শচিন টেন্ডুলকারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির পর ৩০ বছর কেটে গেছে! সত্যি বিশ্বাস হয় না।
১৯৯০ সালের এই দিনে (১৪ আগস্ট) ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে প্রথম সেঞ্চুরি করেছিলেন টেন্ডুলকার। ব্যাট তোলার ভঙ্গিতে এমন জড়তা ছিল যে ফুটেজ দেখলে তার নাতিও লজ্জা পাবে। আত্মজীবনী ‘প্লেইং ইট মাই ওয়ে’তে লিখেছেন, ‘দর্শকরা হাততালি দেওয়া শুরু করল। কীভাবে সেই অভিনন্দনের জবাব দেব তাই নিয়ে ধন্দে ছিলাম। আগে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। এখনো প্রথম সেঞ্চুরির ভিডিও দেখলে মনে হয়, উদযাপন এমন একটা ব্যাপার যাতে আমি কখনো স্বতঃস্ফূর্ত নই।’
১৯৮৯তে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকের পর নিউজিল্যান্ডেই প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি পেতে পারতেন টেন্ডুলকার। নেপিয়ারে তিনি ৮৮ করে আউট হন। ক্রাইস্টচার্চে সিরিজের প্রথম টেস্টে ড্যানি মরিসনের বলে গোল্ডেন ডাক মারেন। এ দেখে কিউই ক্রিকেটাররা বলেছিলেন, ‘দেশে গিয়ে স্কুল ক্রিকেট খেলো হে। তুমি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যোগ্য নও।’ উত্তরে কিছু বলেননি শচিন, ‘একদম চুপ ছিলাম। দ্বিতীয় ইনিংসে ঘণ্টাখানেক উইকেটে ছিলাম। ৪৪ বলে ২৪ করে জন ব্রেসওয়েলের বলে আউট হই। ছোট্ট ইনিংসটা আত্মবিশ্বাস জোগায়। নেপিয়ারে দ্বিতীয় টেস্টে তা টের পায় নিউজিল্যান্ড।’ শচিন তৃতীয় দিন শেষে ৮০ রানে অপরাজিত ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই চতুর্থ দিন ব্যাটিংয়ে নামার সময় সেঞ্চুরির ব্যাপারটা তার মাথায় ছিল, ‘ড্যানি মরিসনের প্রথম বলেই বাউন্ডারি মেরে শুরু করলাম। পরের পাঁচটা শর্ট বল। ছেড়ে দিলাম। মরিসনের পরের ওভারে আবার প্রথম বলে বাউন্ডারি মারলাম। পরের বলটা সে পিচড আপ করল। আমি ড্রাইভ খেলার জন্য মনস্থির করেই ছিলাম। ব্যাটে-বলে ঠিকভাবে খেলা হলো না। মিড অফে জন রাইট ক্যাচ নিলেন। ৮৮ করে আউট।’
এরপর ইংল্যান্ড সফরের শুরুতেই ট্যুর ম্যাচে রান পান টেন্ডুলকার। লর্ডসের প্রথম টেস্টে অবশ্য ব্যর্থ হন। গ্রাহাম গুচ সেই টেস্টে ট্রিপল সেঞ্চুরির পর দ্বিতীয় ইনিংসেও সেঞ্চুরি করেছিলেন। লেগ স্পিনার নরেন্দ্র হিরওয়ানির বলে ২৫ গজ পেছনে দৌড়ে অ্যালান ল্যাম্বের ক্যাচ নেওয়া ছাড়া তেমন কিছু করতে পারেননি শচিন। যা করার করেছিলেন ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে। ম্যাচ শুরু হয় ৯ আগস্ট। আগে ব্যাট করে ইংল্যান্ড তোলে ৫১৯। জবাবে ভারত করে ৪৩২, এর মধ্যে টেন্ডুলকার করেন ৬৮।
ল্যাম্বের সেঞ্চুরিতে ৪ উইকেটে ৩২০ রান তুলে দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করে ইংল্যান্ড। শেষ দিন ৯২ ওভারে ৪০৮ রানের টার্গেটে খেলতে নামে ভারত। লাঞ্চের পর ভারতের স্কোর ছিল ৪ উইকেটে ১০৯। তারপর ১২৭ রানে আজহার ফেরেন। কপিল আউট হন দলীয় ১৮৩ রানে। মনোজ প্রভাকর যখন শচিনের সঙ্গে যোগ দেন তখন ম্যাচ বাঁচাতে মরিয়াভাবে একটা পার্টনারশিপ চাচ্ছিল ভারত। সপ্তম উইকেটে ১৬০ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েছিলেন শচিন-প্রভাকর। ১৭৯ বলে ১১৭ রান করে অপরাজিত থেকে ফেরেন শচিন। ‘নব্বই পার করার পরেই সেঞ্চুরির চিন্তা পেয়ে বসে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম সেঞ্চুরি বলে কথা। সমর্থকরা অপেক্ষায় ছিল। নিউজিল্যান্ডে যে ভুল করেছিলাম তার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সে ব্যাপারে সচেতন ছিলাম। দিনের খেলা তখনো বেশ কিছুটা বাকি। আমার উইকেট পেলেই ইংল্যান্ড জয়ের জন্য ঝাঁপাবে জানতাম। নার্ভাস নাইটিজে ভাগ্য আমার সঙ্গে ছিল। অ্যাঙ্গাস ফ্রেজারের বাউন্সে ডাক করলাম। কিন্তু হাতের ব্যাট পেরিস্কোপের মতো মাথার ওপর তোলা ছিল। বল তাতে লেগে ফাইন লেগে যায়। কাছাকাছি ফিল্ডার কিংবা উইকেটকিপারের হাতেও যেতে পারত। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে তেমনটা ঘটেনি।’ ফ্রেজারের বলে পাঞ্চ করে তিন রান নিয়ে সেঞ্চুরি পূরণ করেছিলেন টেন্ডুলকার। সাজঘরে ফেরার সময় ইংলিশ ক্রিকেটাররা বলেন, দুই আম্পায়ার পর্যন্ত তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।
ম্যাচসেরার পুরস্কার হিসেবে এক বোতল শ্যাম্পেন পেয়েছিলেন শচিন, ‘আমার বয়স তখনো ১৮ হয়নি। ড্রিঙ্ক করতাম না। প্রেজেন্টেশন শেষ হলে পুরস্কার নিয়ে দ্রুত ড্রেসিংরুমে ফিরলাম। শ্যাম্পেনের বোতলটা সঙ্গে করেই দেশে ফিরি। ১৯৯৮ সালে সারার জন্মদিনে ওটা খোলা হয়েছিল।’
মোহাম্মদ আশরাফুল ও মুশতাক মোহাম্মদের পর ইতিহাসের তৃতীয় কনিষ্ঠতম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান টেন্ডুলকার। ৯ টেস্ট লেগেছিল প্রথম সেঞ্চুরির দেখা পেতে। সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি করা শচিন টেন্ডুলকার প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি করেছিলেন আরও চার বছর পর।
