ফুলের কানে ভ্রমর এসে চুপি চুপি বলে যায় তোমায় আমার সারাটি হৃদয় নীরবে জড়াতে চায়...সত্তরের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় বাংলা গান। সে সময় ফুল বা ভ্রমর কেউ কথা বলতে পারে না ধরে নিয়েই গানে তাদের ব্যবহার করা হয়েছিল রূপক অর্থে। তবে এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, তারা ভ্রমর ও ফুলের মধ্যকার সংলাপ শনাক্ত করার চেষ্টা শুরু করেছেন। তাদের দাবি, ফুল ও ভ্রমরের মধ্যে ‘কথোপকথন’-এর রহস্য কিছুটা হলেও ভেদ করেছেন।
ভ্রমর ও ফুলের মধ্যে নানা আদান-প্রদান চলে। আক্ষরিক অর্থেই পোকামাকড় ও ফুলের মধ্যে বিশেষ একধরনের আকর্ষণ কাজ করে। ভ্রমর কোনো ফুলের ওপর নামলে পরাগ সঙ্গে সঙ্গে খাড়া হয়ে ওঠে এবং সূক্ষ্ম রোমগুলো জোরালোভাবে চেপে ধরে।
ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডানিয়েল রোবার্ট ফুল ও পরাগবহনকারীদের মধ্যে এই ‘জাদুময় সংযোগ’ পরীক্ষা করছেন। তিনি বলেন, বেশ কিছুক্ষণ ধরে ফুলগাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলে বোঝা যায় যে ভ্রমর সব ফুলের ওপর নামে না। যে ফুলে সবে অন্য পোকা বসেছিল, সেটি এড়িয়ে চলে। অনেক সময় ধরে যেসব ফুলে কোনো অতিথি আসেনি, ভ্রমর সেগুলোর খোঁজ করে। তিনি বলেন, যেসব ফুল নেকটার বা মিষ্টি রসের আধার ভরার যথেষ্ট সময় পেয়েছে, ভ্রমর সেগুলো আলাদা করে শনাক্ত করতে পারে। কোটি কোটি বছর ধরে পোকামাকড় ও ফুলের মধ্যে পরস্পরের জন্য লাভজনক এক সম্পর্র্ক গড়ে উঠেছে। মৌমাছি ও ভ্রমরজাতীয় পোকা নেকটার ও পরাগ পায়। তার বদলে পোকাগুলো পরাগায়নের দায়িত্ব পালন করে। অধ্যাপক রোবার্ট বিষয়টির ওপর আলোকপাত করে বলেন, ‘পরাগবহনকারীদের নিরাশ করার সাধ্য ফুলের নেই। সেটাই বাস্তব ঘটনা। তাহলে সেগুলো আর ফিরে আসবে না। অনেক শক্তি ক্ষয় করে ভ্রমরকে ফুলের ওপর ওঠানামা করতে হয়, নেকটার খুঁজতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে ফুল মুখের ওপর বলে দিতে পারে না, দেখো, ‘তোমার জন্য আমার কোনো নেকটার নেই!’ ফুল এমনকি দ্রুত নিজের রং, গন্ধ অথবা আকার পরিবর্তন করে কোনো সংকেতও দিতে পারে না। অতি বেগুনি রশ্মির প্রতিফলনও বদলাতে পারে না। আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে যে ফুল একটি মাত্র সূচক দ্রুত বদলাতে পারে, আর সেটা হলো নিজস্ব ইলেকট্রস্ট্যাটিক সম্ভাবনা।
তাহলে কি ফুল বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে পোকাদের জানাতে পারে যে কুঁড়িতে নেকটার আছে কি না? সেই সন্দেহ মেটাতে রোবার্ট সবার আগে ফুলের দিকে নজর দিয়েছেন। তিনি বলেন, ফুলের যে নেগেটিভ চার্জ রয়েছে, আমরা তা পরিমাপ করতে পেরেছি। ইলেকট্রনে পরিপূর্ণ মাটিতে গাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে। আশপাশের পরিবেশের তুলনায় ভূপৃষ্ঠেরও নেগেটিভ চার্জ রয়েছে। সেই ঋণাত্মক চার্জ মাটি থেকে ফুলে স্থানান্তরিত হয়। অর্থাৎ ফুলের চার্জ নেগেটিভ। অন্যদিকে ভ্রমর ওড়ার সময় ইলেকট্রন ‘ছড়িয়ে বেড়ায়’। বাতাসের সঙ্গে ঘর্ষণের কারণে এমনটা ঘটে। অর্থাৎ ভ্রমরের পজিটিভ চার্জ রয়েছে।
ভ্রমর যে ইলেকট্রস্ট্যাটিক ক্ষেত্র টের পায়, অধ্যাপক রোবার্ট গবেষণাগারে তা প্রমাণ করতে পেরেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ভ্রমরের কলোনিকে সেই পরীক্ষায় শামিল করা হয়েছিল। গবেষকরা অতিক্ষুদ্র নেগেটিভ চার্জ তৈরি করে নেকটার-ভরা ফুলের নকল করেছিলেন। ভ্রমর এত সূক্ষ্ম তারতম্য সত্ত্বেও প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই গবেষকদের দাবি, নিউরো বায়োলজিস্টরা এমনকি ফুল ও ভ্রমরের মধ্যে ‘কথোপকথন’ শ্রবণযোগ্য করে তুলতে পারেন।
