ইমাম মাহদি দাবিকারী বক্তা ‘সিজোফ্রেনিক’

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২০, ০৭:৩৭ এএম

সেই ‘বিতর্কিত বক্তা’ মুস্তাক মুহাম্মদ আরমান খানের প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে অন্তত ১৫ জনের একটি দল সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ইতিমধ্যে পালিয়ে যাওয়া অন্তত পাঁচজনের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া দেশ থেকে পালানোর প্রাক্কালে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন ১৯ জন। সবশেষে সৌদিপ্রবাসী এ বিতর্কিত বক্তা নিজেকে ‘ইমাম মাহদি’ দাবি করে বসলে রাজধানীর রমনা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে পুলিশ। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে তদন্তকারী সংস্থা। গতকাল রবিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানান।

সিটিটিসি কর্মকর্তারা জানান, অনলাইনে ‘ইমাম মাহদি’ দাবিদার সৌদিপ্রবাসী মুস্তাক মুহাম্মদ আরমান খান মানসিক রোগ ‘সিজোফ্রেনিয়ায়’ আক্রান্ত। সেই রোগের লক্ষণ হিসাবেই তিনি তার বিকৃত, বিভ্রান্তিকর উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচার করছেন। এ ধরনের একজন সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে অন্তত ১৫ সদস্যের আরও একটি দল সৌদি আরবে পালানোর চেষ্টা করছেন। যাদের সবাইকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। মুস্তাক মুহাম্মদ আরমান খান দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় অপব্যাখ্যার মাধ্যমে এ দেশের ধর্মভীরু লোকজনের মধ্যে উগ্রবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি তিনি ইউটিউব ও ফেইসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নিজেকে ‘ইমাম মাহদি’ হিসেবে দাবি করে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করেন। এছাড়া ধর্মীয় উসকানিমূলক বিভিন্ন বক্তব্য প্রচারের মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। এসব বিষয় বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে গত শনিবার তার বিরুদ্ধে রাজধানীর রমনা থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়েছে।

সিটিটিসি তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানতে পারে, মুস্তাক মুহাম্মদ আরমান খান ২০০৬ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। মালয়েশিয়ার একটি ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রথাগত পেশাজীবন গ্রহণের বদলে ধর্মীয় ভাবধারায় দীক্ষিত হতে থাকেন। এই সূত্রে তিনি ২০১৬ সালে উগান্ডা গমন করেন এবং সেখানে মাসাধিককাল অবস্থান করেন। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে সৌদি আরব গমন করে অদ্যাবধি সেখানেই অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকেই তিনি তার ধর্মীয় অপব্যাখ্যামূলক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমপির সিটিটিসির উপকমিশনার (সিটি) সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিতর্কিত এ বক্তার প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টাকালে যেই ১৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, সেই মামলার আসামিও তিনি। এছাড়া অনলাইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার দায়ে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে। এখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার আইনগত ভিত্তি তৈরি হয়েছে। সেই মোতাবেক সৌদি কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।’ তিনি আরও বলেন, “মানসিকভাবে অসুস্থ মনে হলেও তার বিভ্রান্তিকর ও উগ্রবাদী মতাদর্শে আকৃষ্ট হয়ে অনেকেই ‘হিজরত’র চেষ্টা করছেন। ইতিপূর্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষার্থী পালিয়ে গেছেন। অনেকেই যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে তথ্য রয়েছে।”

সিটিটিসির আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা পারিবারিক ও বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পেরেছি, বিতর্কিত এই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত। এ রোগের লক্ষণ হিসেবে তিনি অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক ও বিভ্রান্তিকর মতবাদ ছড়াচ্ছেন।’

সিজোফ্রেনিয়া রোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোরোগবিদ ও সহযোগী অধ্যাপক হেলাল উদ্দীন আহম্মেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অলীক চিন্তায় মগ্ন থাকার পাশাপাশি অযৌক্তিক ও আবেগনির্ভরশীল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়া, কখনো কখনো নিজ চিন্তাকে স্বপ্নাদিষ্টও মনে করা এসব বৈশিষ্ট্য যাদের মধ্যে পাওয়া যায়, তারা মূলত দুই ধরনের গুরুতর রোগে আক্রান্ত বলে ধরে নিতে হবে। চিকিৎসাশাস্ত্রের পরিভাষায় যে রোগগুলোকে বলা হয়ে থাকে সিজোফ্রেনিয়া ও বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার। এই দুটি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা অলীক কল্পনার জগতে থাকতে পছন্দ করেন, যার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত