প্রশ্ন ফাঁস চক্রের অবৈধ সম্পদের খোঁজে সিআইডি

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২০, ০৬:১২ এএম

মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্রের ক্ষেত্রে কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ খুঁজে পাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার ইউনিট ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের তদন্তে নামে। পরে একে একে বেরিয়ে আসতে থাকে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। এরই মধ্যে ২০১৩ সাল থেকে সরকারি মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ ও আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজের প্রশ্ন ফাঁস করে আসা একটি চক্রের অপকর্মের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অনেক তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। ওই চক্রের সদস্যদের শত শত কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন ও বিদেশে পাচারের প্রাথমিক তথ্যও পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

গ্রেপ্তারের সময়ই চক্রের অন্যতম হোতা মোহাইমিনুল ইসলাম বাঁধনের কাছ থেকে ২ কোটি ২৭ লাখ টাকার চেক উদ্ধার করা হয়। চক্রের আরেক হোতা জসিমউদ্দিনের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকার ৩৯টি চেক, ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা মূল্যের পারিবারিক সঞ্চয়পত্র, ১৪টি মোবাইল ফোন, তিনটি গাড়ি এবং দুটি বাড়িসহ অর্ধশত কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পায় সিআইডি। এছাড়া চক্রটির আরও দুই সদস্য পারভেজের কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের ৮৪ লাখ টাকার চেক এবং জাকিরের কাছে ৫৭ লাখ টাকার এফডিআর ও চেক পাওয়া গেছে। ফাঁস করা প্রশ্নের বিনিময়ে তারা বিভিন্নজনের কাছ থেকে ওই চেকগুলো নিয়েছিল বলে জানিয়েছে সিআইডি।

চক্রের আরও কয়েকটি প্রেসের সন্ধান : প্রশ্ন ফাঁসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি প্রেসের সরাসরি জড়িত থাকার পাশাপাশি সরকারের আরও কিছু প্রেসের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে সিআইডি। এ চক্রে ৫০ জনের বেশি সদস্য থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। চক্রের গ্রেপ্তার পাঁচ সদস্যকে সাত দিনের রিমান্ডের গতকাল শুক্রবার ছিল প্রথম দিন। রিমান্ডে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা।

এর আগে ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্ন ফাঁসের এক মামলায় ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের তদন্তের সূত্র ধরে গত ১৫ থেকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে ঢাকা ও নাটোর থেকে এসএম সানোয়ার হোসেন (৩৩), জসিমউদ্দিন ভূঁইয়া মুন্নু (৪৫), মো. পারভেজ খান (৩২), জাকির হাসান দিপু (৪০) ও মোহাইমিনুল ইসলাম বাঁধনকে (২৫) গ্রেপ্তার করে সিআইডি। ২০ জুলাই মিরপুর মডেল থানায় চক্রের হোতা জসিম ও তার ১৪ সহযোগীসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫০ থেকে ২০০ জনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করে সিআইডি।

গ্রেপ্তারদের রিমান্ডের প্রথম দিন শেষে গতকাল সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রেপ্তারদের মধ্যে জসিমউদ্দিন ভূঁইয়া মুন্নু প্রশ্ন ফাঁস করে শতকোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তিনি মামলা থেকে বাঁচতে কানাডা পালিয়ে যাওয়া চেষ্টা করছিলেন। তার মা একসময় কানাডা থাকতেন। জসিম দেশটিতে টাকা পাচার করেছেন কি না তার অনুসন্ধান চলছে। চক্রের অন্যদেরও অঢেল অবৈধ সম্পদ রয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। তাদের ব্যাংক হিসাবে কী পরিমাণ টাকা আছে তা জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করা হয়েছে। মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করে অবৈধ উপায়ে অর্জিত এসব সম্পদ বাজেয়াপ্তের আবেদন করা হবে।

সিআইডির সাইবার পুলিশের অতিরিক্ত বিশেষ সুপার কামরুল আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তারদের সম্পদের বিষয়ে আমরা আলাদা অনুসন্ধান করছি। অনুসন্ধান শেষে তাদের কী আছে কী নেই তা আমরা জানতে পারব।’

তিনি আরও বলেন, ‘চক্রের সদস্য বাঁধন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা (আইইআর) বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল। সে পড়ালেখা শেষ করতে পারেনি। তার বাবা একটি প্রেসে চাকরি করত। বাবার হাত ধরেই সে এই পথে আসে। বাঁধন ভর্তি জালিয়াতির মাধ্যমে ঢাবিতে ভর্তি হয়েছিল কি না তা তদন্ত করা হবে। আর সানোয়ার তিতুমীর কলেজের ছাত্র ছিল। কিন্তু সে কখনো চাকরি করেনি। পড়ালেখার শেষদিকে সে এই চক্রে জড়িয়ে পড়ে। গ্রেপ্তার আরেকজন জসিম তেমন পড়ালেখা করেনি। অন্যদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।’

সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রশ্ন ফাঁসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি প্রেসের সরাসরি জড়িত থাকার পাশাপাশি সরকারের আরও কিছু প্রেসের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। এখানে যদি সরকারি কোনো কর্মকর্তারও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায় তবে তাকেও আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশনা রয়েছে।’

এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সহকারী পুলিশ সুপার সুমন কুমার দাস বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন একটি প্রেসে ১৯৮৮ সাল থেকে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজের প্রশ্ন ছাপা হতো। প্রেসের সঙ্গে প্রশ্ন ফাঁসকারী চক্রের একটা যোগাযোগ ছিল। তাদের পরিবারের সদস্য কেউ কেউ প্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এছাড়া প্রেসের কোনো সদস্য বা প্রশ্ন প্রণয়নের সঙ্গে যারা জড়িত থাকে তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ ছিল চক্রটির। এর ভিত্তিতে এরা প্রশ্নগুলো প্রেস থেকে নিয়ে একটি বাসায় এসে পরীক্ষার আগে শিক্ষার্থীদের পড়াত।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত