দেনা-পাওনার ক্ষোভে ঠিকাদার ভগ্নিপতি আবুল খায়েরকে খুন করেছে শ্যালক মিলন। গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘ভাটারা থানা এলাকায় নিহত আবুল খায়ের ছিলেন গ্রেপ্তারকৃত মো. মিলনের ভগ্নিপতি। আবুল খায়েরের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সজিব বিল্ডার্সে ‘রড বাইন্ডার’ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন মিলন। মুলত তাদের দুজনের মধ্যে দেনা-পাওনার দেন দরবারের দ্বন্দ্বে রাগান্বিত হয়ে মিলন প্রথমে রড এবং পরে কাঠ দিয়ে মাথায় একের পর এক আঘাত করে নির্মমভাবে হত্য করে আবুল খায়েরকে।’
রবিবার দুপুরে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান বিভাগের ডিসি কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
গত শুক্রবার সকালে রাজধানীর ভাটারা থানার বাড়িধারা এলাকার একটি নির্মাণাধীন ভবন থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সজীব বিল্ডার্সের মালিক আবুল খায়েরের (৫২) রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এই ঘটনায় ভিকটিম আবুল খায়েরের মেয়ে বাদী হয়ে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। ঘটনার ১৫ ঘণ্টার মধ্যে শনিবার তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় বাড়িধারা এলাকা থেকে মূল অভিযুক্ত মো. মিলনকে (৪৪) গ্রেপ্তার করে ভাটারা থানা পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে আসামী মিলন হত্যার দায় স্বীকার করেন এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
ডিসি সুদীপ কুমার চক্রবর্তী সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, গত ৬ আগস্ট বিকেলে একটি ফোন পেয়ে বাসা থেকে বের হন আবুল খায়ের। প্রতিদিন সন্ধ্যার মধ্যে বাসায় ফিরলেও সেদিন ফেরেননি। তার ফোনও বন্ধ ছিলো। পরে তার স্ত্রী রুপালী বেগম বসুন্ধরা এম ব্লকের একটি নির্মাণাধীন ভবনে স্বামীর বন্ধুদের নিয়ে যান। রাস্তায় তার স্বামীর মোটরসাইকেল দেখতে পান। পরে ওই ভবনের দ্বিতীয় তলায় উপুড় হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। পরে পুলিশকে খবর দিলে মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
অভিযুক্ত মো. মিলন ও ভিকটিম আবুল খায়ের দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করতেন। প্রথমে দুজনই ছিলেন নির্মাণ শ্রমিক। পরবর্তীতে তারা নির্মাণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তিল তিল করে গড়ে ওঠা এই নির্মাণ প্রতিষ্ঠান এমডি হন আবুল খায়ের। আবুল খায়েরের ভাগ্য ফিরলেও ফেরেনি মিলনের। তিনি এখনো নির্মাণ শ্রমিকই। মিলন সজীব বিল্ডার্সেই রড বাইন্ডার হিসেবে কাজ করতেন। দৈনিক ৬০০ টাকা মজুরিতে মিলন কাজ করে আসছিলেন। তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল। নির্মাণ ব্যবসা করেই তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করতেন। নবনির্মিত যে প্রজেক্টে কাজ চলছিল সেখানে ভিকটিম আবুল খায়ের ছিলেন মূল ঠিকাদার এবং সেখানে অভিযুক্ত মিলন ছিলেন প্রধান শ্রমিক।
দেনা পাওনার বিষয়টি উল্লেখ করে ডিসি আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত মিলন দাবি করেছেন, সে তার প্রাপ্য মজুরি হিসেবে প্রায় ৮ লাখ টাকা আবুল খায়েরের কাছ পেতেন। মিলনের ক্ষোভ ছিল ভগ্নিপতি আবুল খায়েরের উপর। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে যে মুনাফা আসতো তার কোনো ভাগই ভগ্নিপতি আবুল খায়ের মিলনকে দিতেন না। একই প্রজেক্টে তিনি কাজ করেন তার ভগ্নিপতিও কাজ করেন, ভগ্নিপতি মুনাফা পাচ্ছেন কিন্তু তিনি পাচ্ছেন না। তাছাড়া শ্রমিক হিসেবেই মিলনকে বিবেচনা করতো আবুল খায়ের। ডাকতে হতো ‘বস’ বলে। এসব মানতে পারেন নি মিলন।
ডিসি বলেন, আসামী মিলন আদালতে ১৬৪ ধারায় হত্যার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে তিনি বলেন, মিলন প্রায় বোনের বাসায় যেতেন। বোন এবং বোন জামাই আবুল খায়ের এর মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। সেটি ভেবেই তিনি ভগ্নিপতি আবুল খায়েরকে ওই নির্মাণাধীন ভবনে কথা বলতে ডেকেছিলেন। কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর তাদের মধ্যে তুমুল বাকবিতণ্ডা হয়। এতে ক্ষেপে গিয়ে ওই ভবনে থাকা লোহার রড ও নির্মাণ সামগ্রী কাঠ দিয়ে আবুল খায়েরের মাথায় আঘাত করে মিলন।
সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, আমরা পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও বিভিন্ন তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে নিশ্চিত হয়েছি, নিহত আবুল খায়েরের স্ত্রীর বড় ভাই মো. মিলন একাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। হত্যাকাণ্ডের পর তার চাঁদপুর চলে যাওয়া এবং চাঁদপুর থেকে ঢাকা আসা ও পুলিশের সাথে লুকোচুরিতে সন্দেহ হয়। গ্রেপ্তারের পর মিলন সব দায় স্বীকার করেন। আমরা খুব দ্রুতই এই মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করবো।
