ভারতের সঙ্গে ‘এয়ার বাবল ফ্লাইট’ চালু করতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ। চলতি মাসের মধ্যে এ ফ্লাইট চালু করতে গতকাল বৃহস্পতিবার আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে প্রস্তুতির খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়। বৈঠকে ভারত যেসব শর্ত দিয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করা হয়। নতুন ভিসায় ভ্রমণ শর্তের সুরাহা হলেই ‘এয়ার বাবল ফ্লাইট’ চলাচলের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করতে বৈঠকে বসবে দুই দেশের সিভিল এভিয়েশন অথরিটি।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মহিবুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে এয়ার বাবল ফ্লাইট চালু করতে বাংলাদেশ সম্মত। আমরা আজ (গতকাল বৃহস্পতিবার) আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। ছোটখাটো দুয়েকটি বিষয়ের সুরাহা হয়ে গেলেই ফ্লাইট চালুর দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা যাবে।’
‘এয়ার বাবল ফ্লাইট’ হচ্ছে দুই দেশের মধ্যে ফ্লাইট পরিচালনা। এর সঙ্গে তৃতীয় কোনো দেশ সম্পৃক্ত থাকবে না। করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড, চীন-দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া-সিঙ্গাপুরের মতো প্রতিবেশী দেশে এ ধরনের ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে।
গত ১৮ ও ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ সফর করেন ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা। এ সময় দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা, সরকারি কাজ ও চিকিৎসার প্রয়োজনে ভ্রমণের জন্য ‘এয়ার বাবল ফ্লাইট’ পরিচালনার প্রস্তাব দেয় ভারত। এরপর বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছে। মতামত নেওয়া হয়েছে সিভিল এভিয়েশন অথরিটিরও। সব জায়গা থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার পর বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় গতকাল বৈঠকে বসেছিল বাংলাদেশ থেকে যেসব বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট চালাবে তাদের সঙ্গে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ছাড়াও বৈঠকে ইউএস বাংলা এয়ারলাইনস, নভোএয়ার ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা জানান, এয়ার বাবল ফ্লাইট চালুর জন্য ভারত যেসব শর্ত দিয়েছে বেশিরভাগই স্বাস্থ্যবিধি সংক্রান্ত। করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে দুই দেশ প্রায় একই ধরনের স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করছে। কিন্তু ভারত বলেছে, যারা ‘এয়ার বাবল ফ্লাইটে’ ভ্রমণ করবেন তাদের নতুন করে ভিসা নিতে হবে। পুরনো কোনো ভিসায় এ ফ্লাইটে ভ্রমণ করা যাবে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যুক্তি হচ্ছে, যাদের ভিসা আছে তারা কেন নতুন করে ভিসা নিতে যাবে। এ মহামারীর সময় নতুন করে ভিসা নিতে গেলে তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বেন। তাদের অতিরিক্ত টাকা ও সময় ব্যয় হবে। গতকালের বৈঠকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নতুন আর পুরনো ভিসার জটিলতা নিরসন করতে বলা হয়েছে। এ বিষয়টির সমাধান হলে শিগগিরই বৈঠকে বসে ফ্লাইট চালুর দিনক্ষণ চূড়ান্ত করবে দুই দেশের সিভিল এভিয়েশন অথরিটি।
গত ২৭ আগস্ট ভারতের বিদায়ী হাইকমিশনার রীভা গাঙ্গুলি দাশ বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলীর সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করেন। এ সময় বিদায়ী হাইকমিশনার কভিড-১৯-এর কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু করার প্রস্তাব দেন এবং ভারতের ‘এয়ার বাবলে’ যুক্ত হওয়ার বিষয়টি উপস্থাপন করেন। জানা গেছে, ভারত করোনাভাইরাসের মধ্যে ফ্রান্স, জার্মানি, মালদ্বীপ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ‘এয়ার বাবল ফ্লাইট’ পরিচালনা করছে। এতে দুই দেশের অনেক মানুষই উপকৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। এছাড়া বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী প্রতিবেশী দেশটির স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। তাছাড়া ভ্রমণ ও ব্যবসায়িক কাজেও প্রচুর বাংলাদেশি ভারতে যান। ভারতেরও অনেক নাগরিক এ দেশের বিভিন্ন প্রকল্প, শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। করোনাভাইরাসের কারণে দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে বন্ধ করে দেওয়া হয় দুই দেশের মধ্যে ১০টি স্থলবন্দর। বিপুলসংখ্যক মানুষ আটকা পড়েছে দুই দেশে। গত ২৪ আগস্ট বাংলাদেশ স্থলবন্দরগুলো খুলে দিলেও এখনো বন্ধ আছে বিমান চলাচল। ‘এয়ার বাবল ফ্লাইট’ চালু হলে আটকে পড়া এসব মানুষের চলাচল সহজ হবে।
রাজধানী কলাবাগানের বাসিন্দা মো. শহীদুল্লাহ গতকাল দেশ রূপান্তরকে জানান, তিনি গত ফেব্রুয়ারি মাসে ভারতের তামিলনাড়–র চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে বাইপাস সার্জারি করান। পরের মাসেই তার চেকআপ করাতে যাওয়ার কথা। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে তিনি যেতে পারেননি। ওই দেশের চিকিৎসকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এভাবে টেলিফোনে কথা বলে চিকিৎসা নিয়ে তৃপ্ত নন তিনি। বিমান চলাচল চালু হলেই তিনি চেন্নাই যাওয়ার মনস্থির করে আছেন। প্রতিদিনই খবর নিচ্ছেন কবে দুই দেশের বিমান চলাচল স্বাভাবিক হবে।
