রাজধানীর মিরপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন প্রয়াত অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। গতকাল সোমবার দুপুরে তাকে সেখানে সমাহিত করা হয়। এর আগে সকাল ৮টার কিছু পরে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) হিমঘর থেকে মাহবুবে আলমের মরদেহ রাজধানীর মিন্টো রোডে তার সরকারি বাসভবনে নেওয়া হয়। এ সময় পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়লে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এরপর বেলা ১১টা নাগাদ মাহবুবে আলমের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তার ৪৫ বছরের কর্মস্থল প্রিয় প্রাঙ্গণ সুপ্রিম কোর্টে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি প্রাঙ্গণে বিচারপতি, সহকর্মী, বন্ধু-স্বজন, শুভানুধ্যায়ী, আইনজীবীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের অগণিত মানুষের শেষ শ্রদ্ধায় সিক্ত হন তিনি। সেখানে তাকে ফুলেল শ্রদ্ধায় শেষ বিদায় জানানো হয়।
এদিকে প্রয়াত অ্যাটর্নি জেনারেলের সম্মানে গতকাল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে কোনো বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি।
সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বেলা সাড়ে ১১টায় মাহবুবে আলমের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজার নামাজ পরিচালনা করেন সুপ্রিম কোর্ট জামে মসজিদের খতিব আবু সালেহ মো. সলিমুল্লাহ। জানাজায় অংশ নেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, মৎস ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ. ম রেজাউল করিম, রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিরা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস, পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. বেনজির আহমেদ, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন, সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস কাজল প্রমুখ। এছাড়া অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের আইন কর্মকর্তারা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারাসহ বিপুলসংখ্যক আইনজীবী ও সাধারণ মানুষ জানাজায় অংশ নেন। জানাজার আগে সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন ও অ্যাটর্নি জেনারেলের ছেলে সুমন মাহবুব মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনায় সবার দোয়া কামনা করেন। জানাজা শেষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে মরহুমের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। এছাড়া প্রধান বিচারপতি, আইনমন্ত্রী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি মরহুমের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
শ্রদ্ধা জানাতে আসা সমবেতদের উদ্দেশে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘আইন পেশা ও আইনজীবীদের প্রতি দায়বদ্ধতা রক্ষার জন্য মাহবুবে আলম নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে গেছেন। সেই দায়বদ্ধতা রক্ষা করতে গিয়ে তিনি যদি কোনো ভুল করে থাকেন, তবে আপনারা তাকে ক্ষমা করে দেবেন।’ মাহবুবে আলমের ছেলে সুমন মাহবুব কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘কোনোভাবে যদি আমার বাবার দ্বারা কেউ কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেবেন।’
শ্রদ্ধা নিবেদনের পর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলমের কর্মময় জীবন আগামী দিনের আইনজীবীদের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হবে। তিনি তার কর্মগুণেই চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট আছে, কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নেই, এটা মেনে নিতে পারছি না। তার এই চলে যাওয়ায় সুপ্রিম কোর্ট তথা সারা দেশের আইন অঙ্গনে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘মাহবুবে আলমের আদর্শ ও পেশাদারিত্ব অনুসরণীয়। আইন পেশায়, আইনজীবীদের মধ্যে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’
সুপ্রিম কোর্টে জানাজা ও শেষ শ্রদ্ধা শেষে প্রয়াত মাহবুবে আলমের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে। সেখানে দুপুর ১টার কিছু আগে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
এদিকে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের মৃত্যুতে তার প্রতি সম্মান জানিয়ে গতকাল সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে কোনো বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। সকালে ভার্চুয়ালি আপিল বিভাগের বিচার কার্যক্রম শুরু হলে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেন, ‘আমরা শোকাহত। আমরা আজ (গতকাল) অ্যাটর্নি জেনারেলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে (আপিল বিভাগ) বসছি না। হাইকোর্ট বেঞ্চও বসবে না।’
গত রবিবার সন্ধ্যা ৭.২৫ মিনিটে সিএমএইচ-এর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বপালনকারী জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবীর মৃত্যুতে আইন অঙ্গনসহ সর্বত্র শোকের ছায়া নেমে আসে। পদাধিকারবলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যানও ছিলেন মাহবুবে আলম। গত ৪ সেপ্টেম্বর জ্বর নিয়ে ঢাকা সিএমএইচে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। সেখানে নমুনা পরীক্ষায় তার করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়ে। এরপর বেশ কিছুদিন ধরেই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন মাহবুবে আলম। অনেকটা সুস্থও হয়ে উঠেছিলেন। গত ১৮ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। তখন স্বজনরা চিকিৎসকের বরাতে অ্যাটর্নি জেনারেলের হৃদরোগজনিত সমস্যার কথা জানান। একপর্যায়ে তাকে হাসপাতালের কেবিন থেকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। কয়েকদিন আগে তার সর্বশেষ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আসে।
সুপ্রিম কোর্টে সংবিধানের পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনী মামলা পরিচালনায় হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন মাহবুবে আলম। এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচারেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ড মামলাতেও যুক্ত ছিলেন প্রথিতযশা এই আইনজীবী।
