বিতর্কিত ঠিকাদার গোলাম কিবরিয়া (জি কে) শামীম ১৮০টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ৬ হাজার ৫৮ কোটি ৪৯ লাখ ৫১ হাজার ৮৪২ টাকা লেনদেন করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এসব হিসাবে এফডিআরসহ স্থিতি ছিল ৩৩৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। জি কে শামীমের অর্থ পাচার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আবু সাঈদের তদন্তে এসব তথ্য জানা গেছে। গতকাল সোমবার সিআইডি এসব তথ্য প্রকাশ করে।
ইতিমধ্যে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতে এ অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে সিআইডি। এতে জি কে শামীম ও তার সাত দেহরক্ষী দেলোয়ার হোসেন (৩৯), মো. মুরাদ হোসেন (৫২), মো. জাহিদুল ইসলাম (৪১), মো. শহিদুল ইসলাম (৩৬), মো. কামাল হোসেন (৪৯), মো. সামাদ হোসেন এবং মো. আমিনুল ইসলামকে (৩৪) আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, জি কে শামীমের মোট লেনদেনের বেশিরভাগই হয়েছে ২০১৮ ও ’১৯ সালে। শামীমের দেহরক্ষী হিসেবে কর্মরত থেকে আসামিরা প্রকাশ্যে অস্ত্র বহন, প্রদর্শন ও ব্যবহার করে মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি প্রদর্শন করত। তারা পরস্পর যোগসাজশে সংঘবদ্ধ অপরাধ করার মাধ্যমে টেন্ডারবাজিতে সহায়তা এবং বিভিন্ন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে রয়্যালটি ফি নেয়। তারা জুয়ার কারবারসহ স্থানীয় বাস টার্মিনাল, গরুর হাটে চাঁদাবাজি করত। অপরাধলব্ধ আয় অবৈধভাবে বিদেশে পাচারের লক্ষ্যে মজুদ করে মানি লন্ডারিংয়ের চেষ্টা করেছে যা অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর ৪(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
চার্জশিটে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের পর্যালোচনায় বলা হয়, জি কে শামীমের ব্যাংক লেনদেন সর্বমোট ক্রেডিট হয় ৩ হাজার ৪২ কোটি ৮৩ লাখ ৪৮ হাজার ৯১ টাকা। ডেবিট হয় ৩ হাজার ১৫ কোটি ৬৬ লাখ ৩ হাজার ৭৫১ টাকা। ১৮০টি ব্যাংক হিসাবে ফিক্সড ডিপোজিট রেটসহ (এফডিআর) ৩৩৬ কোটি ৩০ লাখ ৫১ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা রয়েছে।
চার্জশিটে টেন্ডার সম্পর্কিত তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, ২০০৯ থেকে ’১৯ পর্যন্ত এসএম গোলাম কিবরিয়ার প্রতিষ্ঠান জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানির একক ও যৌথ নামে ১৫৪টি প্রকল্পকাজ পরিচালনা করে। তার মধ্যে ৬১টি প্রকল্প সমাপ্ত করে এবং ৯৩টি প্রকল্প চলমান রয়েছে। মোট প্রকল্পের মধ্যে ৬১টি প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে।
সিলভান রিসোর্টের ৭ অংশীদারের সম্পদ বিবরণী তলব : জি কে শামীমের মালিকানাধীন সিলভান ওয়াই রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) জসিমউদ্দিন মন্টুসহ সাত অংশীদারের সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিস দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন স্বাক্ষরিত এ সম্পদ বিবরণী নোটিস জারি করা হয়। নোটিস পাওয়া অন্যরা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক।
সিলভান রিসোর্টের এমডি মন্টু ছাড়া নোটিসপ্রাপ্ত অন্যরা হলেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জামিলউদ্দিন শুভ, জাওয়াদ উদ্দিন আবরার, জিয়াউদ্দিন আবির, মো. মিনারুল আলম চাকলাদার, ফজলুল করিম চৌধুরী স্বপন ও এসএইচএম মোহসিন।
নোটিসে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪-এর ধারা ২৬-এর উপধারা (১)-এর ক্ষমতাবলে এই নোটিস জারি করা হলো। এই আদেশ অনুসারে তাদের এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিবর্গের স্বনামে/বেনামে অর্জিত যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, দায়-দেনা, আয়ের উৎস ও উহা অর্জনের বিস্তারিত বিবরণী নির্ধারিত ছকে এই আদেশপ্রাপ্তির ২১ কর্মদিবসের মধ্যে দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হলো। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিল করতে ব্যর্থ হলে অথবা মিথ্যা বিবরণী দাখিল করলে দুদক আইন ২৬ (২) ধারা অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দুদকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বান্দরবানের সিলভান রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা নামে তিন তারকা মানের এ রিসোর্টে জি কে শামীমের বিনিয়োগ এবং ওই রিসোর্টের জন্য পাহাড়িদের জমি দখল করা হয়। প্রায় ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে বান্দরবান শহর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে চিম্বুক সড়কের পাশে পর্যটনকেন্দ্র নীলাচল সংলগ্ন ছাইংঙ্গ্যাপাড়ায় প্রায় ৫০ একর এলাকাজুড়ে এই রিসোর্টটি তৈরি করছেন জি কে শামীম। রিসোর্টটির মালিকানায় আছেন তিনিসহ আটজন। তারা প্রাথমিক পর্যায়ে সেখানে ১০ কোটি টাকা বিনিয়োগে কাজ শুরু করেন।
জমি কেনা সংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণে জানা গেছে, শামীম ছাড়াও রিসোর্টের মালিকানায় আছেন চট্টগ্রামের চন্দনাইশের এমপি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর ছোট ভাই জসিমউদ্দিন মন্টু, ফজলুল করিম চৌধুরী, জামিল উদ্দিন শুভ, এসএইচএম মহসিন, উম্মে হাবিবা নাসিমা আক্তার, জিয়াউদ্দিন আবির ও জাওয়াদ উদ্দিন আবরাব।
