সুদিন ফিরেছে পঞ্চগড়ে ক্ষুদ্র চা চাষিদের

আপডেট : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:৫৪ পিএম

পঞ্চগড়ে ক্ষুদ্র চা চাষিদের সুদিন ফিরে এসেছে। মৌসুমের শুরুতে কাঁচা চা পাতার মূল্য নিয়ে হা-হুতাশ করেছিলেন তারা। কাঁচা চা পাতার মূল্য বৃদ্ধির দাবিতে সংবাদ সম্মেলনসহ আন্দোলনে নেমেছিলেন চা চাষিরা। চাষিদের আন্দোলনের কারণে কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ কমিটি জরুরি সভায় নতুন করে দামও নির্ধারণ করে দেয়।

এর দুই মাসের মাথায় কারখানাগুলো নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ বা তারও বেশি দামে পাতা কেনা শুরু করে।

চা চাষিরা বলছেন, কারখানাগুলোর সিন্ডিকেট ভেঙে যাওয়ায় তারা প্রতিযোগিতামূলকভাবে চা পাতা কেনায় দাম বেড়ে গেছে। এতে করে চা চাষিরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি আবারও নতুন করে চা চারা লাগানোর কাজও শুরু হয়েছে।

চা বোর্ড ও চা চাষি সূত্রে জানা গেছে, চলতি চা পাতা সংগ্রহ মৌসুমের শুরুতে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জেলা কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ কমিটির সভায় প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৪ টাকা। শুরুতে কারখানাগুলো এই দামেই চা পাতা কিনলেও গত ২৫ জুন থেকে তারা ১৩ টাকা ৫০ পয়সা দরে পাতা কেনা শুরু করে। শুধু ১২ টাকা কেজিতে নয়; কারখানায় আনা পাতার ৩০-৪০ শতাংশ পাতার ওজন বাদ দিয়ে তারা পাতা কিনতে থাকে।

এতে করে প্রতি কেজি কাঁচা চা পাতার দাম পড়ে ৮/৯ টাকা বা তারও কম। এ নিয়ে আন্দোলনে নামেন ক্ষুদ্র চা চাষিরা।

তারা কাঁচা চা পাতার দাম বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলনে নামে। চা কারখানা মালিকরা সিন্ডিকেট করে কাঁচা চা পাতার দাম কমিয়ে দিয়েছেন এমন অভিযোগ এনে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ স্মল টি গার্ডেন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।

এরই প্রেক্ষিতে গত ২৯ জুন জেলা কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ কমিটি জরুরি সভায় বসে। সভায় চলতি ২০২০-২১ নিলাম বর্ষের পাঁচটি নিলামের গড়মূল্য অনুযায়ী কমিটি প্রতিকেজি কাঁচা চা পাতার মূল্য নির্ধারণ করে ১৩ টাকা পঞ্চাশ পয়সা।

কিছুদিন এই দামেই কারখানাগুলো পাতা কিনলেও গত মাসের শেষের দিক থেকে কারখানাগুলো কাঁচা চা পাতার দাম বাড়াতে থাকে। চলতি মাসের শুরু থেকে কারখানাগুলো প্রতিকেজি কাঁচা চা পাতা ৩০-৩৫ টাকা দরে কিনছে।

পঞ্চগড় সদর উপজেলার সদর ইউনিয়নের গোফাপাড়া গ্রামের চা চাষি মজিবর রহমান জানান, তিনি চার বিঘা জমিতে চা চাষ করেছেন। চলতি মৌসুমে তিন বার পাতা তুলে তিনি ১২ টাকা দরে কারখানায় পাতা দিয়েছেন। সর্বশেষ গত কয়েক দিন আগে কারখানায় পাতা দিয়েছেন প্রতিকেজি ৩১ টাকা দরে।

তিনি আরও বলেন, চা কারখানাগুলো যতি এভাবে চা পাতা কিনে তাহলে চা চাষিরা অধিক লাভবান হবে এবং আরও নতুন নতুন জমিতে চা চাষ করবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি চা কারখানার ম্যানেজার জানান, গাছে পাতার পরিমাণ কমে আসায় পাতার পরিমাণ কিছুটা কমে গেছে। নিলাম বাজারে কিছুটা দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কারখানাগুলোও বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে বেশি দামে পাতা কিনছে। আমি প্রতিকেজি ২০ টাকা দরে পাতা কিনলে অন্য কারখানা কিনছে ২১ টাকায়। এভাবেই পাতার দাম বাড়ছে। বাধ্য হয়ে আমরাও বেশি দামে পাতা কিনছি। কারখানা তো বন্ধ রাখা যাবে না।

তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহে নিলামের তারিখ রয়েছে। গত নিলামের দর বা তার চেয়ে কিছুটা বেশি দাম পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ ২৫ টাকা দরে আমরা পাতা কিনলে আমাদের লোকসান হবে না। এর চেয়ে বেশি দামে পাতা কিনলে আমাদের লোকসান গুনতে হবে।

বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড় জেলায় ২০০০ সালে চা চাষ শুরু হয়। বর্তমানে নিবন্ধিত ৮৯১ জন এবং অনিবন্ধিত ৫০১৮ জন ক্ষুদ্র চা চাষি এবং নিবন্ধিত ৯ টি, অনিবন্ধিত ১৯ চা বাগানে ৭৫৯৮ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে।

গত বছর ১৮ টি চা কারখানায় চার কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ১১০ কেজি কাঁচা চা পাতা থেকে ৯২ লাখ ৪৯ হাজার ৩২৫ কেজি চা উৎপাদন হয়েছে। এবার কোটি কেজি উৎপাদন ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক অফিসের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও এক্সটেনশন অব স্মল হোল্ডিং ট্রি কাল্টিভেশন ইন নর্দান বাংলাদেশ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক কৃষিবিদ ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন জানান, চা রপ্তানি বৃদ্ধির কারণে নিলাম বাজারে চায়ের দাম বেড়ে গেছে। এ কারণে চা কারখানা মালিকরা প্রতিযোগিতামূলকভাবে কাঁচা চা পাতা কেনার কারণে পাতার দাম বেড়ে গেছে। এতে করে চা চাষিরা তাদের চা পাতার মূল্য পেয়ে লাভবান হচ্ছে। নিলাম বাজারে চায়ের দাম স্থিতিশীল অথবা আরও বেড়ে গেলে কারখানা মালিকরা এই দামেই পাতা কিনবে। এতে চা চাষিরা লাভবান হওয়ায় নতুন করে চা আবাদ শুরু হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত