পুঁজিবাজার থেকে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ৫২৩ কোটি ৮০ লাখ টাকার মূলধন উত্তোলনের অনুমতি পেয়েছে টেলিযোগাযোগ খাতের কোম্পানি রবি আজিয়াটা লিমিটেড, যা দেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় আইপিও। রবি আজিয়াটা টেলিযোগাযোগ খাতের দ্বিতীয় কোম্পানি যেটি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে। গতকাল বুধবার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) এই কোম্পানিকে মূলধন উত্তোলনের অনুমতি দেয়।
এর আগে ২০০৯ সালে দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। রবি তালিকাভুক্তির অনুমোদন পাওয়ার আগে পুঁজিবাজারে সর্বোচ্চ আইপিও ছিল গ্রামীণফোনের, ৪৮৬ কোটি ৮ লাখ টাকা। রবি আজিয়াটা ১০ টাকা অভিহিত মূল্যে ৫২ কোটি ৩৭ লাখ ৯৩ হাজার ৩৩৪টি শেয়ার ইস্যু করবে, যার মধ্যে ১৩ কোটি ৬০ লাখ ৫০ হাজার ৯৩৪টি শেয়ার রবি তাদের কর্মীদের কাছে বিক্রি করেছে। আর গ্রামীণফোন ২০০৯ সালে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার প্রিমিয়ামসহ ৭২ টাকায় ইস্যু করেছিল।
গতকাল আইপিও আবেদনে অনুমোদনের জন্য এসইসিকে ধন্যবাদ জানিয়ে রবি আজিয়াটার চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে রবির জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। পুঁজিবাজারের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ মূলধনি শেয়ার হিসেবে আমরা তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছি, যা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের। সরকারের কাছে আমাদের কিছু প্রত্যাশা ছিল, আমরা আশা করছি এই অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে সে বিষয়গুলো বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে সদয়ভাবে বিবেচনা করা হবে। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার অনুমোদন পাওয়ার মাধ্যমে রবিতে জনগণের অংশীদার হওয়ার সুযোগ তৈরি হলো। উদ্ভাবনী শক্তিতে উজ্জীবিত ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে আমাদের সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সহযোগিতা কামনা করছি।’
রবি আজিয়াটা পুঁজিবাজারে আইপিও ছাড়তে রাজি হলেও দুটি শর্ত দিয়েছিল। সেগুলো হচ্ছে মোবাইল কোম্পানি হিসেবে রবি এখন টার্নওভারের ওপর যে ২ শতাংশ হারে কর দেয়, তার বদলে অন্য কোম্পানির মতো শূন্য দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে কর নির্ধারণ। এ ছাড়া বিদ্যমান নিয়মে ৪৫ শতাংশ হারে করপোরেট করের বদলে রবি কর দেবে ৩৫ শতাংশ হারে। আর এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে ১০ বছরের জন্য। তবে এই দুই শর্তের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ৫২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩৩ হাজার ৩৪০ টাকা তহবিল সংগ্রহ রবি আজিয়াটা নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও আইপিও খাতে ব্যয় করবে। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাব বছরে রবির পরিশোধিত মূলধন ৪ হাজার ৭১৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা, যা আইপিও-পরবর্তী সময়ে ৫ হাজার ২৩৭ কোটি ৯৩ লাখ টাকায় উন্নীত হবে। এর মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিশোধিত মূলধনি কোম্পানি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে রবি।
দেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় আইপিও হলেও রবি আজিয়াটার শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) আশঙ্কাজনক হারে কম। কোম্পানিটিকে নিট মুনাফায় থাকতে অনেক সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ২০১৯ হিসাব বছরে রবির ইপিএস হচ্ছে মাত্র ৪ পয়সা। ফলে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। অবশ্য রবির দাবি অনুযায়ী, টার্নওভার ও করপোরেট কর হার কমানো হলে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বাড়তে পারে।
গত পাঁচ বছরে রবির রেভিনিউ প্রায় ৪৫ শতাংশ বাড়লেও নিট মুনাফা উল্টো কমেছে। কোনো কোনো বছরে কোম্পানিটি বড় ধরনের লোকসানেও পড়েছে। আইপিওর প্রসপেক্টাসে দেওয়া রবি আজিয়াটা লিমিটেডের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে কোম্পানটি ২৪০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে। এরপর ২০১৬ ও ১৭ সালে কোম্পানিটি ৬৯৩ কোটি ও ১০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা লোকসান করে। ২০১৮ সালে ২১৪ কোটি টাকা ও ২০১৯ সালে ১৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা নিট মুনাফা হয় রবির। ২০১৯ সালে ঋণের সুদ হিসেবে ৫০৫ কোটি টাকা পরিশোধ করে কোম্পানিটি।
২০১৯ সালের আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী কোম্পানিটির মোট সম্পদের পরিমাণ ১৭ হাজার ১৯৬ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এ সময় শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ১২ টাকা ৬৪ পয়সায়।
রবি আজিয়াটার আইপিও ইস্যু ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আছে আইডিএলসি ইনভেস্টমেন্টস। এ প্রসঙ্গে আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের এমডি ও সিইও আরিফ খান বলেন, ‘রবি আজিয়াটার এই আইপিওর মাধ্যমে সংগৃহীত তহবিল তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে বলে আমরা বিশ^াস করি। ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে রবির এই অর্জনে সহযোগী হতে পেরে আমরা অত্যন্ত গর্বিত। আইডিএলসি ভবিষ্যতেও এ ধরনের ইতিবাচক কার্যক্রমে সঙ্গে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করছি।’
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি রবি আজিয়াটা ১৯৯৫ সালের ২২ অক্টোবর কার্যক্রম শুরু করে। প্রসপেক্টাসে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোবাইল গ্রাহকের ২৯ দশমিক ৬ শতাংশ রবির।
