দল নিষিদ্ধের ক্ষমতা সরকারের হাতে চায় না আ.লীগ

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২০, ০৩:০৬ এএম

সমালোচনার ভয়ে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণের ক্ষমতা সরকারের হাতে রাখতে চায় না আওয়ামী লীগ। দলটির নেতারা বলছেন, অনেক সময় নানা কারণে সরকারের পক্ষে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা সম্ভব না-ও হতে পারে। কারণ রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি অনেক সিদ্ধান্ত নেওয়া সমীচীন হয় না। এসব সিদ্ধান্ত উপযুক্ত আদালতের মাধ্যমে নেওয়া হলে রাজনৈতিক দলগুলো ও সুশীল সমাজ এ নিয়ে সমালোচনা করতে পারে না।

রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইনের খসড়া নিয়ে ইসিতে দেওয়া মতামতে আওয়ামী লীগ বলেছে, এ আইনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণের ক্ষমতা শুধু সরকারকে দেওয়া আছে। এতে অনেক সময় জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

দান বা অনুদান গ্রহণ সম্পর্কিত বিষয়ে আওয়ামী লীগের মতামত হলো, বাস্তবিক অবস্থা বিবেচনায় যেহেতু জাতীয় সংসদ প্রণীত এ ধরনের আইন বারবার পরিবর্তন করা যায় না আর সেটি সমীচীনও নয়, তাই রাজনৈতিক দলগুলোর দান ও অনুদানের পরিমাণ এইভাবে মূল আইনে নির্ধারিত থাকাটা যৌক্তিক নয়। আধুনিক লেজিসলেটিভ প্রক্রিয়ায় এই ধরনের অর্থ বা কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য আদায়যোগ্য ফির পরিমাণ মূল আইনে না রেখে সরকার বা রেগুলেটরি কর্র্তৃপক্ষের হাতেই রেখে দেওয়া হয়। সেক্ষেত্রে মূল আইনে বলা থাকে, সরকার বা কমিশন সময়ে সময়ে আদেশের মাধ্যমে এই অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করবে। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলের জন্য দান বা অনুদান বা অনুদানের পরিমাণটি মুল আইনের পরিবর্তে ‘সাবোডিনেট ল’ অর্থাৎ এই আইনের অধীন প্রণীত বিধিমালায় নির্ধারিত থাকলে কমিশন এবং রাজনৈতিক দলগুলো উপকৃত হবে।

ইসিতে জমা দেওয়া মতামতে আরও বলা হয়, নিবন্ধিত দলের নিবন্ধন বাতিল সম্পর্কে যেসব কারণ ও পরিস্থিতির কথা প্রস্তাবিত আইনে উল্লেখ রয়েছে আওয়ামী লীগ তার সঙ্গে একমত। তবে নিবন্ধন বাতিলের ক্ষেত্রে আরেকটি কারণ উল্লেখ করা প্রয়োজন জানিয়ে তারা বলেছে, যদি কোনো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার অপপ্রচার চালায় বা তাতে মদদ প্রদান করে, তাহলে সেই রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন বাতিল হবে। এই ধরনের একটি বিধান দেশের বিদ্যমান আইনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া এই ধরনের বিধান আমাদের সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এ প্রসঙ্গে ক্ষমতাসীন দলটি মনে করে, কোনো রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে আমাদের সংবিধানের রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতির পরিপন্থী কোনো ব্যবস্থা সংরক্ষণ বা লালন করার উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হলে ওই দল নিবন্ধিতকরণের অযোগ্য হবে।

দেশে প্রচলিত আইনগুলো বাংলায় রূপান্তর করার জন্য ইসির নেওয়া উদ্যোগ প্রশংসনীয় উল্লেখ করে আওয়ামী লীগ বলেছে, গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ, ১৯৭২-এর বাইরে আলাদা আইন প্রণয়নের প্রয়োজন নেই। প্রস্তাবিত আইনের বিধানাবলি আগের মতো গণপতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এ অন্তর্ভুক্ত থাকা সমীচীন। কারণ, এটি জাতির পিতার নিজের হাতে করা। এর সঙ্গে বাঙালি জাতির আবেগের বিষয় জড়িত। জাতির পিতা প্রণীত এই আদেশের একটা ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। আইনটির শিরোনাম, মূল বৈশিষ্ট্য, প্রণয়নের তারিখ ও এর অখণ্ডতা অক্ষুণœ রেখে এটিকে যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে সময়ে সময়ে এটি সংশোধন করা যেতে পারে। কিন্তু এর অংশবিশেষ নিয়ে আলাদাভাবে আইন প্রণয়ন করা সমীচীন হবে না। আরপিও একটি বৃহৎ আইন। এটি বাংলায় রূপান্তর করার জন্য একটা যুক্তিসঙ্গত সময় প্রয়োজন। সেটি ইসি এবং লেজিসলেটিভ বিভাগের ওপর নির্ভর করছে।

আওয়ামী লীগ আরও বলেছে, আইনটি বাংলায় রূপান্তর করা গেলে এর মূল সংস্করণ অর্থাৎ মূল ইংরেজি সংস্করণেরও প্রয়োজন হবে। জাতীয় নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে বিদেশি পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমের সুবিধার জন্য মূল ইংরেজি সংস্করণটির প্রয়োজন সব সময় থাকবে। প্রস্তাবিত আইনে কিছু ইংরেজি শব্দের পরিবর্তে বাংলা পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলা পরিভাষাগুলো বিদ্যমান কয়েকটি আইনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যেমন এই আইনে ব্যবহৃত ‘উপজেলা পরিষদ প্রধান ও উপপ্রধান’ বলতে উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮-এ সংজ্ঞায়িত উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান বুঝাবে, ‘নগর ও নগর সভা’ বলতে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এ সংজ্ঞায়িত পৌর ও পৌরসভা বুঝাবে, ‘পল্লী পরিষদ প্রধান’ বলতে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এ সংজ্ঞায়িত চেয়ারম্যান বুঝাবে, ‘পুরাধ্যক্ষ’ বলতে স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯-এ সংজ্ঞায়িত মেয়র বুঝাবে, ‘মহানগর আধিকারিক’ বলতে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এ সংজ্ঞায়িত মেয়র বুঝাবে এবং ‘মহানগর ও মহানগর সভা’ বলতে স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন আইন, ২০০৯-এর সিটি ও করপোরেশন বুঝাবে। ফলে প্রস্তাবিত আইনটির বিধানাবলিতে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন বাংলা পরিভাষাসমূহ অন্তর্ভুক্ত করলে পরবর্তীতে উল্লিখিত আইনসমূহ সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কারণ এই প্রস্তাবিত আইনে যেসব ইংরেজি বা বিদেশি নাম বা পদবির বাংলা পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, সেই নাম বা পদবি সম্পর্কিত মূল আইনই হচ্ছে উপরোল্লিখিত আইনসমূহ।

রাজনৈতিক দলে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্যপদ সংরক্ষণের ব্যাপারে বিদ্যমান আইনেও একই বিধান রয়েছে। তবে বিদ্যমান আইনে ২০২০ সালের মধ্যে এই লক্ষ্য পূরণের সময়সীমা ছিল। প্রস্তাবিত আইনে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। এ প্রেক্ষাপটে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্যের বিষয়টি ২০২০ সালের পরিবর্তে ২০২৫ সাল নির্ধারণ করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলটি।

প্রস্তাবিত আইনের বিধানাবলি নিয়ে আলাদা আইন প্রণয়ন করা সমীচীন নয় বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ। তারা প্রস্তাবিত এই সংশোধনীগুলো গণপতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ, ১৯৭২ (পিও নং ১৫৫-১৯৭২) সংশোধনীর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে যেহেতু ‘অনুচ্ছেদ’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, তাই প্রস্তাবিত বিধানাবলিতে আওয়ামী লীগ ‘ধারা’ শব্দের পরিবর্তে ‘অনুচ্ছেদ’ শব্দ অন্তর্ভুক্ত করারও প্রস্তাব করেছে।          

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত