রাজধানীর ওসমানী উদ্যান ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে টিন দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। এটিকে ‘গোস্সা বা রাগ নিবারণী’ পার্ক হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে উল্লেখ করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) তখন বলেছিল, পার্কটি এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যে, কোনো রাগান্বিত ব্যক্তি সেখানে গেলে তার মন ভালো হয়ে যাবে। শুরু হয় প্রকল্পের কাজও। এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ করে পার্কটি পূর্ণ সাজে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রতি থাকলেও দুই বছর আট মাস পেরিয়ে প্রকল্পের কাজ হয়েছে মাত্র ২০-২৫ ভাগ।
এদিকে দীর্ঘ সময় ধরে ফেলে রাখলেও কাজের অতিরিক্ত বিল তুলে নিয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। এ পরিস্থিতিতে প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ঠিকাদারের গাফিলতির বিষয়ে মৌখিকভাবে ডিএসসিসি কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কিন্তু এতে কোনো সুফল আসেনি। ফলে পুরান ঢাকার ফুসফুসখ্যাত এ পার্কটিতে আবার কবে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার স্বাভাবিক হবে সে বিষয়ে কারও কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
ডিএসসিসির তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটির নকশা প্রণয়নকারী ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন স্থপতি রফিক আজম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে কাজের পরিধি বাড়ানোর ফলে বাজেট বেড়েছে, তা খুব বেশি সমস্যা নয়। সমস্যা হলো, যে ঠিকাদার কাজ পেয়েছেন তিনি কাজ করছেন না। এমনকি কাজ করার মতো তার যোগ্যতা আছে কি না তাও আমার সন্দেহ হয়। বারবার মেয়াদ বাড়িয়েও আমরা কাজ শেষ করতে পারিনি। এ কাজে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের শতভাগ গাফিলতি রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ইতিমধ্যে ডিএসসিসিকে মৌখিকভাবে এসব বিষয় বলেছি। এতে কোনো কাজ হয়নি। এবার লিখিতভাবে জানাব। আশানুরূপ সাড়া না পেলে আমি এ প্রকল্প থেকে নিজের সম্পৃক্ততা প্রত্যাহার করে নেব।’
পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমত ওসমানী উদ্যানের মতো জায়গায় ইট-পাথরের কাজ যত কম থাকবে ততই ভালো। পার্কে মানুষ যায় একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে, দালানকোঠা দেখতে নয়। এরপরও যেহেতু সেখানে উন্নয়নকাজ শুরু হয়েছে তা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা উচিত ছিল। এখন বছরের পর বছর তো আর একটি পার্ক অবরুদ্ধ থাকতে পারে না। আমরা আশা করব কর্র্তৃপক্ষ দ্রুত সময়ের মধ্যে সবুজায়ন করে এ পার্কটি সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে।’
ডিএসসিসি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৭ জানুয়ারি রাজধানীর গুলিস্তানের কাছে ওসমানী উদ্যানে ‘গোস্বা নিবারণী’ পার্কের উদ্বোধন করেন ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন। ডিএসসিসির ‘জল সবুজের ঢাকা’ প্রকল্পের আওতায় ওসমানী উদ্যানে ২৯ একর জায়গার ওপর প্রায় ৫৮ কোটি টাকা খরচ করে এ পার্ক নির্মাণ করার কথা বলা হয়েছিল। আর তা বাস্তবায়নের সময় ধরা হয়েছিল ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ। সংশ্লিষ্টদের পরিকল্পনায় এ পার্কটিতে মিউজিক সিস্টেম, বসার জন্য আলাদা আলাদা জোন, বাচ্চাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা এবং বড় স্ক্রিনে টেলিভিশন দেখার সুবিধা থাকবে। উদ্যানের লেকটিকে আরও দৃষ্টিনন্দন করা হবে। থাকবে প্যাডেল বোট। পার্কের মধ্যেই থাকবে ফুড কোর্ট এবং ভলিবল ও ক্রিকেট খেলার ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে পার্কে বাজবে হারানো দিনের গান। বিস্তর ওয়াকওয়েতে হেঁটে ক্লান্ত পথিকরা হাতের নাগালে পাবেন বিনামূল্যে রাস্তার পাশে সুপেয় পানি। থাকবে জিম ও ইয়োগা করার ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে পুরান ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে থাকবে নগর মিউজিয়ামের বিশাল আয়োজন। অভ্যন্তরীণ ড্রেনেজ সিস্টেম ও বিদ্যুতায়নে পুরো পার্কে থাকবে আলোর ঝলকানি। এছাড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থায় থাকবে ৩৫০টিরও বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পার্কটিতে প্রথমে ৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হলও পরে তা বাড়িয়ে ৮৬ কোটি টাকা করা হয়। সঙ্গে যুক্ত করা হয় কিছু নতুন পরিকল্পনা। এছাড়া নতুন করে প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় চলতি বছরের জুন পর্যন্ত। এরপর আবারও পানি নিষ্কাশন, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিশোধন যোগ করে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে ১০০ কোটি টাকার ওপর। এরই মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ কোটি টাকার বিলও তুলে নিয়েছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান। জিওবি ফান্ডের চলমান এ কাজের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ‘দি বিল্ডার্স লিমিটেড’। এর মালিক বিতর্কিত ঠিকাদার জি কে শামীমের ব্যবসায়িক অংশীদার ফজলুল হক স্বপন। জি কে শামীম গ্রেপ্তার হওয়ার পর আলোচনায় আসেন তিনি। এরপর বেশ কিছুদিন গা-ঢাকা দেন এ ঠিকাদার। বর্তমানে তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা ডিএসসিসির আরও কয়েকটি প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। এসব বিষয় নিয়ে ডিএসসিসিও রয়েছে বিপাকে।
এ বিষয়ে জানতে ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. আবুল হাশেমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও তাকে পাওয়া যায়নি। একইভাবে সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী মো. রেজাউর রহমানের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনিও ধরেননি।
