দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামী ১ অক্টোবর উদ্বোধন হতে যাচ্ছে সিলেটের এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দুই হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। ওইদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এর উদ্বোধন করবেন। এ জন্য গতকাল রবিবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সদর দপ্তরে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সমন্বয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে বর্ণাঢ্য ও সফল করতে ইতিমধ্যে সবাইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি আন্তর্জাতিক দৃষ্টিনন্দন টার্মিনাল ও কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্মাণকাজ। টার্মিনাল বিল্ডিংয়ের সঙ্গে এয়ারফিল্ড গ্রাউন্ড লাইট এপ্রোন স্থাপনের প্রকল্প রাখা হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই চীনের স্বনামধন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিইউসিজিকে গত ২৪ মার্চ কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। এখন উদ্বোধনী প্রস্তুতি নিয়ে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে। আশা করি ১ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী প্রকল্পের উদ্বোধন করবেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমান সরকারের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে এই প্রকল্পটি। এতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। বিমানবন্দরটির সংস্কার ও সম্প্রসারণের জন্যই এই প্রকল্প। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি হবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বর্তমানে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম। পৃথিবীর অষ্টম বৃহৎ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চীনের বিইউসিজি নামের কোম্পানি এরই মধ্যে গ্রাউন্ডওয়ার্ক শুরু করেছে। মাস পাঁচেক আগে প্রকল্পের কার্যাদেশ পেয়ে ওই কোম্পানির অন্তত এক ডজন বিশেষজ্ঞ এখন ঢাকা ও সিলেটে অবস্থান করছেন। কভিড বিপর্যয় দেখা না দিলে এতদিনে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়ে যেত। বিমান প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, সিনিয়র সচিব মহিবুল হক ও বেবিচক চেয়ারম্যান মফিদুর রহমান ইতিমধ্যে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন। তাদের একান্ত উৎসাহ ও আগ্রহেই করোনা তা-বকে উপেক্ষা করে শুরু হতে যাচ্ছে অক্টোবর যাত্রা। দেশের তৃতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে সিলেটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রীও চাচ্ছেন যথাসময়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ শুরু ও শেষ করতে। যাতে আন্তর্জাতিক এভিয়েশনেও ওসমানী বিমানবন্দর একটা নিজস্ব অবস্থান প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। বর্তমানে সিলেটে লন্ডন থেকে আগত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ল্যান্ড করতে পারলেও চার শতাধিক আসনের সুপরিসর বোয়িং ৭৭৭ উড়োজাহাজ প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও পূর্ণ আসনের যাত্রী নিয়ে উড্ডয়ন করতে পারছে না। রানওয়ের তেমন সক্ষমতা নেই। যদিও লন্ডন থেকে এ পরিমাণ যাত্রী ও জ্বালানি নিয়ে ওই উড়োজাহাজ রওনা হয়ে সিলেটে অবতরণ করতে পারছে।
বর্তমান সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার এই প্রকল্প সম্পর্কে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী জানিয়েছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর যাত্রী ও কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতার মান ও পরিধি বৃদ্ধির লক্ষ্যেই বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নিয়েছে বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। তারই ধারাবাহিকতায় পূর্ণ হতে যাচ্ছে সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। সিনিয়র সচিব মহিবুল হক বলেছেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সদয় সম্মতি পেয়েই উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি কাজ শুরু করে দিয়েছি। আগামী দশ দিনের মধ্যে সবই করতে হবে। এ নিয়ে কর্মকৌশলও ঠিক করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে এটা উদ্বোধন করবেন।’
এ প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে বেবিচক প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মালেক জানান, বিইউসিজি বিগত তিন দশক ধরে সুনামের সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিকমানের বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন নির্মাণকাজ করে আসছে। তারা নির্মাণ প্রকৌশল, রিয়েল-এস্টেট, ডিজাইন, ইনভেস্টমেন্ট, প্রপার্টি ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি বিষয়ক ৬টি মূল ব্যবসা পরিচালনা করছে যার মাধ্যমে তাদের বার্ষিক মুনাফার পরিমাণ প্রায় ৫৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমানে বিইউসিজি ১২০টিরও বেশি করপোরেট শাখা, ২৭.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পত্তি ও ২৫ হাজারের অধিক জনবল নিয়ে বিভিন্ন দেশে কাজ করে যাচ্ছে যার স্বীকৃতিস্বরূপ ভূষিত হয়েছে একাধিক সনদে। ইতিমধ্যে তারা সফলভাবেই পেইচিং ক্যাপিটাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, মালদ্বীপ ভেলেনা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিকমানের কাজ সম্পন্ন করেছে। এসব বিবেচনায় সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরের কাজের জন্য বিইউসিজিকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়েছে।
বেবিচকের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, এই প্রকল্পের আওতায় একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক টার্মিনালের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন বোর্ডিং ব্রিজ, ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম, ফ্লাইট ইনফরমেশন ডিসপ্লে সিস্টেমসহ অন্যান্য অত্যাধুনিক টার্মিনাল বিল্ডিং সম্পর্কিত সব ধরনের যন্ত্রপাতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যার ফলে বিমানবন্দরের যাত্রীসেবার মান বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। বিমানবন্দর টার্মিনালে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য এই প্রকল্পের আওতায় পৃথক সাব-স্টেশন স্থাপনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এছাড়াও বিমানবন্দরের নিরাপত্তার জন্য ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম এবং স্বাচ্ছন্দ্যে টার্মিনাল ব্যবহারের জন্য সেন্ট্রাল এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সিএএবি কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। সম্প্রতি এটি বিভিন্ন ধরনের অত্যাধুনিক নিরাপত্তাযন্ত্র কিনেছে। এর মধ্যে ছিল বিশ্বমানের ইডিএস সিস্টেম। কার্গোতে ইডিএস ও আরএথ্রি এরিয়া সংযোজনের মাধ্যমে কার্গো স্ক্যানিং আরও নিখুঁত এবং সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত করা হয়।
তারা আরও জানান, যাত্রীসেবার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে লিফট এস্কেলেটর, এয়ারপোর্ট সাইনেজ এবং নজরদারি জোরদার করার জন্য সিসিটিভি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি উড়োজাহাজের জেট-১ জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যাধুনিক ফুয়েল হাইড্রান্ট সিস্টেম স্থাপন করা হবে। এতে সব ধরনের উড়োজাহাজ খুব সহজে ও নিরাপদে বিমানবন্দর থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবে। তাছাড়া বিমানবন্দর টার্মিনাল ব্যবহারকারী যাত্রীদের নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উড়োজাহাজের পাইলট এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের সুবিধার কথা মাথায় রেখে ও নিরাপদ বিমান উড্ডয়নের জন্য সম্পূর্ণ ভয়েস কন্ট্রোল কমিউনিকেশন্স সিস্টেম ও ভয়েস রেকর্ডিং রাডার সিস্টেম স্থাপন করা হবে। সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরের রানওয়ে ওভারলেকরণের কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে এবং বিদ্যমান রানওয়েকে শক্তিশালী ও প্রশস্তকরণের পাশাপাশি নির্ভরযাগ্য লাইটিং সিস্টেমে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। রানওয়ের কাজ শেষ হলে এবং জ্বালানি ডিপো চালু হলে সিলেট থেকে সরাসরি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট অপারেট করা যাবে।
