স্কুল-কলেজ খোলার সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীই দেবেন

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০২:১৯ এএম

দেশে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার মুখে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছিল মন্ত্রিসভা বৈঠকে। গত ১৬ র্মাচ মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩১ মার্চ পর্যন্ত বন্ধে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিলেন। গত সোমবার মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয়ভাবে নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে স্ব স্ব মন্ত্রণালয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিবের এ বক্তব্যের পর অনেক অভিভাবক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার সময় যেভাবে মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, একইভাবে খোলার বিষয়েও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত দরকার। তাদের উদ্বেগ, মন্ত্রণালয়গুলো আলাদা আলাদাভাবে জনগুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত নিতে গেলে হয়তো পরিস্থিতি অনুধাবন করতে ব্যর্থ হবে। যার চড়া মাশুল দিতে হতে পারে।

গতকাল মঙ্গলবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম আল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কবে স্কুল খুলবে তা সামগ্রিক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সব কিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করা হবে। আমরা ইতিমধ্যে কিছু নির্দেশনা দিয়েছি। বিদ্যালয়গুলো সেগুলো অনুসরণ করছে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে। কাজেই সিদ্ধান্তও হবে যৌথভাবেই। আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হবে। সারসংক্ষেপ আকারে না গেলেও মৌখিকভাবে হলেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করবেন শিক্ষামন্ত্রী।’

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয়গুলোই নিতে পারে। সারা দেশে করোনাভাইরাসের চিত্র এক রকম নয়। অনেক এলাকা রয়েছে যেখানে করোনাভাইরাস নেই। সেসব এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নিতেই পারে। আর মন্ত্রিসভা বৈঠকে যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছিল তখন বিশেষ পরিস্থিতি ছিল। তখনকার সেই সিদ্ধান্তও শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিতে পারত।’

করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। এ কারণে ইতিমধ্যে এ বছরের প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। এমনকি করোনা সংক্রমণের কারণে আগামী নভেম্বর মাসেও যদি বিদ্যালয় খোলা না যায়, তাহলে চলতি বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়া হবে না। তবে অক্টোবর বা নভেম্বরেও যদি বিদ্যালয় খোলে, তাহলে সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে মূল্যায়নের চিন্তা আছে সরকারের।

করোনা পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। দেশে করোনার সংক্রমণ এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। লক্ষণও আশাব্যঞ্জক নয়। এমন পরিস্থিতিতে কবে নাগাদ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে তা বলতে পারছেন না শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও শহরের সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করছে। তবে দেশের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এই সুবিধার বাইরে। সরকার টেলিভিশনে রেকর্ড করা ক্লাস সম্প্রচার করছে, সেখানেও অনুসরণকারীদের সংখ্যা ভালো নয়। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জরিপ অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণির ৫৬ শতাংশ শিক্ষার্থী টেলিভিশনের ক্লাসে অংশগ্রহণ করছে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই ক্লাস করছে না। মাধ্যমিক স্তরে টেলিভিশনের ক্লাসের চিত্রটিও কমবেশি একই।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় পৌনে ৩ কোটি। ইতিমধ্যে এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর পড়াশোনার ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত স্কুল খোলার পরিবেশ তৈরি হয়নি। তবে স্কুল খোলার আগে প্রতিটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক কোন কোন নির্দেশনা অনুসরণ করবেন, সেটি জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে যখন পুনরায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে তখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তার একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তাতে বলা হয়, যখন খুলবে, তখন সব শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীকে বাধ্যতামূলকভাবে মাস্ক পরতে হবে এবং হাত ধোয়াসহ স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। স্কুলের  অবকাঠামো ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে একাধিক পালা বা সপ্তাহের একেক দিন একেক শ্রেণি শিক্ষার্থীদের পাঠদানের ব্যবস্থা করবে কর্তৃপক্ষ।

এতে আরও বলা হয়, বিদ্যালয় পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত হলে নিরাপদ এলাকা ও পরিস্থিতি বিবেচনায় এলাকাভিত্তিক বিদ্যালয় চালু করা যেতে পারে। সরকার কোনো এলাকাকে ‘রেড জোন’ ঘোষণা করলে সেই এলাকায় বিদ্যালয় খোলা রাখা যাবে না। ছেলে ও মেয়েদের জন্য আলাদা শৌচাগার স্থাপন বা সম্প্রসারণ করতে হবে। স্কুল খোলার আগে অবশ্যই স্কুল প্রাঙ্গণসহ শ্রেণিকক্ষ, অফিসকক্ষ ও টয়লেটগুলো স্বাস্থ্যসম্মত ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে। এ রকম অন্তত ৩৫টি নির্দেশনা মানার কথা বলা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত