নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে প্রথম এবং ঐতিহাসিক এক রায়ে সাড়ে ছয় বছর আগে রাজধানীর পল্লবী থানায় ইশতিয়াক হোসেন জনিকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তিন পুলিশ সদস্যকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছে আদালত। তারা হলেন বরখাস্ত উপপরিদর্শক (এসআই) জাহিদুর রহমান খান, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) রাশেদুল ইসলাম ও কামরুজ্জামান মিন্টু। এছাড়া পুলিশের দুই সোর্স রাশেদ ও সুমনকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদ- ও ২০ হাজার টাকা অর্থদন্ড দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কেএম ইমরুল কায়েশ গতকাল বুধবার চাঞ্চল্যকর এ মামলায় রায় ঘোষণা করেন।
কারাদ-ের পাশাপাশি পুলিশের দন্ডপ্রাপ্ত তিনজনকে ১ লাখ টাকা করে অর্থদন্ড এবং তা অনাদায়ে ছয় মাস কারাভোগ করতে হবে বলে বলা হয়েছে। নিহত জনির পরিবারকে দন্ডপ্রাপ্ত এ তিনজন ১৪ দিনের মধ্যে ২ লাখ টাকা করে মোট ৬ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেবে এবং এ ক্ষতিপূরণের অর্থ না দিলে তারা আপিলের সুযোগ পাবে না।
এ মামলায় রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ২৪ আগস্ট এক আদেশে রায়ের জন্য ৯ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য রাখা হয়। বিচারের সময় ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। চাঞ্চল্যকর এ মামলায় রায় শুনতে গতকাল সংশ্লিষ্ট বিচারকের এজলাস কক্ষে অগণিত আইনজীবী ও সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। এজলাসের বাইরে করিডোরে ছিলেন জনির স্বজন ও উৎসুক জনতা। এর আগে জনির স্বজন ও এলাকাবাসী ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত ভবনের সামনে আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা চেয়ে মানববন্ধন করেন। রায়ের পর তাদের উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। দুপুর ২টায় রায় ঘোষণা শুরু হয়। এর আগে কারাগারে থাকা আসামি জাহিদ ও কথিত সোর্স সুমনকে আদালতের কাঠগড়ায় হাজির করা হয়। জামিনে থাকা অন্য আসামি রাশেদুলও এ সময় হাজির ছিলেন। তাদের উপস্থিতিতে রায় ঘোষণা করেন বিচারক। তবে অন্য দুই আসামি কামরুজ্জামান মিন্টু ও রাসেল পলাতক থাকায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়ে বলে, যেদিন তারা গ্রেপ্তার কিংবা আত্মসমর্পণ করবেন সেদিন থেকে তাদের সাজা কার্যকর হবে। রায় ঘোষণার পর জাহিদ, সুমন ও রাশেদুলকে কড়া নিরাপত্তায় কারাগারে পাঠানো হয়।
এদিকে এ আইনের মামলার প্রথম রায়ের প্রতিক্রিয়ায় মানবাধিকারকর্মী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলেছেন, রায়টি ঐতিহাসিক এবং একটি মাইলফলক। অব্যাহতভাবে চলা বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর ঘটনায় এ রায় অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। ভুক্তভোগীরা এখন দোষীদের বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস পাবেন এবং বিচারের প্রত্যাশায় থাকবেন। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাদের দায়িত্বের ক্ষেত্রে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হবে। মানবাধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন মহলের দাবির মুখে ২০১৩ সালে ‘নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ)’ আইন করে সরকার। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে বরাবরই আইনটি বাতিল কিংবা সংশোধনের দাবি তোলা হয়। এদিকে বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতন এবং মৃত্যুর ঘটনা ঘটে চলেছে নিয়মিতভাবেই।
রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলে, ‘ভিকটিমের (জনি) তিন বন্ধু এ মামলার চাক্ষুষ সাক্ষী। তারা সাক্ষ্য দিয়েছেন, নির্যাতনের সময় ভিকটিম পানি চাইলে তার মুখে থুথু ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। আসামিরা একটা জঘন্য অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। এটি কেবল আইনের বরখেলাপই নয়, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।’ আদালত আরও বলে, ‘অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মামলাটি নিষ্পত্তি হচ্ছে। ২০১৩ সালের নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে কোনো মামলায় দেশে এটিই প্রথম রায়। আর তিন পুলিশ সদস্যকে যে শাস্তি (যাবজ্জীবন কারাদ-) দেওয়া হয়েছে, এ আইনে এটাই সর্বোচ্চ সাজা।’ রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জনির পরিবার, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা সন্তোষ প্রকাশ করলেও রায়ে সংক্ষুব্ধ আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানান, তারা এ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবেন। নিহত জনির ভাই এবং মামলার বাদী ইমতিয়াজ হোসেন রকি বলেন, এ মামলায় আপসের প্রলোভনসহ আমাদের পরিবারকে বারবার হুমকি দেওয়া হয়। অনেক অভিঘাত পেরিয়ে মামলার রায় হয়েছে। এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিকারী আইনজীবী ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) তাপস পাল বলেন, ‘রায়ে এটিই প্রমাণিত হলো যে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন।’ আসামিপক্ষের আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ জানান, তারা এ রায়ে সংক্ষুব্ধ। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায়। এ আইনে এই রায় অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। বিচারবহির্ভূত হত্যা কখনো কাম্য নয়। এ রায়ের ফলে মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা বাড়বে। পুলিশেরও দায়িত্বশীলতা আরও বাড়বে। কারণ পুলিশের দায়িত্বই হলো মানুষকে রক্ষা করা।’
মানবাধিকার ও আইনি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) চেয়ারপারসন ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই (জহিরুল ইসলাম) খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ রায় একটি মাইলফলক। আইনটি চালু হওয়ার পর এ ধরনের বিচার ছিল অনেকটা স্বপ্নেরও অতীত। এর ফলে যেটি হবে সেটা হলো, যারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্যাতনের শিকার কিংবা নির্যাতনে যারা মারা গেছেন সেসব ভুক্তভোগী মানুষ এখন সাহস পাবে। আগে তো এ সাহসই কেউ পায়নি। পুলিশের বিরুদ্ধেও যে মামলা করা যায় এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা হয় এ রায়ে সেটিই প্রমাণ হলো। তবে এ আইনে এখনো অনেক মামলা বিচারাধীন। আমরা চাই সেই মামলাগুলোও নিষ্পত্তির জন্য বিচারে আসুক।’
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘ সময় পর হলেও এ ধরনের একটি রায় পাওয়া গেছে। এর মধ্য দিয়ে দোষীদের চিহ্নিত করা এবং তাদের বিচারের আওতায় আনা গেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা কিংবা হেফাজতে নির্যাতনে হত্যার যে ধারাবাহিকতা এ রায়ে কিছুটা হলেও ইতিবাচক পরিস্থিতির অগ্রগতি হবে। এখানে অসন্তোষ প্রকাশের কোনোই কারণ নেই। তবে আমাদের জানামতে এ আইনের আরও অন্তত ১৭টি মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। এগুলোর দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখছি না। আমরা চাই এ মামলাগুলোরও বিচার হোক। দোষীরা শাস্তি পাক।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে নানা কারণে এগোনো যায় না। রাষ্ট্রের উচিত এ বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া। ভুক্তভোগী মানুষ যাতে অন্তত আদালতে গিয়ে অভিযোগটা দিতে পারেন। সাক্ষীরা যাতে নির্ভয়ে সাক্ষ্য দিতে পারেন।’
মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মিরপুর ১১ নম্বর সেক্টর এলাকায় একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে পুলিশের সোর্স সুমন মাতাল অবস্থায় বিয়েবাড়ির নারীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ করেন। এ সময় জনি ও তার স্বজনদের সঙ্গে সুমনের বাগ্বিত-া হয়। একপর্যায়ে পুলিশ এসে জনিকে আটক করে পল্লবী থানায় নিয়ে যায়। সেখানে জনির ওপর পুলিশ অকথ্য নির্যাতন চালালে একপর্যায়ে হাসপাতালে মারা যান জনি। এ ঘটনায় ওই বছরের ৭ আগস্ট ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনে পল্লবী থানার ওসি জিয়াউর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নিহত জনির ছোট ভাই ইমতিয়াজ হোসেন রকি। আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেয়। ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট আদালতে পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ওসি জিয়াউর রহমানসহ পাঁচজনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিলেও এএসআই রাশেদুল ও কামরুজ্জামান মিন্টুকে প্রতিবেদনে নতুনভাবে অভিযুক্ত করা হয়। ২০১৬ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। অভিযোগ গঠনের চার বছর চার মাস পর মামলার বিচারকাজ শেষ হলো।
