পাটকলের জমি দীর্ঘমেয়াদে লিজ চায় উদ্যোক্তারা

শ্রমিক পুনর্নিয়োগে তরুণ ও কর্মক্ষমরা অগ্রাধিকার পাবে

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২০, ০৫:৫৩ এএম

বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি ২৫ পাটকল পুনরায় চালুর বিষয়ে তোড়জোড় চলছে। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) বলছে, অর্থ বিভাগের পরামর্শে এগুলো চালুর পর তরুণ ও কর্মক্ষম শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ ছাড়া কোনো মিলে অব্যবহৃত জমি পতিত ফেলে না রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এজন্য পাটপণ্য বহুমুখীকরণ শিল্প স্থাপনেরও চিন্তাভাবনা চলছে। এজন্য ঈদের পর স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠকে হয়েছে। বৈঠকে পাটকলের জমি দীর্ঘমেয়াদি লিজ পেতে বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন স্টেকহোল্ডাররা। এছাড়া সরকারি মিলগুলো সরেজমিনে পরিদর্শনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

এ প্রসঙ্গে বিজেএমসির চেয়ারম্যান আবদুর রউফ গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বন্ধ হওয়া মিল চালুর বিষয়ে উদগ্রীব। এজন্য ঈদের পরপরই স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। সেখানে পাটমিলগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অ্যাসোসিয়েশন ও বেসরকারি বড় বড় পাটকল মালিকরা অংশ নিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগে আগ্রহী ব্যক্তিরা পিপিপি বা যৌথ উদ্যোগ বা জিটুজি পদ্ধতিতে পুনরায় মিল চালু করার ব্যাপারে কোনো আগ্রহ দেখায়নি। কারণ তারা পিপিপি সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলে জানিয়েছেন। তারা মিলের জমি দীর্ঘমেয়াদে লিজ পেতে আগ্রহ দেখিয়েছেন বেশি। দু-একজন অবশ্য অন্য প্রস্তাবও দিয়েছেন। কোনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি।’

এক প্রশ্নের জবাবে বিজেএমসি চেয়ারম্যান বলেন, ‘মিলগুলো কীভাবে চালু হবে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আমরা তরুণ ও কর্মক্ষম শ্রমিক পুনর্নিয়োগের বিষয়টি অগ্রাধিকার দিচ্ছি। কারণ দেশে দক্ষ শ্রমিক থাকতে বিদেশি শ্রমিক দিয়ে মিল চলতে পারে না। অন্যদিকে বিভিন্ন মিলে অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানোর চিন্তা চলছে। এখানে জুট ডাইভার্সিফিকেশন বা পাটজাত পণ্যের বহুমুখীকরণ কারখানা স্থাপনের চিন্তা রয়েছে। এজন্য বিনিয়োগ প্রস্তাবও রয়েছে। আপাতত পাটকলের জমিতে পাটের বাইরে অন্য কিছু করার চিন্তা সরকারের নেই।’

এর আগে বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন বন্ধ ঘোষিত পাটকলের শ্রমিকদের অবসান-পরবর্তী সময়ে মিল ও বিজেএমসির  অন্য সম্পত্তির যথাযথ ব্যবহার বিষয়ে কর্মপন্থা ও কর্মকৌশল নিয়ে নীতিনির্ধারণী কমিটির প্রথম বৈঠক হয়। গত ২৩ জুলাই অনুষ্ঠিত বৈঠকে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীরপ্রতীক সভাপতিত্ব করেন। সভার কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, অর্থ, বাণিজ্য ও শিল্প সচিব বন্ধ থাকা মিলের পুনঃচালুকরণ বিষয়ে তাদের মতামত ও পরামর্শ দেন। এছাড়া বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ (বিডা), বিজেএমসি ও বণিক সমিতি এফবিসিসিআই আলাদা আলাদা পরামর্শ দেয়।  ওই বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ অন্য কোনো কাজে পাটকলের জমি বিক্রয় করা যাবে না, মিল চালুর ক্ষেত্রে তরুণ ও কর্মক্ষম শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া ও পিপিপিতে মিল চালুর ক্ষেত্রে সরকার ও মালিকের শেয়ারের ভিত্তি জমির মূল্য অনুসারে করা। এছাড়া অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন পরামর্শ দেন।

সভায় অর্থ সচিব আব্দুর রউফ তালুকদার বলেন, কোনো অবস্থায়ই মিলের জমি বিক্রি করা যাবে না। ভাড়াভিত্তিক ইজারার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আকর্ষণের সুবিধার্থে মেয়াদ বাড়ানো, মিলে থাকা কাঁচামাল, তৈরি পণ্য, যন্ত্রপাতি ও অন্য সম্পত্তির দ্রুত ইনভেন্টর, বিজেএমসি কর্র্তৃক নিয়মিত মিলগুলো পর্যবেক্ষণ, মিল চালুর ক্ষেত্রে তরুণ ও কর্মক্ষম শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বাণিজ্য সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন বলেন, মিলগুলোর যন্ত্রপাতি, উৎপাদিত পণ্য, কাঁচামালসহ সব সম্পত্তির ইনভেন্টরি সম্পন্ন করতে হবে। বিডা নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, পিপিপি অথবা জয়েন্ট ভেঞ্চার পদ্ধতিতে মিলগুলো পুনরায় চালু করা যেতে পারে। বিডা অথবা বেজাকে কয়েকটি মিল হস্তান্তর করা যেতে পারে।

এফবিসিসিআই সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, মিলগুলোতে পাট ও পাটজাত পণ্যের জন্য ব্যবহার নিশ্চিত করা, কোনোভাবেই মালিকানা হস্তান্তর না করা, লিজের ক্ষেত্রে মেয়াদ দীর্ঘ করতে হবে। এছাড়া পিপিপিতে মিল চালুর ক্ষেত্রে সরকার ও মালিকের শেয়ারের ভিত্তি জমির মূল্য অনুসারে করার পরামর্শ দেন তিনি। 

সভায় সভাপতির বক্তব্যে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বলেন, অবসায়নের পরে দেশের পাটকলগুলো সরকারি নিয়ন্ত্রণে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) যৌথ উদ্যোগ জি টু জি বা লিজ মডেলে পরিচালনার মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব আবার উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা হবে। বন্ধ মিলগুলো চালুর পাশাপাশি মিলগুলোকে উপযুক্ত ব্যবস্থায় আধুনিকায়ন এবং বিজেএমসির জনবল কাঠামো পরিবর্তিত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে যৌক্তিকীকরণের বিষয়ে সুপারিশ দেওয়ার জন্য গঠিত উচ্চপর্যায়ের দুটি কমিটি এরই মধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে। উদ্যোগের উদ্দেশ্য বহুমুখী পাটপণ্যের বর্তমান বাজার ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার পরিপ্রেক্ষিতে পাটপণ্যের উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও পুনর্বিন্যাস করা হবে।

পাটমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার কৃষকের উৎপাদিত পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সচেষ্ট রয়েছে। এ জন্য বর্তমান সরকার ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ, পাট ক্রয়-বিক্রয় সহজীকরণের জন্য এসএমএসভিত্তিক পাট ক্রয়-বিক্রয় ব্যবস্থাকরণ, কাঁচা পাট ও বহুমুখী পাটজাত পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, পাটজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রণোদনা ও অভ্যন্তরীণ ব্যবহার বৃদ্ধির কাজ করছে। এ ছাড়াও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা বিবেচনায় পাট চাষিদের উদ্বুদ্ধকরণের পাশাপাশি পাটশিল্পের সম্প্রসারণে সব ধরনের সহায়তা করবে সরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত