চলে গেলেন মুুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি জিয়াউদ্দিন তারিক

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:৪৭ এএম

করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন মুুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি জিয়াউদ্দিন তারিক আলী। গতকাল সোমবার বেলা ১১টায় রাজধানীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। স্ত্রী, পুত্র-কন্যাসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি।

তার মৃত্যুতে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে তার অবদানের কথা স্মরণ করেন। তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।

জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর ভাগনি ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মালিহা আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। এর মধ্যে শেষ ৯ দিন তাকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) রাখা হয়। তার করোনা পজিটিভ ছিল।’

গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টায় শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে শেষবারের মতো আনা হয় তারিক আলীর মরদেহ। করোনা পরিস্থিতির কারণে সীমিত পরিসরে সহকর্মীরা শ্রদ্ধা জানান। এ সময় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডা. সারওয়ার আলী, সারা যাকের, আসাদুজ্জামান নূর ও মফিদুল হক। পরে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। সেখানে করোনা স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাকে সমাহিত করা হয়।

তারিক আলীর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের শোক বার্তায় বলা হয়েছে, ‘তারিক আলীর মৃত্যুতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবহ কর্মকা- এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার আন্দোলনে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। তার কর্মের অনুপ্রেরণায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এবং বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যাবেএটাই আমাদের আস্থা এবং বিশ্বাস। তিনি রয়ে যাবেন জাতির স্মৃতিতে ও কর্মে।’

উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর শোক বার্তায় বলা হয়েছে, ‘স্বাধীনতার আদর্শ ও অর্জনসমূহকে ধারণ ও তার বাস্তবায়নের  প্রশ্নে দৃঢ়, অনড় ও জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সরব ছিলেন জিয়াউদ্দিন তারিক আলী। তার মৃত্যুতে দেশ ও দেশের জনগণ হারাল একজন অসামান্য দেশপ্রেমিক এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে।’

জিয়াউদ্দিন তারিক আলীর জন্ম ১৯৪৫ সালে। পেশায় প্রকৌশলী তারিক আলী যৌবনের শুরু থেকেই ছিলেন সংগীত অন্তপ্রাণ। ১৯৭০-৭১ সালে গণসংগীতের দলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে তিনি রাজপথে গান গেয়ে বেড়িয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই তিনি সীমান্ত পাড়ি দিয়ে লড়াইয়ে যোগ দেন। মুক্তিসংগ্রামী শিল্পীদলের সদস্য হয়ে শরণার্থী শিবির, মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প, মুক্তাঙ্গনে যোদ্ধাদের গানের মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করার দলে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। লিয়ার লেভিন ধারণকৃত সেই দলের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের ফুটেজ কয়েক দশক পর উদ্ধার করেন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ এবং তাদের সঙ্গী ছিলেন নিউ জার্সিতে সেই সময়ে কর্মরত তারিক আলী। পরে তারেক মাসুদ নির্মিত ‘মুক্তির গান’ প্রামাণ্যচিত্র তরুণদের বিপুলভাবে আলোড়িত করে এবং তারিক আলী ছিলেন এই প্রামাণ্যচিত্রের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব।

১৯৯৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী আটজন ট্রাস্টির অন্যতম ছিলেন তারিক আলী। সেই থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর হয়ে ওঠে তার সব কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু। আগারগাঁওয়ের বিশালাকার নতুন জাদুঘর নির্মাণকাজের তিনি ছিলেন প্রধান সমন্বয়ক। জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ ও ছায়ানটের নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত