মানুষের সেবা করে আমরা মনের আনন্দ পাই: মাহাবুবর রহমান

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০২০, ০৯:৫৮ পিএম

মাহাবুবর রহমান চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার পদে দায়িত্ব পালন করছেন দু'বছরের বেশি সময় ধরে। চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে নানা উদ্যোগ ও পদক্ষেপের কারণে পুলিশ বাহিনীতে দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেন। সম্প্রতি দেশ রূপান্তরের একান্ত সাক্ষাৎকারে মুখোমুখি হন পুলিশের এ শীর্ষ কর্মকর্তা।

দীর্ঘ আলাপচারিতায় উঠে এসেছে জনবান্ধব পুলিশিং, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা, ‘ক্রসফায়ার’র ভূমিকা নিয়ে।

তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জুনায়েদ হাবীব ও ছবি তুলেছেন আকমাল হোসাইন

করোনা মোকাবিলায় সিএমপিতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন যেগুলো প্রশংসিত হয়েছে। তড়িৎ পদক্ষেপ নিতে পারলেন  কীভাবে?

মাহাবুবর রহমান: আমরা শুরু থেকেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম দেশের ক্রান্তিলগ্নে কিংবা যেকোনো দুর্যোগে সাধারণ জনগণের পাশে দাঁড়ানোর। করোনাভাইরাসের মহামারি পরিস্থিতিতে জনগণের সেবা এবং তাদের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। আমরা তা পূরণের চেষ্টা করেছি। আমাদের প্রতিদিনের কাজের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে যতটা সাহায্য করা যায় করতে চেয়েছি। পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে জনগণের যে আস্থার সম্পর্ক, সেটি দৃঢ় করতে আমরা এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম। মার্চের শেষদিকে যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় দর্শনার্থীদের সমাগম নিয়ে কথা উঠছিল, তখন প্রথম আমরাই চট্টগ্রাম শহরজুড়ে সব বিনোদন স্পট, রেস্টুরেন্টে জনসমাগম নিষিদ্ধ ঘোষণা করি। সেই সুযোগ যেহেতু আমার ছিল তাই আর সময়ের কালক্ষেপণ না করে তড়িৎ সব পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। সে সঙ্গে অসহায় ৭০ হাজার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাঝে আমাদের একান্ত উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ করেছি। ডোর টু ডোর শপ থেকে শুরু করে টেলিমেডিসিন সেবা নিশ্চিত, চিকিৎসকদের হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়াসহ এ পর্যন্ত প্রতিটি কাজেই উদ্যোগী হওয়ার প্রয়াস পেয়েছিলাম। বিদ্যানন্দের আল মানহিলের সহায়তায় হাসপাতাল নির্মাণ, এমনই অজস্র উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যেখানে কঠোর হওয়ার সেখানে কঠোর আর যেখানে মানবিক হওয়ার সেখানেই তেমন ভূমিকা রেখেছি আমরা। আলহামদুলিল্লাহ এসবে আমরা সফলও হতে পেরেছি।

সিএমপিতে করোনার সংক্রমণ হয়েছে ব্যাপক। একটা সময় প্রতিদিন ৮/১০ জন করে শনাক্ত হচ্ছিল। এর মধ্যেও মাঠ পর্যায়ে গিয়ে আপনিও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তারপরও সিএমপির কার্যক্রম পুরোদমে চলেছে। এটা কীভাবে নিশ্চিত করেছেন?

মাহাবুবর রহমান: আমরা শুরু থেকেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম দেশের ক্রান্তিলগ্নে কিংবা যেকোনো দুর্যোগে সাধারণ জনগণের পাশে দাঁড়ানোর। আমাদের প্রতিদিনের কাজের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে যতটা সাহায্য করা যায় সেটি করতে চেয়েছি। সিএমপিতে প্রথম থেকে আক্রান্তের সংখ্যা যখন বেড়েই চলেছিল তখন একপর্যায়ে আমাদের ট্রাফিক ব্যারাক লকডাউন করতে হয়েছে। জনবল কমে গেলেও কাজের পরিধি কমেনি বরং বেড়েছে। আমার প্রতিটি ইউনিটের অফিসারদের মনোবল ও আস্থা প্রগাঢ় ছিল যার কারণে সম্ভব হয়েছে সব কার্যক্রম। সব মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং করতে গিয়ে করোনায় আক্রান্তও হয়েছিলাম।

করোনা পরিস্থিতিতে চট্টগ্রামে চিকিৎসাসেবার সংকট দেখা দিয়েছিল। তখন বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীদের সেবা নিশ্চিত করতে আপনি কঠোর ভূমিকা রেখেছিলেন।এরপর বিদ্যানন্দের সহায়তায় আপনারাও আইসোলেশন সেন্টার করেছেন। যেখানে এসব বিষয়ে সবার আগে জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা ছিল সেখানে আপনাদেরই এগিয়ে আসতে হলো। এ নিয়ে আপনি কি বলবেন?

মাহাবুবর রহমান: মানুষের সেবা করে আমরা মনের আনন্দ পাই। মানুষ যাতে একটু হলেও উপকৃত হয় সে থেকে আমরা বিদ্যানন্দ ও আল মানারের সঙ্গে সমন্বয় করে আইসোলেশন সেন্টার করি। করোনার সময়ে আমরা লক্ষ্য করলাম যারা সম্মুখ যোদ্ধা রয়েছে ডাক্তার এবং নার্সরা তাদের যাতায়াতে অনেক সমস্যা হচ্ছিল। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় তাদের যাতায়াতে অনেক সমস্যা শুরু হয়। তাই আমরা এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম। পুলিশ ডিপার্টমেন্ট এ কাজ করার সুবাদে যে কোনো পরিস্থিতিতে আমাদের ৮০টি মোবাইল টিমকে ২৪ ঘণ্টা গাড়ি নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হয়। একটা সময় কিন্তু চট্টগ্রামের চিকিৎসাসেবা নিতে সাধারণ নাগরিকরা হুমকির মুখে পড়ে। হাসপাতালগুলো চিকিৎসা প্রদান করছিল না বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে। সেখানে হটলাইন চালু করে কঠোর হয়েছি আমরা। আর অবশ্যই জনপ্রতিনিধিদের এগিয়ে আসার কথা থাকলেও আমরা তাদের সেভাবে পাশে পাইনি।

সাম্প্রতিক সময়ে 'ক্রসফায়ার' নিয়ে জনমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে এ বিষয়ে কী বলবেন?

মাহাবুবর রহমান: এটাকে আমরা ক্রসফায়ার বলি না। যদি পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের হামলা অথবা পুলিশবাহিনীকে আক্রমণ করা হয় তবে নীতিমালা অনুযায়ী অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন রয়েছে। এ ছাড়া পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের কোনো ধরনের এনকাউন্টার বা গুলিবর্ষণ যা হোক না কেন সিভিল ডিপার্টমেন্ট প্রতিটি ঘটনার সূক্ষ্ম তদন্ত করে। তদন্তের মাধ্যমে গুলিবর্ষণের সত্যতা যাচাই হয়। তাই আমি মনে করি অযথা এ ধরনের বিতর্কিত কোনো ঘটনাও ঘটা উচিত না। অন্তত সিএমপি এরিয়াতে এ ধরনের নিরবচ্ছিন্ন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সেই ব্যাপারে আমরা সর্বদা তৎপর আছি।

দায়িত্ব নেয়ার শুরুর দিকে চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আপনার কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী কী মনে হয়েছিল? সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কতটুকু সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করেন?

মাহাবুবর রহমান: ব্যর্থতা এবং সফলতা দুটোই রয়েছে। নগরবাসীর আস্থা ও অসীম ভালোবাসা অর্জন করতে পেরেছি এটিই আমার কাছে অনেক বড় সফলতা।আইনশৃঙ্খলা নিয়ে তেমন ব্যর্থতা দেখি না আমি। তবে আমি মনে করি নগরবাসীকে যানজট নিয়ে খুব একটা স্বস্তি দিতে পারিনি আমরা। যানজট সমস্যা নিয়ে জনসাধারণের যে ভোগান্তি সেটি আমাদের জন্য ব্যর্থতা বটেই। এসবের কারণ অন্যান্য সরকারি সংস্থাগুলোর ব্যাপক সমন্বয়হীনতা।

জঙ্গি হামলা নিয়ে আপনারা কেমন সতর্ক অবস্থানে আছেন?

মাহাবুবর রহমান: আমরা সর্বদাই জঙ্গি হামলার ব্যাপারে তৎপর থাকি। আগস্ট মাস এলেই আমাদের মধ্যে আলাদা এক ধরনের প্রেরণা কাজ করে। যেহেতু আগস্ট শোকের মাস এবং এ মাসে অনেকগুলো বিয়োগান্ত ঘটনা ঘটেছিল। আবার জঙ্গিগোষ্ঠী বা আইনশৃঙ্খলা বিরোধী শক্তিগুলো ও এ মাসে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে চায়। তবে আমাদের এ তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। প্রতিটি থানা এলাকায় ইন্টেলিজেন্স ওয়ার্ক চলমান রয়েছে। জঙ্গিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণকারী একাধিক ইন্টেলিজেন্ট টিম রয়েছে, তারা সক্রিয় ভূমিকায় আছে। এ ছাড়া আমাদের পুলিশি তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি যে কোনো ধরনের অপতৎপরতা প্রতিরোধে আমরা কঠোর হস্তে সক্ষম হব।

সিএমপিতে সাইবার অপরাধ দমনে কতটা সক্ষমতা রয়েছে?

মাহাবুবর রহমান: আমাদের সাইবার মনিটরিং টিম প্রতিনিয়ত সাইবার জগতের অপরাধসমূহ পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে এবং কারো অভিযোগ পাওয়ার পর অফিসাররা তাৎক্ষণিক সেটি খতিয়ে দেখছে। সম্প্রতি চট্টগ্রামে সাইবার বিষয়ক অনেক অপরাধ দমন করা সম্ভব হয়েছে।আর এখানে যারা কাজ করছে সবাই দক্ষ এবং অনেকেই বাইরের দেশ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

মাহাবুবর রহমান: দেশ রূপান্তর ও আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত