ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় শিশু ধর্ষণচেষ্টা মামলার এক আসামিকে গলায় ফুলের মালা পরিয়ে গাড়িবহর নিয়ে শোডাউন ও আনন্দ উল্লাস করে এলাকায় আতঙ্ক তৈরির অভিযোগ উঠেছে। বাদ যায়নি মিষ্টি বিতরণও। গত সোমবার বিকেলে হীরাপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মতিউর রহমান ওরফে মুক্ত মিয়া (৮০) নামে ওই আসামি উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে এলাকায় ফেরেন। তখন তাকে বরণ করার নামে স্বজন ও সমর্থকরা এমন কাণ্ড করে বলে জানা গেছে। এ ঘটনার কয়েকটি ছবি ও ভিডিও ক্লিপ ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়াজুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে।
এদিকে আসামি মুক্ত মিয়া এলাকায় ফেরার পর তার পক্ষের লোকজন নির্যাতনের শিকার শিশুর বাড়ির পাশে মিছিল করাসহ পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন হুমকি দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিশুটির মা।
মামলার এজাহার থেকে পাওয়া তথ্য ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্যাতনের শিকার শিশুর বাবা মারা গেছেন। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে শিশুটি তিন-চার বছর ধরে মামার বাড়ি হীরাপুর গ্রামে থাকে। স্থানীয় নূরপুর লামারবাড়ি সুমাইয়া মাদ্রাসার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ওই শিশুকে খাবার খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে গত ১৫ জুলাই সকালে একটি পরিত্যক্ত ঘরের বারান্দায় নিয়ে গিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করেন প্রতিবেশী মুক্ত মিয়া। এ সময় তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এলে মুক্ত মিয়া পালিয়ে যান। বিষয়টি এলাকার মাতবরদের জানিয়ে প্রতিকার চান শিশুর মামা। তারা মীমাংসা করে দেবেন বলে আশ্বস্ত করে এ ব্যাপারে কোনো মামলা না করার পরামর্শ দেন। কিন্তু এক মাস পার হয়ে গেলেও কোনো বিচার না পেয়ে গত ১৭ আগস্ট শিশুর মা মুক্ত মিয়াকে আসামি করে আখাউড়া থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় গত ৯ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট থেকে জামিন পান মুক্ত মিয়া। জামিন নিয়ে সোমবার বিকেলে এলাকায় পৌঁছলে তাকে ফুলের মালা পরিয়ে ও ফুল ছিটিয়ে বরণ করে নেয় স্বজন ও সমর্থকরা। পরে ১০-১২টি মোটরসাইকেল ও কয়েকটি প্রাইভেট কার নিয়ে মুক্ত মিয়ার গলায় ফুলের মালা পরিয়ে এলাকায় শোডাউন ও মিষ্টি বিতরণ করা হয়। আর এই সবকিছু হয়েছে তার আইনজীবী ছেলের নেতৃত্বে।
হীরাপুর গ্রামের বাসিন্দা কৃষক আমির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মুক্ত মিয়া যে ঘটনা ঘটিয়েছেন তার তীব্র নিন্দা জানাই। এত নিকৃষ্ট ঘটনা আমরা আগে কখনো শুনিনি। এর বিচার না হলে দেশে আইন বলে কিছু থাকবে না। মেয়েটি এতিম, মামার বাড়িতে থাকে। তার মামাও কৃষিকাজ করে।’
একই গ্রামের বাসিন্দা বৃদ্ধ আবুল খায়ের বলেন, ‘মুক্ত মিয়া জামিন পেয়ে এলাকায় এলে তার অ্যাডভোকেট ছেলে কয়েকটা প্রাইভেট কার ও মোটরসাইকেল নিয়ে শোডাউন দিয়ে গলায় ফুলের মালা পরিয়ে ঘুরে বেড়ায়। আমাদের মিষ্টি খাওয়ার দাওয়াত দেয়। কিন্তু আমরা কেউ যাইনি।’
আখাউড়া স্থলবন্দরে সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী ও হীরাপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্বাস উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, ‘মুক্ত মিয়া আমার আপন মামা হন। উনি যে ঘটনাটি ঘটিয়েছেন তার সত্যতা পেয়েছি। চেষ্টা করেছি পরিবারের লোকজন নিয়ে মেয়ের পক্ষের সঙ্গে সমাধান করার জন্য। শুনেছি মামা উচ্চ আদালত থেকে জামিনে এসেছেন। এসেই গলায় ফুলের মালা পরে এলাকায় শোডাউন ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন। এটা ভালো হয়নি। আমি এর নিন্দা জানাই।’
নির্যাতিত শিশুর মা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসামি জামিন পেয়ে খুশিতে মিষ্টি বিতরণ করেছে। ফুলের মালা পরে আমাদের বাড়ির পাশে মিছিল করে মহড়া দিচ্ছে। ওরা প্রভাবশালী। আমাদের হুমকিধমকি দিচ্ছে। আমরা আতঙ্কে আছি।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্ত মিয়ার ছেলে আইনজীবী মিলন বলেন, ‘আমার বাবাকে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসানোর জন্য মিথ্যা মামলা দিয়েছে। হাইকোর্ট আমার বাবার বয়স বিবেচনা করে জামিন দিয়েছে।’ আর অভিযুক্ত মুক্ত মিয়া বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়। আমি মাদকের বিরুদ্ধে কথা বলি, তাই আমাকে ফাঁসানো হয়েছে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বারের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহবুবুল হক খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কোনো আসামি জামিনে আসলে উল্লাস করা কাম্য নয়।’
