অবকাঠামোগত উন্নয়নে পিছিয়ে দেশের বৃহত্তম বেনাপোল স্থলবন্দর। এতে নানা সংকটে দুই দেশের আমদানি-রপ্তানিকারকরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। দীর্ঘদিনেও যুগোপযোগী উন্নয়ন না হওয়ায় হতাশ সংশ্লিষ্টরা। উন্নয়নের জন্য বেনাপোল স্থলবন্দরকে নৌ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বারবার তাগিদের পরও সমস্যার সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ভারতের পেট্রাপোলের বনগাঁ মোটর শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশন ও বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশন।
১৯৭২ সালে বেনাপোল বন্দরের সঙ্গে ভারতের পেট্রাপোল বন্দরের বাণিজ্য শুরু। এই বন্দর থেকে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার দূরত্ব মাত্র ৮৪ কিলোমিটার। যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় প্রথম থেকেই এ পথে বাণিজ্যের আগ্রহ বেশি ব্যবসায়ীদের। তবে কয়েক বছর ধরে বেনাপোল বন্দরে নানা অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনায় ব্যাহত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য।
নিরাপত্তা সমস্যায় বারবার অগ্নিকা-ে পথে বসছেন ব্যবসায়ীরা। জায়গার অভাবে দিনের পর দিন পণ্যবোঝাই ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকায় লোকসানের পাল্লাও ভারী হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজারে আমদানি পণ্যের দামে।
ইতিমধ্যে বেনাপোল বন্দরের অব্যবস্থাপনায় ভারতের পেট্রাপোলের বনগাঁ মোটর শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশন আল্টিমেটাম দিয়েছে। দ্রুত পণ্য খালাসসহ অব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান না হলে চলতি মাসেই যেকোনো সময় পণ্য পরিবহন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে তারা।
বেনাপোল বন্দরের আমদানি-রপ্তানি সমিতির সহসভাপতি আমিনুল হক বলেন, করোনার কারণে এমনিতেই তিন মাস ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ ছিল। আবার আমদানি বন্ধ হলে বড় লোকসানে পড়বেন তারা। তবে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের এ দাবি সমর্থন করেন তিনি। সিঅ্যান্ডএফ স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান জানান, সুষ্ঠু বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বেনাপোল বন্দরে সমস্যার শেষ নেই। বন্দরের জায়গার অভাব আর যন্ত্রপাতি অকেজো থাকায় সময়মতো পণ্য খালাস নিতে পারছেন না। দিনের পর দিন খালাসের অপেক্ষায় ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকায় আমদানি খরচ বাড়ছে। তবে সন্তোষজনক সমাধানের মাধ্যমে বাণিজ্য সচল রাখতে আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি। বেনাপোল সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান সজন বলেন, ভারতীয়রা বন্দরের অব্যবস্থাপনায় ক্ষুব্ধ হয়ে বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দিয়েছেন, তার যৌক্তিকতা আছে। উন্নয়ন নিয়ে বেনাপোল বন্দরের কোনো মাথাব্যথা নেই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বন্দরের ধারণক্ষমতা ৪০ হাজার টন হলেও পণ্য থাকে সব সময় প্রায় ২ লাখ টন। অবহেলা-অযতেœ খোলা আকাশের নিচে মজুদ থাকায় এসব পণ্যের মান নষ্ট হচ্ছে। একাধিকবার বন্দর কর্তৃপক্ষকে অবকাঠামো উন্নয়নের দাবি জানানো হলেও আমলে নেওয়া হচ্ছে না।
সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে কয়েক বছরে কিছু উন্নয়ন হয়েছে। এই বন্দরে নতুন শেড নির্মাণ করা হয়েছে ১৪টি। ওজন স্কেল বসানো হয়েছে। সেই সঙ্গে জমি অধিগ্রহণ হয়েছে ১০ একর।
ভারত-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক মতিয়ার রহমান বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে বারবার বন্দর কর্তৃপক্ষকে বলা হলেও এ বিষয়ে তারা উদাসীন। এর খেসারত দিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। যেসব বন্দরে এখনো বাণিজ্য শুরু হয়নি, সেখানে উন্নয়ন ও প্রশাসনিক ব্যয় শুরু হয়েছে। কিন্তু বেনাপোল বন্দর দিয়ে দেশের ৭০ শতাংশ ব্যবসায়ীর বাণিজ্যের আগ্রহ থাকলেও যথাযথ উন্নয়ন নেই। এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব বুঝে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম করা উচিত।
ভারতের পেট্রাপোল বন্দরকে ২০০৮ সালে স্থলবন্দর ঘোষণার পর তা দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া হয়। এরপর সেখানে আধুনিক মানের অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। রয়েছে এসি ওয়্যারহাউজ, সিসি ক্যামেরা, সীমান্তরক্ষী বিএসএফের নিরাপত্তা। এর কোনোটাই নেই বেনাপোল বন্দরে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, উন্নয়ন বাড়াতে হলে বন্দরকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিতে হবে। বেনাপোল বন্দরের উপপরিচালক (প্রশাসন) আবদুল জলিল বলেন, বন্দরের বেশ কিছু অবকাঠামো উন্নয়ন হয়েছে। বাণিজ্য সম্প্রসারণে নতুন জায়গা অধিগ্রহণ, পণ্যাগার বাড়ানো, চুরি রোধে সিসি ক্যামেরা ও বন্দরের চারপাশে প্রাচীর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বন্দরকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি না, জানতে চাইলে উপপরিচালক (প্রশাসন) আবদুল জলিল বলেন, এটা সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়। দেশে চলমান ১২টি বন্দরের সবচেয়ে বড় আর বেশি রাজস্বদাতা বেনাপোল বন্দর। বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের পর বেনাপোলের অবস্থান।
বেনাপোল বন্দরে আমদানি পণ্য রক্ষণাবেক্ষণে ৩২টি ওয়্যারহাউজ, একটি ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড, একটি রপ্তানি টার্মিনাল ও একটি ভারতীয় চেসিস রাখার টার্মিনাল রয়েছে। তবে তা চাহিদার তুলনায় অনেক কম।
