স্বেচ্ছা তালিকাচ্যুতির আবেদন বেক্সিমকো সিনথেটিকসের

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:০৬ এএম

দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো গ্রুপের কোম্পানি বেক্সিমকো সিনথেটিকস লিমিটেড পুঁজিবাজার থেকে তালিকাচ্যুত হওয়ার আবেদন জানিয়েছে। সম্প্রতি পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে স্বেচ্ছায় তালিকাচ্যুতির এ আবেদন জানিয়েছে দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকা কোম্পানিটি। তবে তালিকাচ্যুতিতে কোম্পানির সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেজন্য তাদের শেয়ার উদ্যোক্তা-পরিচালকরা কিনে নেবেন বলে জানা গেছে।

এদিকে স্বেচ্ছায় তালিকাচ্যুতের কারণে শেয়ার দরে অস্বাভাবিক উত্থান-পতন এড়াতে বেক্সিমকো সিনথেটিকসের শেয়ার লেনদেনে স্থগিতাদেশ দিয়েছে এসইসি, যা আজ থেকে কার্যকর হবে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর ৯ (৭) ধারায় কোম্পানিটির লেনদেন স্থগিতের এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মোহাম্মদ রেজাউল করিম এ তথ্য জানিয়েছেন। এই ধারায় প্রথম পর্যায়ে ৩০ দিনের জন্য কোনো শেয়ারের লেনদেন স্থগিত করা যায়, যা পরবর্তীতে ১৪ দিন করে স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানো যায়।

এর আগে ইগল বক্স অ্যান্ড কার্টন ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে স্বেচ্ছায় তালিকাচ্যুত হয়েছিল। ২০০৬ সালে এই কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ার সর্বশেষ লেনদেন মূল্যে কিনে নিয়েছিল। এরপর ১৪ বছর পর বেক্সিমকো সিনথেটিকস স্বেচ্ছায় তালিকাচ্যুতির আবেদন জানাল। 

তবে ঠিক কী কারণে বেক্সিমকো সিনথেটিকস তালিকাচ্যুতির আবেদন জানিয়েছে তা এখনো স্পষ্ট নয়। সম্প্রতি জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর পুনর্গঠনে এসইসির কড়াকড়ি আরোপের কারণেও তালিকাচ্যুতির আবেদন জানাতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে কোম্পানির বক্তব্য চাইলেও গতকাল পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি। অবশ্য স্টক এক্সচেঞ্জের লিস্টিং রেগুলেশনের ৫২ ধারা অনুযায়ী তালিকাভুক্ত যেকোনো কোম্পানি স্বেচ্ছায় তালিকাচ্যুতির আবেদন জানাতে পারে। সেক্ষেত্রে কিছু ক্রাইটেরিয়া পরিপালন করতে হয়। যদি কোনো কোম্পানির শেয়ার এক বছর লেনদেন না হয়, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ারহোল্ডিং কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ৯০ শতাংশ অতিক্রম করে অথবা কোনো অতালিকাভুক্ত কোম্পানি তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ৯০ শতাংশের বেশি শেয়ার অধিগ্রহণ কিংবা ধারণ করে, তাহলে স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে যেকোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি তালিকাচ্যুতির আবেদন জানাতে পারে। যদিও তালিকাভুক্তির পাঁচ বছর অতিক্রম না হলে কোনো কোম্পানি স্বেচ্ছায় তালিকাচ্যুতির আবেদন জানাতে পারে না। এছাড়া কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালক সিকিউরিটিজ আইনের পরিপন্থী প্রতারণামূলক বা জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত থাকেন অথবা ইস্যুকারীর বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ সংক্রান্ত কোনো মামলা বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা মুলতবি থাকে, তাহলেও কোম্পানি স্বেচ্ছায় তালিকাচ্যুতির আবেদন জানাতে পারে।

এক্ষেত্রে তালিকাচ্যুতির প্রক্রিয়া শুরু করতে হলে কোম্পানির পর্ষদ সভায় রেজ্যুলেশন গ্রহণ করতে হবে এবং তা মূল্য সংবেদনশীল তথ্য হিসেবে প্রকাশ করতে হবে। স্বেচ্ছায় তালিকাচ্যুতিতে উদ্যোক্তা-পরিচালক ছাড়া অন্যসব শেয়ার ক্রয়ের জন্য স্কিম তৈরি করতে মার্চেন্ট ব্যাংকার নিয়োগ দিতে হবে। সাধারণ সভায় তিন-চতুর্থাংশ শেয়ারহোল্ডারের সম্মতিতে স্কিমের অনুমোদন নিতে হবে। স্বেচ্ছায় তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের শেয়ার ক্রয়মূল্য সর্বশেষ লেনদেন মূল্য অথবা শেষ ছয় মাসের শেয়ার দরের ভারিত গড় অথবা সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ মূল্যের চেয়ে বেশি হতে হবে।  

১৯৯৩ সালে আইপিও (প্রাথমিক গণপ্রস্তাব) ও ডিবেঞ্চার ইস্যুর মাধ্যমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত হয় বেক্সিমকো সিনথেটিকস। এ এস এফ রহমান কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে রয়েছেন। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এ কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন। ১৯৯৪ সালের ১ জুলাই বেক্সিমকো সিনথেটিকস বাণিজ্যিক উৎপাদনে আসে। কোম্পানিটি পলিয়েস্টার ফিলামেন্ট সুতা উৎপাদন করে থাকে।

২০১২ সালের পর থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের বেক্সিমকো সিনথেটিকস ধারাবাহিক লোকসানে রয়েছে। ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের শুধুমাত্র বোনাস লভ্যাংশ দেয়। এরপর থেকে লোকসানে চলে গত আট বছর কোনো ধরনের লভ্যাংশ দিতে পারেনি বেক্সিমকো সিনথেটিকস। ২০১৮-১৯ হিসাব বছরেও কোম্পানিটি ২৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা নিট লোকসান দিয়েছে। ২০১৯-২০ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত নিট লোকসান ছিল ১৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ২০১৩ সাল থেকেই জেড ক্যাটাগরিতে এ কোম্পানির লেনদেন হচ্ছে। সম্প্রতি জেড ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর পুনর্গঠনে এসইসির কড়াকড়ি আরোপের কারণেও বেক্সিমকো সিনথেটিকস তালিকাচ্যুত হতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সম্প্রতি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে ‘জেড’ গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত  কোম্পানিগুলোকে ৪৫ কর্মদিবসের মধ্যে চলমান বোর্ড পুনর্গঠন করতে হবে বলে বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে এসইসি। পুনর্গঠনে ব্যর্থ হলে বর্তমান পরিচালক ও উদ্যোক্তারা অন্য কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি ও পুঁজিবাজার মধ্যস্থতাকারী কোনো কোম্পানির পরিচালক হিসেবে থাকতে পারবেন না। কমিশন এ ক্ষেত্রে বিশেষ নিরীক্ষক ও কমিশন কর্তৃক পর্যবেক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে বোর্ড পুনর্গঠন করে ‘জেড’ গ্রুপে কোম্পানির সুশাসন নিশ্চিত করবে। এছাড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন ছাড়া জেড গ্রুপে থাকা কোম্পানির উদ্যোক্তা ও বর্তমান পরিচালকরা তাদের ধারণ করা শেয়ার বিক্রি, ক্রয়, হস্তান্তর এবং প্লেজ করতে পারবেন না। এ এস এফ রহমান ও সালমান এফ রহমান বেক্সিমকো সিনথেটিকস ছাড়াও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেক্সিমকো লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে রয়েছেন। 

বেক্সিমকো সিনথেটিকসের পরিশোধিত মূলধন হচ্ছে ৮৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা। কোম্পানিটির মোট শেয়ারের ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশ উদ্যোক্তা-পরিচালকদের, ১৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠান, বিদেশিদের শূন্য দশমিক শূন্য ২ শতাংশ ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে ৪৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। গতকাল ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের এ কোম্পানির শেয়ার ৮ টাকা ৪০ পয়সায় কেনাবেচা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত