বাজিটা হারতে যাচ্ছেন ট্রাম্প

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২০, ০৭:০৯ এএম

মঞ্চ তৈরি। চিহ্নিত সীমারেখাও। বাজির হার বেজায় উঁচু। আর ট্রাম্প তা হারতে যাচ্ছেন।

করোনাভাইরাস মোকাবিলায় ট্রাম্পের অব্যবস্থাপনা আর যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে চলা বিক্ষোভ তার ব্যাপক ক্ষতি করেছে। তিনি জনপ্রিয়তার জরিপে তার ডেমোক্রেটিক প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনের চেয়ে দুই অঙ্কের ব্যবধানে পিছিয়ে। এখনই নির্বাচন হলে ট্রাম্প বিশালভাবে হারবেন। আর এ ব্যাপারটাই তাকে খেপিয়ে তুলেছে।

চাপে থাকলেও ট্রাম্প এখনো একেবারে ধরাশায়ী নন। হতাশার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে চলেছেন। তবে এখনো সে পর্যায়ে পদার্পণ করেননি। ট্রাম্প যে রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক অর্জনগুলো প্রচারণায় কাজে লাগানোর আশা করেছিলেন, সেগুলো হারিয়ে গিয়েছে। মন্দা আর গণ-অসন্তোষের ধাক্কা নভেম্বরের নির্বাচনের আগে সামলে ওঠা অসম্ভব না হলেও দুরূহ হবে। এ কারণে তিনি মনোবিজ্ঞানের কৌশল নিয়েছেন। সমালোচনার তোড় সামলে নিতে আর মানুষের ধারণা নিজের পক্ষে টানতে শুরু করেছেন জোরদার জনসংযোগ। দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যগুলোর ভোটারদের একটি ক্ষুদ্র অংশের ওপর নজর নিবদ্ধ করেছেন তিনি। মনে আশা, এই অংশটি আবার জয়ী হতে সাহায্য করবে তাকে। ২০১৬ সালের নির্বাচনের সময় ভোটারদের ওপর হিলারির তুলনায় ট্রাম্পের কিছু কল্পিত মনোগত সুবিধা ক্রিয়াশীল ছিল। এর মধ্যে কয়েকটি ছিল হাস্যকর ধরনের। কোনো কোনো মনোবিদের মতে, অধিকতর দীর্ঘকায় এবং ‘কর্তা মরদ’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কারণে হিলারির তুলনায় ট্রাম্প কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকতে পারেন। ২০১৬ সালের বিতর্কের সময় প্রায় আট কোটির মতো টিভি দর্শকের সামনে ছয় ফুট তিন ইঞ্চির তারকা প্রার্থী ট্রাম্প যেন পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন হিলারি ক্লিনটনের মাথার ওপর। হিলারিকে কারাগারে পোরার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিলেন ট্রাম্প। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দোদুল্যমান রাজ্যে (স্যুইং স্টেট) ব্যালটে ট্রাম্পের নাম আগে থাকাও তাকে সাহায্য করে থাকতে পারে। তবে আজ এই সহজাত মনোগত বাড়তি সুবিধা প্রাসঙ্গিক বা যথেষ্ট কোনোটাই নয়। আর এ রকম সংকটের সময় নিজের ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য ট্রাম্পকে অবশ্যই নতুন কোনো কৌশল বের করতে হবে।

আস্থা ফিরিয়ে আনা : করোনাকেন্দ্রিক জাতীয় স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সময় পরিস্থিতির হাল তার হাতে আছে বোঝাতে ট্রাম্প নিজেকে ‘যুদ্ধকালীন প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে তুলে ধরে জনগণের ধারণা বদলানোর চেষ্টা করেছেন। সাম্প্রতিক নাগরিক বিক্ষোভের সময় আবার নিজেকে ‘আইনশৃঙ্খলাবিষয়ক প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে প্রচার করেন। এ সময় তিনি সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষে মত দেন এবং সশস্ত্র বাহিনীর জয়েন্ট চিফস চেয়ারম্যান মার্ক মিলিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের ‘দায়িত্বভার অর্পণ করেন। বিক্ষোভের শুরুর দিকে ঈশ্বরের বিশেষ দূতের ভূমিকায়ও অবতীর্ণ হন তিনি। কখনো প্রার্থনা করতে যাননি এমন একটি গির্জার সামনে বাইবেল হাতে দাঁড়িয়ে যান, যা তিনি পড়ে দেখেননি আর এমন এক ধর্মের পক্ষে ওকালতি করেন, যার বিরুদ্ধে কি না কোনো হুমকিই নেই।

কাজে আসেনি কিছুই : জনসাধারণের ক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছেই। কভিড মহামারী লাখের বেশি আমেরিকানের প্রাণ নিয়েছে। মৃত্যুর মিছিল এখনো বন্ধ হয়নি। দেশের অর্থনীতি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে সবচেয়ে গভীর মন্দায় পড়েছে। সমাজে সৃষ্টি হয়েছে অশান্তি। এমনকি ধর্মীয় নেতারাও তার হামবড়াই করে বলা অনিশ্চিত কথায় পটছেন না। তাই কয়েক মাস আগে সমর্থনের শরীরে মৃদু রক্তপাত হিসেবে যা শুরু হয়েছিল, তা এখন মারাত্মক রক্তক্ষরণে রূপ নিয়েছে। এসব কারণেই ট্রাম্প প্রচারণার পথে ফিরে আসার জন্য এতটাই আগ্রহী। ট্রাম্প মনে করেন, সভা-সমাবেশে আসা জনতার সঙ্গে তার একটি বিশেষ যোগাযোগ রয়েছে, যা দুর্যোগের কবল থেকে তার অবস্থানকে উদ্ধারে সহায়তা করতে পারে। রাজনীতিতে নামার আগে থেকেই ক্ষমতা এবং এর পেছনকার মনোবিজ্ঞান নিয়ে একটি অনন্য উপলব্ধি ছিল ট্রাম্পের, যা চান তা পেতে যুদ্ধ করতে পিছপা হন না তিনি। আর তাই ডেমোক্র্যাটদের লড়াইয়ের জোশ গুঁড়িয়ে দিতে আর রক্ষণশীলদের হৃদয় ও স্বতন্ত্রদের মন জয় করার লক্ষ্যে শুরু করেন যুদ্ধ। সেই যুদ্ধযাত্রার পথে প্রথম যাত্রাবিরতি ছিল ওকলাহোমার তুলসা।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ : ট্রাম্প করোনা মহামারী শুরুর পর থেকে তার প্রথম সমাবেশ শুরু করেন ‘রেড স্টেটে’ (রিপাবলিকানঘেঁষা) ‘লাল মাংস’ পরিবেশন করে। ২০১৬ সালে রিপাবলিকান প্রার্থীকে একচেটিয়া ভোট দিয়েছিল এই অঙ্গরাজ্য। সমর্থকদের ‘বীরযোদ্ধা’ সম্বোধন করার মাধ্যমে জনরঞ্জক আবেদন দিয়ে শুরু করেন ট্রাম্প। ‘বাইরের কিছু খুব খারাপ লোক নানা কুকর্ম করছে’ বলে তাদের সতর্ক করে দেন। জোরদার কোনো অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক যুক্তি হাতে না থাকায় তিনি নাগরিক বিক্ষোভ উপেক্ষা করে করোনা মহামারী নিয়ে কৌতুক করেন। গভীর মন্দার বিষয়টিকে কার্যত অস্বীকারই করে বসেন। ‘নির্লজ্জ ভণ্ড’, ‘ঘুমন্ত জো’ বাইডেনের তীব্র নিন্দা করে ট্রাম্প বলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে ‘আমাদের দেশ ধ্বংস হয়ে যাবে’। এ ছাড়া ‘উগ্র বামপন্থি’ ডেমোক্র্যাট, বিশেষ করে ‘ঘৃণাভরা, আমেরিকাকে ধোলাই করা’ ইলহান ওমর আর ‘সমাজতন্ত্রী’ আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলেন। ‘নেতিবাচক’, ‘চরমপন্থি’ ও ‘ফেইক নিউজ’ মিডিয়াকেও একহাত নেন ট্রাম্প। গালমন্দ করেন বাইডেনকে ‘জিম্মি করে রাখা ধ্বংসাত্মক চরম বামদের’। বস্তুতই, বিরোধীদের পরাস্ত করে সম্পূর্ণ বাগে আনতে যত দূর যেতে হবে, তত দূরই হাঁটতে রাজি ট্রাম্প। কিন্তু ওকলাহোমার তুলনায় বাস্তবতা এত সহজ ছিল না। আয়োজকরা বিশাল সমাবেশের অঙ্গীকার করলেও বাস্তবে তা তত বড় হয়নি। বহুল প্রচারিত এই সমাবেশে তুলনামূলকভাবে নগণ্য উপস্থিতি মাতামাতিকে লজ্জায় পরিণত করে। ট্রাম্পের উল্টো দাবি করলেও তুলনায় সেদিন দুশোরও কম বিক্ষোভকারী সমবেত হয়েছিল। তারা ট্রাম্পের সমাবেশে অংশগ্রহণের পথে প্রধান বাধা ছিল না। স্পষ্টতই, তার সমর্থকদেরও অনেকে এই মহামারীর মধ্যে পুরনো ঘ্যানরঘ্যানর আর মিথ্যাচার শোনার জন্য পাগল হয়নি। এটা স্পষ্ট যে, অন্যকে গালমন্দ করা বা তাদের কলঙ্কিত করার অক্লান্ত পুনরাবৃত্তি আর তার মূল সমর্থকদের আগের মতো বিনোদন দিচ্ছে না। এটাও সুস্পষ্ট, ট্রাম্প তার আবেগ ও স্বরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছেন। আর যতই তিনি এ নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন, ততই হারিয়ে ফেলছেন সমর্থন। আমজনতা প্রেসিডেন্টের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে অস্থির আর সুবিধাবাদী রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যেও তা ঘটছে। প্রাক্তন জেনারেল, সহায়তাকারীসহ ক্রমবর্ধমানহারে রিপাবলিকানরা ট্রাম্পের ডুবন্ত জাহাজ ছাড়ছেন। তাদের কেউ কেউ দলের কথা ভেবে ভীত। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে দেশের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে শঙ্কার কথা বলাই বাহুল্য। এমনকি কেউ কেউ মনে করেন, তিনি দেশের জন্য বিপজ্জনক। এসব কারণে দলত্যাগ খুব বেড়ে যাওয়ার আগেই বিরোধীদের বিরুদ্ধে উত্তেজনা তাতিয়ে তোলা ছাড়া ট্রাম্পের আর বিকল্প নেই।

প্রশ্ন হচ্ছে, মানসিক লড়াইয়ে হেরে গেলে ট্রাম্প কী করবেন? অথবা এভাবে বললেই হয়তো বেশি ভালো হয় আবার নির্বাচিত হতে কত দূর যাবেন তিনি? ট্রাম্প বিকারগ্রস্তের মতো ক্রমেই বেশি করে বলে যাচ্ছেন, তার বিরুদ্ধে উদারপন্থি প্রতিষ্ঠানগুলো ষড়যন্ত্র করছে। মিডিয়া, আদালত ও ‘ডিপ স্টেট’ আমলাতন্ত্র তাকে ঘিরে ফেলছে চারদিক থেকে। ট্রাম্প এমনকি তার অনুসারীদের এ কথাও জিজ্ঞাসা করেছেন যে, তাদেরও কি মনে হয় কি না যে ‘সুপ্রিম কোর্ট তাকে পছন্দ করে না’। বস্তুনিষ্ঠতার খাতিরে বলতে হয়, ট্রাম্পকে বিকারগ্রস্ত বলার অর্থ এই নয় যে, আসলেই কেউ তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে না বা তার পতনের জন্য শোরগোল তুলছে না। তাই যারা আগেভাগেই ট্রাম্পের পরাজয় উদযাপন করছেন, তাদের মনে রাখা উচিত, জয়ের জন্য যেকোনো কিছু করার ব্যাপারে তিনি সংকল্পবদ্ধ। মরিয়া ও অপমানিত বোধ করলে ট্রাম্প সত্যিই যেকোনো কিছু করতে পারেন। মঞ্চ সম্পূর্ণ তৈরি। বিভেদরেখাও চিহ্নিত জাতীয় নির্বাচন তথা জাতীয় শোডাউনের জন্য।

লেখক : আলজাজিরা ইংলিশের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আলজাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত