ছেলেকে খুঁজে পেতে রুদ্ধশ্বাস ৩২ বছর

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:২২ এএম

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে নিজের ছেলেকে খুঁজে ফিরছিলেন লি জিংঝি। ১৯৮৮ সালে অপহরণের পর বিক্রি করে দেওয়া হয় তার একমাত্র সন্তানকে। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন মা। কিন্তু ৩২ বছর পর গত মে মাসে আসে বহুল প্রতীক্ষিত ফোনকলটি। লিখেছেন পরাগ মাঝি

একটি মাত্র সন্তান

৩২ বছর আগে লি জিংঝি ও তার স্বামীর কাছে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো ছিল দারুণ আনন্দের। এ দিনগুলোতে তারা তাদের একমাত্র সন্তান মাও জিনকে নিয়ে শহরের চিড়িয়াখানা কিংবা পার্কগুলোতে ঘুরতে যেতেন। চীনের মধ্যাঞ্চলীয় শানজি প্রদেশের রাজধানী জিয়ান শহরেই ছিল তাদের বসবাস। লি জিংঝির এখনো মনে পড়ে, দেড় বছরের মাওকে নিয়ে একদিন জিয়ানের চিড়িয়াখানায় গিয়েছিলেন। চিড়িয়াখানার ভেতরে মাটিতে একটি পোকা দেখে মাও খুব আগ্রহী হয়ে ওঠে এবং মাকে উদ্দেশ্য করে আদুরে গলায় বলে ওঠে, ‘মা, পোকা!’ পরে চিড়িয়াখানা থেকে বের হয়ে আসার পর লি জিংঝি খেয়াল করেন সেই পোকাটিকে কোন ফাঁকে মুঠোয় করে নিয়ে এসেছে মাও!

সে সময় চীনে ‘এক সন্তান নীতি’ ছিল তুঙ্গে। ফলে আর কোনো সন্তান নেওয়ার উপায় না থাকায় মাও জিনই ছিল লি জিংঝির ধ্যান-জ্ঞান। ছেলেকে আদর করে জিয়া জিয়া বলে ডাকতেন। ওইটুকু বয়সেই মাও ছিল দারুণ স্মার্ট আর ভদ্রগোছের এক শিশু। বাবা-মায়ের নিষেধ অমান্য করত না সচরাচর। এমনকি বাচ্চারা যেমন একটুতেই কেঁদে ওঠে এমন ছিঁচকাঁদুনে স্বভাবও ছিল না তার। প্রাণবন্ত মাও ছিল সবার আদরের পাত্র। সকালে একটি কিন্ডারগার্টেনে তাকে রেখে প্রতিদিন কাজে যেতেন বাবা-মা। কাজ শেষে তাকে নিয়ে বাসায় ফিরতেন তারা।

জিংঝি কাজ করতেন একটি গম রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানে। তাই ফসল তোলার মৌসুমগুলোতে তাকে কয়েকদিনের জন্য বাড়ি ছেড়ে প্রত্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে যেতে হয় গম সরবরাহকারীদের তদারকি করার জন্য। এ সময়টিতে মাও তার বাবার সঙ্গেই বাড়িতে থাকে। ৩২ বছর আগে এমনই এক ভিজিটে দূরের একটি এলাকায় গিয়েছিলেন জিংঝি। কিন্তু হঠাৎ করেই তাকে যত দ্রুত সম্ভব জিয়ান শহরে ফিরে আসার জন্য বার্তা পাঠান তার প্রতিষ্ঠানের মালিক। সে সময় টেলি যোগাযোগ এতটা আধুনিক ছিল না। একটি টেলিগ্রাম বার্তায় জিংঝির উদ্দেশ্যে কেবল লেখা ছিল, ‘জরুরি কারণে বাড়ি ফিরে আসো, এখনই।’ এই টেলিগ্রাম পেয়ে তিনি বুঝতেই পারছিলেন না কী এমন ঘটে গেছে! তবে, যত দ্রুত সম্ভব তিনি তার শহরে ফিরে এসেছিলেন। ফিরে আসার পর তার বসের মুখ থেকেই দুঃসংবাদটা শুনতে পান। বস বলেছিলেন, ‘তোমার ছেলেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।’ এটি শোনামাত্রই জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়েন জিংঝি। সেই সময়টি ছিল ১৯৮৮ সালের অক্টোবর মাস। মাওয়ের বয়স ছিল তখন মাত্র ২ বছর ৮ মাস।

যেভাবে হারায় মাও

জিংঝির স্বামীর বর্ণনা অনুযায়ী, হারিয়ে যাওয়ার দিন কিন্ডারগার্টেন থেকে মাওকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বাসায় ফিরছিলেন। পথে কিছুক্ষণের জন্য থেমেছিলেন একটি হোটেল থেকে এক বোতল পানি নেওয়ার জন্য। পানিটুকু একটু শীতল করে নিতে দু’তিন মিনিট সময় লেগেছিল তার। এর মধ্যে ফিরে এসে তিনি দেখতে পান মাও নেই!

জিংঝি ধারণা করেছিলেন মাওকে তিনি শিগগিরই খুঁজে পাবেন। তিনি ভেবেছিলেন, মাও হয়তো রাস্তা ধরে হেঁটে অন্য কোনো দিকে চলে গেছে। ওইটুকু বয়সের ছেলে তো আর বাড়ির পথ চেনে না। নিশ্চয়ই কোনো সহৃদয়বান ব্যক্তি তাকে খুঁজে পেয়ে বাড়িতে নিয়ে আসবেন। কিন্তু এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ছেলের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এমনকি পুলিশ স্টেশনেও তার নিখোঁজ ছেলের বিষয়ে কেউ কোনো তথ্য দেয়নি। জিংঝি বুঝতে পারেন, ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিয়েছে।

যে হোটেলের কাছ থেকে মাও হারিয়ে গিয়েছিল তার আশপাশের এলাকাগুলোতে জনে জনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন জিংঝি। ছেলের বর্ণনা দিয়ে তাকে কেউ দেখেছে কি-না তা জানতে চাইছিলেন সবার কাছে। মাওয়ের ছবিসহ তার সন্ধান চেয়ে ১ লাখ পোস্টারও ছাপেন। এসব পোস্টার জিয়ান শহরের বাসস্ট্যান্ড রেলওয়ে স্টেশন থেকে শুরু করে সর্বত্র ছড়িয়ে দেওয়া হয়। স্থানীয় পত্রিকায় নিয়মিত নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়। কিন্তু কোনো কিছুই শেষ পর্যন্ত কোনো কাজে আসেনি। জিংঝির মনে হতে লাগল, তার পৃথিবীটা শূন্য হয়ে গেছে। সন্তানের জামা-কাপড়, জুতো আর খেলনাগুলো দেখলেই তিনি চিৎকার করে কেঁদে উঠতেন।

মাও যে সময় হারিয়ে গিয়েছিল সেই সময়টিতে চীনে শিশুপাচার একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিলেও এ ব্যাপারে খুব বেশি জানতেন না জিংঝি। দারিদ্র্য মোকাবিলা এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে ১৯৭৯ সাল থেকেই চীনে ‘এক সন্তান নীতি’ জারি করা হয়। এর ফলে শহরাঞ্চলে যেসব দম্পতি বাস করতন তারা ছেলে হোক কিংবা মেয়ে একজনের বেশি সন্তান নিতে পারতেন না। তবে গ্রামাঞ্চলে যারা থাকতেন তাদের অনেকেই দ্বিতীয় সন্তান নিতেন যদি প্রথম সন্তানটি কন্যাশিশু হতো তবেই। পরিবারের উত্তরাধিকার বহন কিংবা বৃদ্ধ বয়সে যেন অসহায় হয়ে না পড়েন সেজন্যই একটি পুত্রসন্তান কামনা করতেন তারা। কিন্তু দ্বিতীয় সন্তানটিও যদি কন্যাশিশু হতো তবে তাদের আর করার কিছুই থাকত না। কারণ একজনের বেশি দ্বিতীয় সন্তান হলেই তাদের জরিমানা গুনতে হতো এবং দ্বিতীয় সন্তানটি সামাজিক নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতো। এক সন্তান নীতির ফলেই চীনে শিশু অপহরণের ঘটনা বেড়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে ছেলে শিশু।

মাওয়ের খোঁজে শহর থেকে শহরে

মাও নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার জন্য শুরুর দিকে স্বামীকেই দোষারোপ করতেন জিংঝি। যদিও পরে তার উপলব্ধি হয়, সন্তানকে খুঁজে পেতে তাদের দুজনকে এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। তারপরও স্বামীর সঙ্গে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়তে শুরু করে তার। চার বছর পর তারা একে অপরকে ডিভোর্স দেন। এত কিছুর পরও জিংঝি কখনোই তার সন্তানের খোঁজ থামিয়ে দেননি। প্রত্যেক শুক্রবার বিকালে কাজ শেষে তিনি কোনো বাস কিংবা ট্রেনে চড়ে বসতেন প্রদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে মাওয়ের খোঁজ করার জন্য। রবিবার সন্ধ্যায় তিনি বাড়ি ফিরে আসতেন এবং সোমবার সকালে যথারীতি কর্মক্ষেত্রে ফিরে যেতেন। যখনই তিনি কোনো খবর পেতেন যে, মাওয়ের মতো দেখতে একটি ছেলে পাওয়া গেছে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সেখানে ছুটে যেতেন এবং অনুসন্ধান করতেন।

মাও যে বছর নিখোঁজ হয় সে বছরই জিংঝি খবর পান জিয়ান থেকে অনেক দূরের একটি গ্রামে এক দম্পতি মাওয়ের মতো দেখতে একটি ছেলেকে জিয়ান শহর থেকেই দত্তক নিয়েছেন। জিংঝি তৎক্ষণাৎ ওই দম্পতির সঙ্গে দেখা করতে বাসে চড়ে বসেন এবং বহু দূরের পথ পেরিয়ে তাদের গ্রামে গিয়ে পৌঁছেন। সন্ধ্যায় গ্রামের লোকেরা ফসলের মাঠ থেকে ফিরে এলে তিনি খবর পান ওই দম্পতি ছেলেটিকে জিয়ান শহরেই নিয়ে গেছেন। এ খবর পেয়ে তিনি আবারও জিয়ান শহরের পথ ধরেন। পরদিন সকালে শহরে পৌঁছে তিনি ওই দম্পতির ভাড়া করা ফ্ল্যাট খুঁজতে থাকেন। কয়েক ঘণ্টা খোঁজার পর তিনি সেই ফ্ল্যাট পেয়েও যান। কিন্তু ফ্ল্যাটের মালিক জানান, ওই দম্পতি দুদিন আগেই অন্য আরেকটি শহরে চলে গেছে। জিংঝি দেরি না করে সেই শহরের দিকে ছুটেন এবং রাতের বেলায় সেখানে পৌঁছে হোটেলে হোটেলে তাদের খুঁজতে শুরু করেন। যতক্ষণ না তিনি সঠিক হোটেলটি খুঁজে পান তার কিছুক্ষণ আগেই ওই দম্পতি হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তারপরও তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা থামিয়ে দেননি জিংঝি। মধ্যরাতেই তিনি আরেক শহরের উদ্দেশে রওনা হন যেখানে ওই দম্পতির পুরুষ লোকটির বাবা-মা থাকেন। কিন্তু সেখানেও তাদের পাওয়া গেল না। এবার তিনি স্ত্রী লোকটির বাবার বাড়িতে গেলেন। সেখানেও তারা ছিলেন না। তবে, তারা সেই মুহূর্তে কোথায় অবস্থান করছেন তার খোঁজ পেয়ে যান জিংঝি। ওই দম্পতির সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তিনি দেখতে পান তাদের দত্তক নেওয়া সন্তানটি আসলে মাও নয়। এ ঘটনাটি দারুণ প্রভাব ফেলে পুত্র হারানো জিংঝির মধ্যে। তার তখন পাগলপ্রায় দশা। তার মা তাকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, জিংঝিকে শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

চিকিৎসকের পরামর্শ শুনে জিংঝি বুঝতে পারেন ছেলের খোঁজে উন্মাদ হয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত আর ছেলেকে খুঁজে পাবেন না তিনি। এর পর থেকেই মাথা ঠান্ডা রেখে ছেলের খোঁজ চালিয়ে যেতে শুরু করেন। এ সময় তিনি দেখতে পান, শুধু তার সন্তানই নয় আরও অসংখ্য বাবা-মা রয়েছেন যারা তাদের সন্তানকে হারিয়ে ফেলেছেন। সন্তান হারানো দম্পতিদের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। চীনের প্রায় সব প্রদেশেই এই নেটওয়ার্কের কার্যক্রম রয়েছে। নিখোঁজের ছবিসহ পোস্টার বিলি করে সন্তানকে খুঁজে পেতে একে অপরকে সহযোগিতা করতেন ওই নেটওয়ার্কের সদস্যরা। এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অসংখ্য দম্পতি তাদের সন্তানকে খুঁজে পেতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু মাওয়ের কোনো খোঁজ পাচ্ছিলেন না জিংঝি। সন্তানের খোঁজে বিশাল চীনের অন্তত ১০টি প্রদেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন তিনি।

বেবি কাম হোম

ততদিনে মাও নিখোঁজ হওয়ার ১৯ বছর কেটে গেছে। এবার ‘বেবি কাম হোম’ নামে একটি চীনা ওয়েবসাইটে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যোগ দেন জিংঝি। হারানো সন্তানের খোঁজ দিতে এ ওয়েবসাইটটিও বেশ সুনাম কুড়িয়েছিল। ‘বেবি কাম হোম’-এ কাজ শুরু করার ২ বছরের মধ্যেই ২০০৯ সালে চীন সরকার একটি ডিএনএ ডাটাবেজ তৈরি করে। এখানে সন্তান হারানো দম্পতিদের ডিএনএ সংরক্ষণ করা হয়। আবার শিশু অবস্থায় হারিয়ে যাওয়া অনেক ছেলেমেয়ে নিজের বাবা-মা’র সন্ধান পেতেও এখানে ডিএনএ সংরক্ষণ করতে পারে। এই পদ্ধতিটি বেশ ফলপ্রসূ। খুব কম সময়ের মধ্যেই এই প্রক্রিয়ায় কয়েক হাজার দম্পতি তাদের হারানো সন্তানকে খুঁজে পেয়েছিলেন।

ধীরে ধীরে জিংঝি জানতে পেরেছিলেন হারিয়ে যাওয়া

সন্তানদের বেশিরভাগই ছেলে। নিঃসন্তান কিংবা একটি কন্যা আছে কিন্তু কোনো পুত্র নেই এমন দম্পতিরাই অপহরণকারীদের কাছ থেকে ছেলে শিশুদের কিনে নিত। আর গ্রামাঞ্চলের দম্পতিরাই সাধারণত এটি করত। ‘বেবি কাম হোম’সহ অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে দুই দশকের মধ্যে ২৯ জন নিখোঁজ সন্তানকে তাদের বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যেতে সরাসরি সহায়তা করেছেন জিংঝি। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার পর ওই সব বাবা-মায়ের উচ্ছ্বাস খুব কাছ থেকেই দেখতেন তিনি। মাওয়ের কথা ভেবে এ সময় তার চোখ ছলছল করে উঠত। ভাবতেন, একদিন মাও এসেও তাকে এভাবে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু বছর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাওকে খুঁজে পেতে তার মনের আশাও ক্ষীণ হতে শুরু করে। মাওয়ের খোঁজ পেয়ে যাবেন এমন আশা নিয়ে তিনি কত বার কত জায়গায় যে ছুটে গেছেন তার কোনো হিসাবই নেই। প্রতিবারই তাকে হতাশ হতে হয়েছে। তবে, তিনি কখনোই আশা ছেড়ে দেননি। তার বৃদ্ধ মা তাকে অনুপ্রেরণা দিতেন।

নাতিকে দেখে যেতে পারেননি নানি

২০১৫ সালে ৯৪ বছর বয়সে জিংঝির মা মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া নাতিকে তিনি স্মরণ করেছেন। মাও ফিরে এসেছে এমন একটি স্বপ্ন দেখতে পাওয়ার কথাও জানিয়েছিলেন জিংঝিকে। মৃত্যুর আগে আগে বলেছিলেন, ‘৩০ বছর তো প্রায় হয়ে গেল! এবার তার ফিরে আসা উচিত।’ এ কথা বলেই চেতনা হারান জিংঝির মা। জিংঝি এ সময় মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘চিন্তা কোরো না মা, মাওকে আমি খুঁজে পাবই।’

২০১৫ সালের ১৫ জানুয়ারি মারা যান জিংঝির মা। চীনা লুনার ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, এ দিনটিতেই জন্মগ্রহণ করেছিল মাও। জিংঝি ভাবলেন, এটি ঈশ্বরেরই লীলা। মাওয়ের কথা কখনো ভুলে না যেতেই তিনি এমনটি করেছেন। এরপর কেটে গেছে আরও পাঁচ বছর। চলতি বছরের ১০ মে তিনি মাওয়ের খোঁজ পেয়ে যান। বিশ্বে এ দিনটি এবার ‘মা দিবস’ হিসেবে পালিত হয়েছে। এদিন জিয়ান শহরের জনসচিব কার্যালয় থেকে জিংঝির কাছে একটি ফোন আসে। ফোনের অপর পাশ থেকে তাকে বলা হয়, ‘মাওকে খুঁজে পাওয়া গেছে!’ জিংঝি ভাবলেন, তিনি হয়তো ভুল শুনছেন। হয়তো এটা তার মনের ভুল। আসলে কোনো ফোনই আসেনি। কাঁপতে শুরু করেছিলেন তিনি।

গত এপ্রিলে জিংঝিকে এক ব্যক্তি সম্পর্কে খোঁজ দিয়েছিলেন পরিচিত একজন। বহু বছর আগে ওই ব্যক্তিকে জিয়ান শহর থেকেই তুলে নিয়ে গিয়েছিল কেউ। ওই ব্যক্তির পরিণত বয়সের একটি ছবিও দেওয়া হয় জিংঝির হাতে। জিংঝি এই ছবিটি পুলিশের কাছে দেন। পুলিশ ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখতে পান ৭০০ কিলোমিটার দূরে সিচুয়ান প্রদেশের চেংডু শহরে বসবাস করছেন ওই ব্যক্তি। পরে পুলিশ তাকে একটি ডিএনএ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলই বলে দেয়, ওই ব্যক্তি আর কেউ নন, জিংঝির হারিয়ে যাওয়া সন্তান মাও।

৩২ বছর রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা ও অনুসন্ধানের পর গত ১৮ মে দেখা হয় মা ও ছেলের। দেখা হওয়ার আগে জিংঝি ভাবছিলেন, সেই ছোট্ট মাও এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। বিয়ে করে সংসার করছে। যদি এমন হয় তিনি যেভাবে ভাবছেন, মাও সেভাবে তাকে গ্রহণ করেনি! যদি মাকে তার পছন্দ না হয়!

চীনের প্রেক্ষাপটে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই একটি আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয় মাওকে খুঁজে পাওয়ার ঘটনাটি। তাই মা-ছেলের দেখা হওয়ার মুহূর্তটিতে অসংখ্য গণমাধ্যমকর্মী এসে হাজির হয়েছিলেন। ওই মুহূর্তটি সরাসরি সম্প্রচার করে চীনের সিসিটিভি। টেলিভিশনের ফুটেজে দেখা যায়, দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরেছেন মাও। বহু বছর আগে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও পুত্রকে বরণ করে নিতে সেখানে হাজির ছিলেন জিংঝির স্বামীও। পুনর্মিলনের মুহূর্তে তারা তিনজনই কাঁদছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত