হত্যাচেষ্টার হোতা বরখাস্ত মালি!

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৩:২৭ এএম

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াহিদা খানমের ওপর তারই অফিসের বরখাস্ত হওয়া চতুর্থ শ্রেণির এক কর্মচারী (মালি) হামলা চালিয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। আলোচিত ওই হামলার ঘটনার দশম দিনে গতকাল শনিবার দিনাজপুরের পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ ব্রিফিংয়ে এমন তথ্য জানান পুলিশের রংপুর রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) দেবদাস ভট্টাচার্য। যদিও এর আগে র‌্যাব ঘোড়াঘাট যুবলীগের নেতা আসাদুল হকসহ তিনজনকে আটকের পর তাদের স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে বলেছিল, ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলা হয় চুরি করতে গিয়ে। এখন সেই আসাদুল হক হামলার ঘটনায় জড়িত নয় বলে দাবি করছে পুলিশ।

তবে এর আগে চুরির উদ্দেশ্যে হামলা হয় বলে র‌্যাবের দেওয়া ভাষ্যের সত্যতা নিয়ে দিনাজপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মাঝে সংশয় তৈরি হয়েছিল। একইভাবে এবার পুলিশের দেওয়া নতুন বক্তব্য নিয়েও সন্দিহান তারা। অবশ্য পুলিশের উদঘাটনকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করছে ওয়াহিদার পরিবার।

গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলা পরিষদ প্রাঙ্গণে বাসভবনের ভেন্টিলেটর দিয়ে ঢুকে ইউএনও ওয়াহিদা ও তার বাবা ওমর আলীর ওপর হামলা চালানো হয়। মাথায় হাতুড়ির আঘাতে গুরুতর আহত ওয়াহিদা এখন ঢাকায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ঘটনাটি নিয়ে দেশজুড়ে আলোড়নের মধ্যে দুদিন পর তিনজনকে গ্রেপ্তার করে তাদের ‘স্বীকারোক্তির’ বরাত দিয়ে র‌্যাব-১৩ অধিনায়ক রেজা আহমেদ ফেরদৌস সংবাদ সম্মেলনে এসে বলেন, চুরি করতে ওই বাড়িতে ঢুকেছিল আসাদুল (৩৫)। তার সহযোগী ছিল নবীরুল ইসলাম (৩৪) ও সান্টু কুমার বিশ্বাস (২৮)। র‌্যাব বলেছিল, এই আসাদুল হক চুরি করতে গিয়ে ইউএনওর ওপর হামলা চালিয়েছিল। তবে এখন পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা।  তবে ওয়াহিদার ওপর হামলার ঘটনাকে নিছক চুরির ঘটনা হিসেবে মানতে নারাজ সরকারি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সমিতির নেতারা দাবি করেন, ওয়াহিদার ওপর হামলা পরিকল্পিত।

এরই মধ্যে ঘোড়াঘাট উপজেলা পরিষদের বরখাস্ত হওয়া মালি রবিউল ইসলামকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়ে ডিআইজি দেবদাস গতকাল সংবাদ ব্রিফিয়ে বলেন, এই ব্যক্তিই ওয়াহিদার ওপর হামলায় জড়িত।

সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, রবিউল ইসলাম বিরল উপজেলার ধামাহার গ্রামের বাসিন্দা। গত শুক্রবার রাতে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে হামলার দায়ও স্বীকার করেছেন তিনি।

ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ‘সিসিটিভির ফুটেজ ও হামলার ঘটনায় ব্যবহৃত জিনিসপত্রের আলোকে আমরা বেশ কয়েকজনকে ঘটনা সংক্রান্তে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। আমরা একজন ব্যক্তিকে (রবিউল) আটক করেছি। সে ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা স্বীকার করে বক্তব্য প্রদান করেছে। তার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আমরা বেশ কিছু আলামতও উদ্ধার করেছি। সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে সেটির সঙ্গে আমরা মিলিয়ে দেখছি। আজকে (শনিবার) তাকে আমরা বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করব এবং আমরা তার রিমান্ড চাইব। রিমান্ডে নিয়ে এসে তাকে আমরা আরও জিজ্ঞাসাবাদ করব। ঘটনা সংক্রান্তে সম্পূর্ণ তথ্য সেটি সংগ্রহ করার চেষ্টা করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু বিষয়টি এখনো চলমান রয়েছে, আমি মনে করি যে এই পর্যন্তই আমাদের বক্তব্য। পরবর্তীতে আমরা যখন তদন্তটি শেষ করব, তখন আরও যদি বিস্তারিত জানার থাকে তখন জানাব।’

রবিউলের সঙ্গে অন্য কারও জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ‘আমরা তদন্ত করে দেখছি। কারও সম্পৃক্ততা পেলে অবশ্যই জানাব।’

এই ঘটনার মূল সন্দেহভাজন আসামি আসাদুল ইসলামের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিআইজি বলেন, ‘আসাদুলের আজকে ৭ দিনের রিমান্ড শেষ। তাকে আদালতে প্রেরণ করা হবে। আসাদুলকে আর রিমান্ড চাওয়া হবে না।’

কে এই রবিউল : দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায় রবিউল ইসলাম দিনাজপুর জেলা প্রশাসকের ডাকবাংলোতে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে বছরখানেক আগে তাকে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে বদলি করা হয়। সেখানে গিয়ে রবিউল ইসলাম ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ৫০ হাজার টাকা চুরি করে। সেই টাকা চুরির অপরাধে রবিউল ইসলামকে গত ফেব্রুয়ারি মাসে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে বিভাগীয় মামলা দায়ের হলে মামলার তদন্তে টাকা চুরির সত্যতা পাওয়া গেলে রবিউল ইসলামকে চাকরিচুত্য করা হয়। সেই ক্ষোভ থেকেই ইউএনওকে হত্যাচেষ্টা চালায় বলেও ধারণা করছেন প্রশাসনের অনেকেই।

রবিউল ইসলামের বাড়ি দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলায় হলেও ঘটনার দিন রবিউল ইসলাম সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত ঘোড়াঘাটে অবস্থান করছিলেন বলেও জানা গেছে। তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়। যদিও দিনাজপুর শহর থেকে ঘোড়াঘাট উপজেলার দূরত্ব প্রায় ৮৫ কিলোমিটার। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, রবিউল ইসলাম ঘটনার দিন বিকেল বেলা দিনাজপুর শহরের ফুলবাড়ী বাসস্ট্যান্ড থেকে একটি বাসে উঠে ঘোড়াঘাট পৌঁছায়।

রবিউল ইসলাম জুয়ায় আসক্ত ছিলেন বলেও জানা যায়। জুয়া খেলতে গিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছে ধারদেনা করেন। এতে অনেক মানুষ রবিউল ইসলামের কাছে টাকা পায় বলেও জানান অনেকেই। ওয়াহিদার ওপর হামলার ঘটনায় ইউএনও অফিসের নৈশপ্রহরী নাদিম হোসেন পলাশেরও জড়িত থাকার কথা জানা গেছে। রবিউলকে সহযোগিতা করেছেন পলাশ। এছাড়া রবিউল ইসলাম দীর্ঘদিন ইউএনওর কার্যালয়ে চাকরি করার সুবাধে কোথায় কী আছে সেগুলোও জানা ছিল তার।

ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর : গতকাল বিকেলে আটক রবিউল ইসলামকে ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন বিচারক। দিনাজপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (আমলি আদালত-৭) ইসমাইল হোসেন এই আদেশ প্রদান করেন।

দিনাজপুর কোর্ট পুলিশ পরিদর্শক ইসরাইল হোসেন জানান, পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) পক্ষ থেকে আটক রবিউল ইসলামের ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছিল। বিচারক ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

অন্যদিকে ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলার ঘটনায় তার সরকারি বাসভবনের নৈশপ্রহরী নাদিম হোসেন পলাশকে আটকের পর আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশের উদঘাটনকে বিশ্বাস করছে ওয়াহিদার পরিবার : ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া নতুন তথ্যকে বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করছেন তার বাবা ওমর আলী শেখ ও মা রুমিসা বেগম।

ওমর আলী শেখ গতকাল সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছু দিন আগে ওয়াহিদার ব্যাগ থেকে টাকা চুরি হয়। সেই সময় উপজেলা কার্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী রবিউলকে সন্দেহভাজন হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে তিনি তখন জিজ্ঞাসাবাদে চুরির কথা স্বীকার করেননি। পরবর্তী সময়ে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে টাকা চুরির অপরাধে রবিউল ইসলামকে গত ফেব্রুয়ারি মাসে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে বিভাগীয় মামলা দায়ের হলে মামলার তদন্তে টাকা চুরির সত্যতা পাওয়া গেলে রবিউল ইসলামকে চাকরিচ্যুত করা হয়। আর এই ক্ষোভ থেকেই রবিউল আমার মেয়ের ওপর হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা চালায়। আর এটিই প্রকৃত কারণ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই এ হামলার সঙ্গে আরও কারা জড়িত আছে সব বের হয়ে আসবে।’

নিজের বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ওমর আলী বলেন, এখন তিনি রংপুর মেডিকেলে রয়েছেন। অনেকটাই সুস্থ। রাত ৯টার গাড়িতে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন। আগামীকাল ঢাকায় তার একটি ছোট অপারেশন করার কথা রয়েছে।

পুলিশের ‘নতুন গল্প’ মেনে নিতে পারছেন না দিনাজপুরবাসী :  ইউএনও ওয়াহিদার ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া নতুন বক্তব্য নিয়ে সন্দিহান দিনাপুরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।

দিনাজপুর নাগরিক উদ্যোগ কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একজন মালি এ রকম ঘটনা ঘটাবে এটা অসম্ভব। এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এ ঘটনায় যারা মাস্টারমাইন্ড তাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। আমার বিশ্বাস পুলিশের সেই ক্ষমতা আছে। পুলিশকে আরও গভীরে যেতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ঘোড়াঘাটের ইউএনও ওয়াহিদা এসিল্যান্ডেরও দায়িত্ব পালন করতেন। ঘোড়াঘাটে খাস জমি, আর্মিদের জমি, বালুমহাল, অবৈধ দখলদারিসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ইউএনও ওয়াহিদা। গোলমাল তো এগুলো নিয়েই। কয়েক দিন আগে বিরামপুরের ইউএনওকে বদলি করা হয়েছিল। বিরামপুরের ইউএনও একটা অবৈধ ড্রেজার মেশিন পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। এ ঘটনার কারণে ইউএনওকে বদলি করার চেষ্টা চালানো হয়েছে। যদিও পরবর্তীতে বদলির আদেশ বাতিল হয়েছে। এগুলো কারা করাচ্ছেন? এর আগে নবাবগঞ্জের ইউএনওকে মারপিট করা হয়েছিল, ঘোড়াঘাট থানার ভেতরে গুলি চালানো হয়েছিল। এগুলোর সঙ্গে জড়িত কারা? তাদের খুঁজে বের করে আনতে হবে। শেখ হাসিনা সরকারকে বিপদে ফেলার জন্যই ক্ষমতাসীন দলের কেউ কেউ নব্য বিএনপি-জামায়াত থেকে দলে আসা লোকজনকে নিয়ে এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে।’

জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও ত্রাণ পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক আলতাফুজ্জামান মিতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গোটা তদন্ত বিষয়টা একটার সঙ্গে আরেকটার মিল নেই। পুরো বিষয়টা অসঙ্গতিপূর্ণ। আরও কোনো বিষয় সামনে আসবে কি-না সেটাও দেখার বিষয়। আমাদের ক্ষোভ প্রকাশ করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। চুরির পরে চাকরিচুত্য একজন মানুষ ইউএনওর ওপর হামলা চালাতে পারে এটা আমার কাছে মনে হয় না। বরং এর পেছনে কারা জড়িত তাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত