কেপলার ওয়েসেলস : দক্ষিণ আফ্রিকার পুনরুত্থানের নায়ক

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০১:৪৮ এএম

কেপলার ওয়েসেলসের বয়স তখন ২১। ততদিন ক্রিকেটে ক্যারি প্যাকার বিপ্লব এসে গেছে। ভিএলএফ পার্ক মেলবোর্নে ফ্লাডলাইটের আলোয় খেলছেন বিগ বয়েজরা। সেই ম্যাচে ছিলেন ওয়েসেলসও। হঠাৎ কলিন ক্রফটের একটা আগুনে বাউন্সার মাথায় লাগে তার। দর্শকরা আঁতকে উঠেছিলেন। তিনি ভ্রƒক্ষেপ করেননি। উঠে দাঁড়িয়ে ক্রফটের পরের বলে পয়েন্ট দিয়ে বাউন্ডারি মেরেছিলেন। অনেক চেষ্টা করেও সেদিন তাকে থামাতে পারেনি উইন্ডিজ। ১২৬ করেছিলেন। ক্রিকেট সে সব বীরত্বগাথা মনে রাখেনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়া কে কবে অন্য খেলার বীরত্ব মনে রেখেছে? কেপলারের জীবনে এটাই ট্র্যাজেডি। জন্মেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। নিজের প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটেছিল যখন বর্ণবৈষম্যের কারণে ক্রিকেট থেকে প্রোটিয়ারা নির্বাসিত।

ওয়েসেলসের টেস্ট অভিষেক হয় অস্ট্রেলিয়াতে। ১৯৮২-তে ব্রিজবেনে তিনি প্রথম টেস্ট খেলেছিলেন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে। ওপেনিংয়ে নেমে ১৬২ রানের ইনিংস খেলেছিলেন। বব উইলিস-ইয়ান বোথামরা পাত্তা পাননি। দ্বিতীয় ইনিংসে করেন ৪৬। অস্ট্রেলিয়া জিতেছিল ৭ উইকেটে। প্রথম আট টেস্টে তিন সেঞ্চুরি করেছিলেন ওয়েসেলস। ইনিংসগুলো যথাক্রমে ১৬২, ৪৬, ৪৪, ১, ৪৭, ১৪, ১৯, ৫৩, ১৪১, ১২, ৩৫, ১৭৯, ২। যতদিন অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলেছেন, ধারাবাহিকতা অব্যাহত ছিল। অথচ বর্ণবৈষম্যের অভিশাপ না লাগলে আরও আগে নিজের দেশের হয়েই টেস্ট খেলতে পারতেন তিনি।

১৯৫৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ব্লুমফনটেনে জন্ম ওয়েসেলসের। তরুণ বয়সে এমন প্রতিভার নজির রেখেছিলেন যে ক্যারি প্যাকার সিরিজের ক্রিকেট কর্তারা খুশি হন। ২১ বছরে তার সঙ্গে চুক্তিবদ্ধও হয়। ফলে ইয়ান আর গ্রেগ চ্যাপেল এবং ডেনিস লিলিদের সঙ্গে খেলার সুযোগ আসে। এক সাক্ষাৎকারে ওয়েসেলস বলেছিলেন, ‘ওটা ছিল অসাধারণ ব্যাপার। ক্রিকেট সিস্টেমের বাইরে থেকে বছরের পর বছর আমি যা শিখতে পারিনি, চ্যাপেল ভাই এবং লিলিদের সঙ্গে খেলে মাত্র ৬ মাসে তার চেয়ে অনেক বেশি শিখেছিলাম। ইয়ান ছিলেন অধিনায়ক। অত্যন্ত সম্মানিত টিম মেম্বার। আমি তার স্টাইলের ভক্ত ছিলাম। গ্রেগ ছিলেন পারফেকশনিস্ট। তার রান করার ধরনটাই ছিল অন্যরকম। আর ডেনিস লিলির ওয়ার্ক এথিকস আমার জন্য ছিল মানদন্ড।’

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে টেস্ট অভিষেকে সারা ফেলার আগেই রীতিমতো তারকা ছিলেন ওয়েসেলস। কারণ উইন্ডিজের বিরুদ্ধে সুপার টেস্ট সিরিজে দারুণ ব্যাটিংয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। প্রথম ম্যাচে করেন ৪৬। যা নিয়ে ক্যারি প্যাকার স্বয়ং মজা করে বলেছিলেন, ‘আমি চল্লিশের ঘরে আউট হওয়া কোনো ব্যাটসম্যানেকে নিতে চাই না।’ এটা শুনেছিলেন ইয়ান চ্যাপেল। পরের ম্যাচে সেঞ্চুরি করেন ওয়েসেলস। সুযোগ পেয়ে প্যাকারকে অজি অধিনায়ক বলেছিলেন, ‘এখন কী বলবে।’ তবে এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটে ওয়েসেলসের প্রতিষ্ঠার পথ মসৃণ ছিল। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘প্রথম অস্ট্রেলিয়াতে আসার পর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা কঠিন ছিল। কুইন্সল্যান্ডের হয়ে ভালো খেলতে থাকি। এরপর মিডিয়ার চোখে পড়লাম। তারপর অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে না খেলে দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে যাওয়া সহজ ছিল না।’

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ওয়েসেলসের ব্যাটিং গড় পঞ্চাশের ওপর। সেঞ্চুরি ৬৬টা। হাফ সেঞ্চুরি আছে ১৩২টা। রান ২৪ হাজারের ওপর। অস্ট্রেলিয়া এবং বর্ণবৈষম্যের অভিশাপ মুক্তির পর দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে টেস্ট খেলেছেন। ৪০ টেস্টে ৪১ গড়ে ২৭৮৮ রান করেছেন। সেঞ্চুরি ৬টি। হাফ সেঞ্চুরি ১৫। তুলনায় ওয়ানডেতে কম সফল ছিলেন ওয়েসেলস। ১০৯ ম্যাচে ৩৩৬৩ রান করেছেন ৩৪.৩৫ গড়ে। কিন্তু তার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরে দক্ষিণ আফ্রিকা সমীহ জাগানিয়া দল হয়ে উঠেছিল। ভারতের বিপক্ষে ১৯৯১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রত্যাবর্তনের সিরিজে ছিলেন ওয়েসেলস। এরপর অতি দ্রুত সময়ে শক্তিশালী দলে পরিণত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। এই উত্থানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন ওয়েসেলস। ১৯৯২ বিশ্বকাপে ওয়ানডে ক্রিকেটে নতুন শক্তি হিসেবে সেমিফাইনাল খেলেছিল দক্ষিণ আফ্রিকা।

সিডনির প্রথম ম্যাচে তারা ১৭০ রানে অস্ট্রেলিয়াকে অলআউট করেছিল। অমন দুরন্ত পারফরমেন্সের পর নেলসন ম্যান্ডেলা শুভেচ্ছাবার্তা পাঠিয়েছিলেন। সেই ম্যাচে ব্রস রিডকে বাউন্ডারি মেরে দুই হাজার রানের মাইলফলকে পৌঁছান ওয়েসেলস। জায়ান্ট স্ক্রিনে অভিনন্দন বার্তা শুনে এক অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটার বলে ওঠেন, ‘১৯৫০ রানই আমাদের হয়ে করা।’

বিরানব্বই বিশ্বকাপে বৃষ্টি আইনে বাদ পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকা। এক পর্যায়ে ১৩ বলে ২২ রান দরকার ছিল। কিন্তু বৃষ্টির পর হিসাব দাঁড়ায় ১ বলে ২২। বৃষ্টির আশীর্বাদ নিয়ে ইংল্যান্ড ফাইনাল খেললেও কাপ জিততে পারেনি। চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ইমরান খানের পাকিস্তান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত