হ্যান্ড স্যানিটাইজার থেকে আগুন

দগ্ধ ডা. রাজীবের মৃত্যু, মুমূর্ষু স্ত্রী অনুসূয়া

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২০, ০৫:৩০ এএম

রাজধানীর হাতিরপুলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার থেকে লাগা আগুনে দগ্ধ চিকিৎসক রাজীব ভট্টাচার্য (৩৬) মারা গেছেন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে তিনি মারা যান। একই ঘটনায় দগ্ধ স্ত্রী ডা. অনুসূয়া ভট্টাচার্য (৩২) মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। রাজীব ভট্টাচার্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিউরো সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ছিলেন।

গত ২১ জুলাই রাতে হাতিরপুল বাজার সংলগ্ন বাসায় হ্যান্ড স্যানিটাইজার থেকে সৃষ্ট আগুনে দগ্ধ হন চিকিৎসক দম্পতি। এর মধ্যে ডা. রাজীবের শরীরের ৮৭ শতাংশ দগ্ধ ছিল। আর অনুসূয়ার শরীরে ২০ শতাংশ পুড়ে যায়। ওই দিনই তাদের ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়।

শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, তাকে ভর্তি করার পর থেকেই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। তার শরীরের ৮৭ শতাংশ বার্ন ছিল। গত সাত দিন তার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু ছেলেটা ফিরল না। তার শ্বাসনালি পুড়ে যাওয়ায় অবস্থা ছিল গুরুতর।’

তিনি আরও বলেন, একজন তরুণ চিকিৎসকের এভাবে চলে যাওয়া, এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনার। আমি আবারও বলছি, হ্যান্ড স্যানিটাইজার থেকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ এটি অত্যন্ত উচ্চমাত্রার দাহ্য পদার্থ। আগুনের কাছে যেন কোনোভাবেই হ্যান্ড স্যানিটাইজার না থাকে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। তিনি বলেন, বাসায় থাকলে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুলেই করোনামুক্ত থাকা যাবে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক বাচ্চু মিয়া বলেন, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টায় ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আইসিইউতে  চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ডা. রাজীব। মা-বাবা দম্পতি দগ্ধ হলেও তাদের সাড়ে ৫ বছর বয়সী সন্তান রাজশ্রী ভট্টাচার্য দগ্ধ হয়নি। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার মরদেহ বিনা ময়নাতদন্তে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’

স্বজনরা জানান, ঘটনার সময় হাতিরপুলের ভাড়া বাসায় একটি বোতল থেকে হ্যান্ড স্যানিটাইজার ছোট একটি স্প্রে বোতলে ঢালছিলেন ডা. রাজীব। ওই সময় তিনি সিগারেট পান করছিলেন। দুই ঠোঁটের ফাঁকে থাকা জ¦লন্ত সিগারেট রাজীবের মুখ থেকে স্যানিটাইজারে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে। রাজীবের সারা শরীরে আগুন ধরে যায়। তার চিৎকারে স্ত্রী ডা. অনুসূয়া ভট্টাচার্য পাশের রুম থেকে ছুটে এসে স্বামীকে বাঁচানো ও আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। এসময় অনুসূয়াও দগ্ধ হন। এই চিকিৎসক দম্পতির সাড়ে ৫ বছর বয়সী একমাত্র কন্যা রাজশ্রী ভট্টাচার্য ঘটনার সময় কুমিল্লায় দাদার বাড়িতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যায়। রাজীবের শ্বশুর বাসায় থাকায় তিনিও মেয়ে ও জামাতাকে বাঁচাতে গিয়ে সামান্য আহত হন।

রাজীবের চাচাতো বোন তপু ভট্টচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মরদেহ সৎকারের জন্য গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি। রাজীবের মা-বাবা গ্রামে। খবর শুনে তাদের পাগলের মতো অবস্থা। গ্রামের বাড়িতেই রাজীবের সৎকার করা হবে। স্ত্রী অনুসূয়াকে রাজীবের মৃত্যু সংবাদ দেওয়া হয়নি। তাদের ৫ বছরের শিশুটি বাড়িতেই আছে।’

অনুসূয়ার ভগ্নিপতি স্বপন কুমার রায় জানান, ঘটনার দিন তার শ্বশুর (অনুসূয়ার বাবা), রাজীব ও অনুসূয়ার বাসায় ছিলেন। আগুন লাগায় রাজীব ও অনুসূয়াকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন এবং অনুসূয়ার বাবাকে তার বাসায় রেখে আসেন। জীবন রক্ষার জন্য হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করছিলেন, সেই হ্যান্ড স্যানিটাইজারও তার জীবন কেড়ে নিল। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।’

রাজীবের সহকর্মী সুদীপ দে বার্ন ইউনিটে বলেন, ‘সদা হাসিখুশি চিকিৎসক এভাবে চলে যাবেন এটা মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। একটু অসাবধানতায় এই মেধাবী চিকিৎসককে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো। তার মাত্র ৫ বছর বয়সী শিশুটি এতিম হয়ে গেল।’

কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার অষ্টগ্রামের লক্ষ্মণ ভট্টাচার্যের ছেলে রাজীব। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন ছোট। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরো সার্জারি বিভাগের চিকিৎসক ছিলেন। তার স্ত্রী অনুসূয়া রাজধানীর শ্যামলীর সেন্ট্রাল মেডিকেল সেন্টারের চক্ষু বিভাগের রেজিস্ট্রার ও চক্ষু চিকিৎসক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত