মুক্তিযুদ্ধের ৪ নম্বর সেক্টর কমান্ডার অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল চিত্তরঞ্জন দত্ত (সি আর দত্ত) মারা গেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সোমবার স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১১টায় (বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার সকাল) তার মৃত্যু হয়।
বীরউত্তম খেতাবধারী এই মুক্তিযোদ্ধার বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন। তার তিন সন্তানই যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। সি আর দত্তের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশে শোকের ছায়া নেমে আসে। পৃথক শোকবার্তায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান জাতি চিরদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।’ আর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে সি আর দত্তের অসামান্য অবদান দেশ ও জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে আজীবন স্মরণ রাখবে।’
সি আর দত্ত সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। সংগঠনটির মহাসচিব হারুন হাবীব বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার বাথরুমে পড়ে সি আর দত্তের ডান পায়ের গোড়ালি ভেঙে যায়। এরপর হাসপাতালে নিয়ে পায়ে অস্ত্রোপচার করা হয়। অ্যাজমা রোগী হওয়ায় অস্ত্রোপচারের পর তার শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, কিডনিও অচল হয়ে পড়ে।’ পরিবারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে, সি আর দত্তকে দেশে এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য করতে চান তারা।
সি আর দত্ত ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি আসামের রাজধানী শিলংয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা উপেন্দ্র চন্দ্র দত্ত ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। প্রাথমিক শিক্ষা শিলংয়ে শুরু হলেও পরে তার পরিবার স্থায়ীভাবে চলে আসে হবিগঞ্জে। হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পাসের পর খুলনার দৌলতপুর কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন সি আর দত্ত। ১৯৫১ সালে যোগ দেন তখনকার পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে আসালংয়ে একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ করেন তিনি। ওই যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য পাকিস্তান সরকার তাকে পুরস্কৃত করে।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ৪ নম্বর সেক্টরে বেশ কয়েকটি যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন সি আর দত্ত। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য কৃতিত্ব ও অবদানের জন্য দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাকে বীরউত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলে তার দায়িত্ব দেওয়া হয় সি আর দত্তকে। বাংলাদেশ রাইফেলসের প্রথম মহাপরিচালক তিনি। পরে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট এবং বিআরটিসির চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেন। মেজর জেনারেল হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যান সি আর দত্ত।
সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম গঠনের পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সারা দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি ছিলেন। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, ‘সি আর দত্তের মেয়ে কবিতা দাশগুপ্তা ফোন করে মৃত্যুর খবর দেন। তার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।’
সি আর দত্তের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, যুক্তরাষ্ট্র সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের সভাপতি রাশেদ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক রেজাউল বারি, আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের সভাপতি লাবলু আনসার, সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের যুক্তরাষ্ট্র শাখা সভাপতি অধ্যাপক নব্যেন্দু বিকাশ দত্ত প্রমুখ।
