শিক্ষিত বেকারমুক্ত শিক্ষা-পরিকল্পনা

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২০, ১২:৩৫ এএম

বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস-২০২০ উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত এক অনলাইন আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় যে পরিমাণ শিক্ষার্থী অনার্স-মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করছে, চাকরির বাজারে সে পরিমাণ অনার্স ও মাস্টার্সের চাহিদা রয়েছে কি না তা ভেবে দেখার প্রয়োজন। তিনি বলেন, যারা বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করছে, তাদের অনেকেই চাহিদা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না এবং কোনো ধরনের টেকনিক্যাল শিক্ষা না থাকায় তারা বেকার থেকে যাচ্ছে। সরকার আর এই রকমের শিক্ষিত বেকার তৈরি করতে চায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। শিক্ষামন্ত্রীর কথার সামঞ্জস্য পাওয়া যায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের ২০১৯ সালের ‘ÔTracer Study of Graduates of Universities in Bangladesh’ নামক গবেষণায়। তারা জানিয়েছে, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েটদের ৩৮.৬% কর্মহীন। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, গ্র্যাজুয়েটের অধিকাংশই তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না। বেশির ভাগ শিক্ষার্থী বিশেষত প্রকৌশল ও অন্যান্য টেকনিক্যাল বিষয়ের শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত যোগ্যতা ও কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে মিল না থাকায় চাকরি পেতে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। চাকরিরতদের ৩৪% গ্র্যাজুয়েট হওয়ার পর চাকরি পাওয়ার জন্য অন্তত দু-তিন বছর ব্যয় করেছে, এতে দু-তিন বছর তারা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কোনো অবদান রাখতে পারেনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষাক্ষেত্রে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো হচ্ছে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। নিঃসন্দেহে খবরটি আশাব্যঞ্জক। সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর এই উদ্যোগকে কার্যকর ও সফল করার জন্য পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকা দরকার বলে মনে করি। যে পরিকল্পনার মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী প্রতিটি ক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ কর্মী তৈরি করা যাবে এবং শিক্ষিত হয়ে কেউ বেকার থাকবে না।

বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার ১.৩২%, এই পরিসংখ্যান থেকে গাণিতিক সূত্র ব্যবহার করে আগামী চার বছর পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা কত হবে, তা ধারণা করা সম্ভব। অভিক্ষেপ অনুযায়ী ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সম্ভাব্য জনসংখ্যা হবে ১৭৫.৪ মিলিয়ন। সম্ভাব্য ১৭৫.৪ মিলিয়ন মানুষের জন্য প্রাথমিকভাবে অন্তত চার থেকে পাঁচ বছরের জন্য এই পরিকল্পনা করা যেতে পারে, যেহেতু উচ্চশিক্ষা শেষ করে যেকোনো বিষয়ের গ্র্যাজুয়েট হতে অন্তত চার-পাঁচ বছর সময় লাগে। এই মেয়াদি পরিকল্পনার প্রথম সুফল পেতে চার-পাঁচ বছর সময় লাগলেও পরে ধারাবাহিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্তি চলমান থাকবে বলে আশা করা যায়। পরিকল্পনার প্রাথমিক ধাপে শুরুতে জনসংখ্যা অনুপাতে প্রয়োজনীয় প্রতিটি ক্ষেত্রে কী পরিমাণ দক্ষ কর্মী বা বিশেষজ্ঞ দরকার, তার সম্ভাব্য হিসাব করে ওই ক্ষেত্রের জন্য ততজন দক্ষ ব্যক্তি তৈরির জন্য শিক্ষাব্যবস্থার পরিকল্পনা করতে হবে।

বিষয়টি পরিষ্কার করতে স্বাস্থ্যশিক্ষার পরিকল্পনা কীভাবে করা যায়, সে রকম একটি উদাহরণ দিচ্ছি। ২০২৪ সালে ১৭৫ দশমিক ৪ মিলিয়ন মানুষের জন্য কতজন ডাক্তার, নার্স, ধাত্রী, টেকনিশিয়ান, সাপোর্টিং স্টাফসহ অন্যান্য জনবল দরকার, তার একটি অভিক্ষেপমূলক সংখ্যা নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয়সংখ্যক দক্ষ জনশক্তি প্রস্তুত করার পরিকল্পনা করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি ১০,০০০ জনের জন্য ডাক্তার আছেন ৫.২৬ জন এবং নার্স আছেন ৩.০৬ জন; যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে ১০,০০০ জনের জন্য ২৯ জন এবং ভারতে ১৯ জন ডাক্তার আছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আমাদের দেশের মতো দেশের জন্য প্রতি ১০,০০০ জনের জন্য অন্তত ২৩ জন ডাক্তার, ২৩ জন নার্স ও ২৩ জন ধাত্রী থাকার সর্বনিম্ন প্রান্তিক নির্ধারণ করেছে। তো এই অনুপাতে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের সব মানুষের ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অন্তত ৪,০৩, ৪২০ জন ডাক্তার প্রয়োজন হবে। পাইপলাইনে কতজন ডাক্তার আছেন মেডিকেল কলেজগুলোর চলমান শিক্ষার্থী সংখ্যা থেকে সে তথ্যও পাওয়া যাবে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে, ২০২৪ সালে প্রয়োজনীয় ডাক্তার সংখ্যার যে পরিমাণ ঘাটতি থাকবে, চলতি বছর মেডিকেল কলেজগুলোতে সিটসংখ্যা সে অনুসারে বাড়ানোর পরিকল্পনা করা যেতে পারে এবং সংগতিপূর্ণভাবে মেডিকেল কলেজসংখ্যা ও জনবল বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এতে ২০২৪ সালে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডাক্তার পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। চাহিদা অনুসারে সংখ্যাভিত্তিক এই পরিকল্পনায় অন্তত তিনটি উপকার পাওয়া যাবে। এক. মানুষের যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয়সংখ্যক ডাক্তার পাওয়া যাবে, দুই. শিক্ষিত বেকার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কমে যাবে এবং তিন. অপ্রয়োজনীয় গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় হবে না।

এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের কতজন শিক্ষক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, আমলা, বিচারক, পুলিশ, ব্যাংকার, আইনজীবী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, ব্যবস্থাপক, শিল্পী, ভাষাবিদ এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন, তার একটি সামগ্রিক অভিক্ষেপমূলক ধারণা তৈরি করতে হবে এবং শিক্ষাব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে অভিক্ষেপ অনুযায়ী ঠিক ততসংখ্যক বিশেষজ্ঞ তৈরি করার প্রস্তুতি নিতে হবে। উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও বিষয়ে নতুন ভর্তির আসনসংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে, সেই সংখ্যা অনুযায়ী। খেয়াল রাখা দরকার, উচ্চশিক্ষা সবার জন্য নয়। চাহিদার অতিরিক্ত গ্র্যাজুয়েট তৈরি হলে শিক্ষিত বেকার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

শিক্ষার মাধ্যমিক স্তরের লক্ষ্য দুই ধরনের জনগোষ্ঠী তৈরি করা। এক ধরনের জনগোষ্ঠী যারা মাধ্যমিক স্তর শেষ করে উচ্চশিক্ষা স্তরে প্রবেশ করবে এবং আরেক ধরনের জনগোষ্ঠী, যারা মাধ্যমিক স্তর শেষ করে কর্মে প্রবেশ করবে। সুতরাং শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, প্রবণতা ও মেধা অনুসারে তাদের জন্য শিক্ষার উপযুক্ত ধরন ঠিক করে নিতে হবে। যারা উচ্চশিক্ষা স্তরে প্রবেশ করবে, তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে হবে এবং যারা উচ্চশিক্ষায় যাবে না তাদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা স্তরকে এমনভাবে বিন্যাস করতে হবে, যাতে তারা নির্বিঘেœ কর্মজগতে প্রবেশ করতে পারে। আর সেজন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার কারিকুলামে শিল্প ও কলকারখানার চাহিদা বিবেচনায় নতুন নতুন ট্রেড সংযোজন করে আধুনিকায়ন করার প্রয়োজন হবে। বিদেশে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির বিষয়টিও পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থার এমন আমূল পরিবর্তনের জন্য কিছু বিষয় সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। কারিকুলামকে বাজারের চাহিদা অনুসারে আপডেট করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। সময়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত বৈশ্বিক চাহিদা পরিবর্তিত হচ্ছে, নতুন জ্ঞান ও ধারণা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি জানা জিনিসও নতুন করে জানছি। সদা পরিবর্তনশীল জীবনব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে দেশ ও বিশ্বের চাহিদা, সময় ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে উচ্চশিক্ষাসহ সব স্তরের কারিকুলাম পরিমার্জন করা ও প্রয়োজনীয় নতুন বিষয় যোগ করা আবশ্যক। পঠন-পাঠন ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও জ্ঞানীয় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি প্রায়োগিক দক্ষতা (skill) অর্জনের ওপরও গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ল্যাব ফ্যাসিলিটিজসহ প্রায়োগিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। সর্বোপরি, নিয়ত পরিবর্তনশীল চাহিদা, চাকরির বাজার, শিক্ষাব্যবস্থা এবং গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে কার্যকরণ সম্পর্ক স্থাপন করা গেলেই কেবল শিক্ষিত বেকার সমস্যা এবং বিশেষজ্ঞ ব্যক্তির ঘাটতিজনিত সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে।

লেখক : প্রভাষক, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত