সিনহার ঘটনার পর কক্সবাজারে থানা পুলিশের কার্যক্রম স্থবির

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২০, ০৪:১৫ এএম

অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদকে গুলির ঘটনার পর থেকেই কক্সবাজারের বিভিন্ন থানা পুলিশের কার্যক্রমে স্থবিরতা বিরাজ করছে। অধিকাংশ থানার গেট বন্ধ করে রাখা হয়েছে। শিথিল রয়েছে পুলিশের চেকপোস্টের কার্যক্রমও। প্রায় বন্ধ রয়েছে পুলিশের অভিযান, মামলার তদন্ত ও ভুক্তভোগীদের সেবাদান।

গত বৃহস্পতিবার থেকে গত সোমবার পর্যন্ত পাঁচ দিন ধরে কক্সবাজার সদর, রামু, টেকনাফ থানা ও টেকনাফের বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্র সরেজমিনে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এসব থানা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ৩১ জুলাই রাতে বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর পুলিশের চেকপোস্টে মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনার পর থেকেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে বিভিন্ন থানার গেট বন্ধ করে রাখা হয়েছে। সাধারণ ভুক্তভোগীদের কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

বিশেষ কারণে কেউ প্রবেশ করতে চাইলে তাকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ফোনে অবহিত করতে হচ্ছে। অনুমতি মিললে প্রবেশ করছেন, নইলে ফিরে যাচ্ছেন। ৩১ জুলাই  অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর থেকেই থানা পুলিশের স্বাভাবিক দৃশ্যপট বদলে যেতে শুরু করে। এর মধ্যে সিনহার বোন আদালতে মামলা করার পর টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ সাত সদস্য বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার হওয়ার খবরে অনেকটাই বিব্রত হন জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে টেকনাফ থানাার সামনে সাধারণ ভুক্তভোগীদের প্রতিবাদ করার ঘটনায় বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া থানার বাইরের কার্যক্রমে শিথিল অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হয়। ফলে কক্সবাজার জেলা জুড়ে পুলিশের কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ হোসেনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।

গত শুক্রবার সকালে টেকনাফ থানার বন্ধ গেটের বাইরে কথা হয় ক্রসফায়ারে নিহত হাসান আলীর স্ত্রী ইয়াসমিনের সঙ্গে। স্বামী হত্যার পর প্রায় দুই বছর পালিয়ে ছিলেন ওসি প্রদীপের হুমকির কারণে। বাড়িতে নিরাপদে থাকার আর্জি নিয়ে এসেছিলেন থানা পুলিশের কাছে। কিন্তু থানায় ঢুকতে পারেননি তিনি। একইভাবে টেকনাফ থানার প্রধান ফটকে অপেক্ষা করছিলেন অনেক ভুক্তভোগী নারী। একেকজনের একেক সমস্যা। কেউ গিয়েছিলেন সাধারণ ডায়েরি করতে, আবার কেউ গিয়েছিলেন চুরির মামলা করতে।

কিন্তু কেউই প্রবেশ করতে পারছিলেন না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে থানা ফটকে দায়িত্ব পালনকারী একাধিক পুলিশ সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানান, থানায় ঢুকতে হলে স্যারের পারমিশন লাগবে। আমরা কাউকে যেতে দিতে পারব না। এমনকি সাংবাদিকদেরও প্রবেশাধিকারে মানা করা হয়েছে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ থানার ওসি আবুল ফয়সল দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কোনো কথা বললেও সেটি প্রকাশ করছেন। কিছুই গোপন রাখছেন না। তবে ভুক্তভোগী কেউ থানায় এলে তাদের প্রবেশ করতে না দেওয়ার তথ্য সঠিক নয়।

এদিকে বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রের প্রধান ফটকের সামনেই একই চিত্র দেখা গেছে। এ প্রতিবেদক গত রবিবার ও সোমবার দুই দফায় ওই তদন্ত কেন্দ্রে প্রবেশ করতে গেলে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরা বলেন, থানায় কোনো স্যার নেই। কাজেই প্রবেশ বন্ধ। এক প্রশ্নের জবাবে যোবায়ের নামে এক পুলিশ সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন মেজর সিনহার কারণে নয়, করোনার কারণে অনেক আগে থেকেই সামাজিক দূরত্ব রক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য থানায় যত্রতত্র প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই তদন্ত কেন্দ্রের একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ ও পরিদর্শক লিয়াকত আলীসহ একাধিক পুলিশ সদস্য মেজর সিনহার মামলার আসামি হয়ে বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার হওয়ার পর থানার সব পুলিশ সদস্যকে বদলি করা হয়েছে। এ কারণে থানার কার্যক্রম প্রায় বন্ধ রয়েছে। বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রেও সাময়িকভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে পুলিশের উচ্চপর্যায় থেকে। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বাহারছড়া তদন্ত কেন্দ্রে নতুন করে পদায়নপ্রাপ্ত ইনচার্জ পরিদর্শক ইয়াসিন আলীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি।

শামলাপুর লামার বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী দেশ রূপান্তরকে জানান, এই এলাকাজুড়ে পুলিশের টহল, সোর্স ও দালালদের সবসময়  উপস্থিতি ছিল। কিন্তু মেজর সিনহা নিহত হওয়ার পর দৃশ্যপট বদলে গেছে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা সদস্য প্রকাশ্যে বের হন না। এমনকি কোনো মামলার তদন্ত কিংবা অভিযানও বন্ধ রয়েছে।

একই চিত্র দেখা গেছে কক্সবাজার সদর থানায়ও। সোমবার সকালে সেখানে প্রবেশ করতে গেলে প্রধান ফটকে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যরা জানান, ঈদের পর থেকে কোনো সাংবাদিককে এখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কারও বিশেষ প্রয়োজন হলে স্যারদের ফোন করে অনুমতি নিয়ে আসতে হবে। নইলে প্রবেশে বারণ করা আছে। এমনকি বাইরে কারও সঙ্গে কোনো ধরনের কথাবার্তা বলাও নিষেধ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মেজর সিনহা পুলিশের চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর থেকে উখিয়া ও রামু থানায়ও প্রবেশদ্বারে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ভুক্তভোগীর পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার পরই কেবল প্রবেশের অনুমতি মিলছে। এছাড়া মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশের চেকপোস্টেও কোনো পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়নি গত সোমবার। মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর চেকপোস্ট ছাড়া ওই সড়কের কোথাও পুলিশ চেকপোস্ট বসায়নি। তবে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও সেনাবাহিনীর চেকপোর্স্টের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে টেকনাফ থানাসহ বিভিন্ন থানা পুলিশের টহল বন্ধ রয়েছে। দিনের বেলায় যেমন পুলিশ সদস্যদের দেখা যায় না, তেমনি রাতেও তারা থানা থেকে বের হচ্ছে না। তবে সাদা পোশাকে পুলিশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা কাজ করছেন বলে তারা জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত