়। প্রথম পর্যায়ে দেখা হবে এটা কতটা নিরাপদ। দ্বিতীয় পর্যায়ে দেখা হয় এটা কতখানি কার্যকর। তৃতীয় ধাপে দেখতে হয় এটা একই সঙ্গে কতটা নিরাপদ ও কার্যকর। ইমিউন সক্রিয়তার মাত্রা এবং টি-সেল কতটা তৈরি হলো তা দেখতে হয়। ভ্যাকসিন যে ইমিউনিটি তৈরি করবে তা কতদিন কার্যকর থাকবে এই পরীক্ষাটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সব পরীক্ষাই করা হয় ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে। ইতিমধ্যে ১৬টি প্রতিষ্ঠান বলেছে তারা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আছে। বাকি ১৮০টি প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপে আছে এখনো। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ভ্যাকসিন তৈরির গবেষণায় অনেকদূর এগিয়েছে এবং ১০৭৭ জনের ওপর ট্রায়াল করছে যা আশাবাদী করে তুলছে বিশ্ববাসীকে। ইংল্যান্ডের নামকরা ওষুধ কোম্পানি ভ্যাকসিন তৈরির সক্ষমতার কথা ঘোষণা করেছে। চীনের প্রতিষ্ঠান সিনোভেক বায়োটেক বলছে তারাও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করবে এবং বাংলাদেশে এর প্রয়োগ ঘটাবে। কারণ চীনে এখন এত করোনা সংক্রমণ নেই। আইসিডিডিআর-এর সঙ্গে যৌথভাবে ৪০০০ মানুষকে নিয়ে এই ট্রায়াল বা পরীক্ষা চালানোর প্রস্তাব করেছে তারা। এ সবই আশার দিক। কিন্তু যত আশাই থাকুক না কেন এক বছরের আগে টিকা সহজলভ্য হবে কি না তা নিয়ে সংশয় আছে। আর এই গবেষণার ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রধান হয়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ইতিমধ্যেই।

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণ হয়েছে দেরিতে। টেস্ট করার কম সক্ষমতা, চিকিৎসায় দক্ষতার অভাব, ডাক্তার-নার্স-চিকিৎসাকর্মী স্বল্পতা, করোনা সমস্যার গভীরতা বুঝতে না পারা এবং জনগণের অসচেতনতা ইত্যাদি থাকা সত্ত্বেও দেশের জনগণ এটা নীরবে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু করোনার চাইতে দুর্নীতির সংক্রমণ মানুষকে একেবারে হতবুদ্ধি করে দিয়েছে। মাস্ক-পিপিইসহ নকল সুরক্ষা সামগ্রী, নকল স্যানিটাইজারের পর টেস্টের নামে টাকা নিয়ে টেস্ট না করেই রিপোর্ট দেওয়ার মতো ঘটনায় বিশ্বাস এবং আস্থার পারদ এতটা নেমেছে যে এখন ভ্যাকসিন তৈরি হলেও তা মানসম্পন্ন হবে কি না, যারা বানাবেন তাদের ওপরও আস্থার সংকট তৈরি হবে। টিকা বা ভ্যাকসিন কতদিন কার্যকর থাকবে, দাম কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, কোন প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন তৈরির অনুমতি পাবে, তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই হবে নাকি দুর্নীতি ও ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে তারা ভ্যাকসিন ব্যবসার সুযোগ পাবেন এসব প্রশ্ন উঠলে অবাক হওয়ার কোনো কারণ নেই। করোনা দুর্যোগ মানুষকে কতটা অসহায় করেছে এবং চিকিৎসা ও ওষুধ ব্যবসায়ীদের কী পরিমাণ লাভের সুযোগ করে দিয়েছে তার নির্লজ্জ প্রদর্শনী তো দেশবাসী প্রত্যক্ষ করলেন। ভ্যাকসিন বা টিকা তৈরি নিয়ে কিছু ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠবে কি না সে আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে তারা ভ্যাকসিন তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু তাদের গবেষণার ক্ষেত্রে অতীতে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার উদাহরণ নেই বললেই চলে। হঠাৎ তারা এই ধরনের জটিল ও সূক্ষ্ম বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ ভ্যাকসিন তাদের ল্যাবরেটরিতে কীভাবে তৈরি করবেন সে প্রশ্ন অমূলক নয়। তাই ভ্যাকসিন তৈরির খবরে আশায় বুক বাঁধতে ইচ্ছা হলেও অতীত অভিজ্ঞতা বুকে আশঙ্কার কাঁপন তৈরি করছে।লেখক

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত