নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনায় নয়জনকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা হয়েছে। এছাড়া তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে আরও একটি মামলা হয়েছে। গত রবিবার রাতে নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ (৩৫) বাদী হয়ে মামলা দুটি করেন। গৃহবধূকে নির্যাতনের ঘটনায় জড়িত অভিযোগে গতকাল রাত ১০টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর মধ্যে গত রবিবার মামলার আসামি দুজনকে আটক করে বেগমগঞ্জ থানা পুলিশ। অন্যদিকে গতকাল সোমবার ভোরে নারায়ণগঞ্জে অভিযান চালিয়ে গৃহবধূকে নির্যাতনের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত দেলোয়ারকে এবং গত রবিবার গভীর রাতে ঢাকা থেকে বেলালকে আটক করেন র্যাব সদস্যরা।
রবিবার গ্রেপ্তার দুজন হলো বেগমগঞ্জের একলাশপুর ইউনিয়নের জয়কৃষ্ণপুর গ্রামের হারিধন ভূঁইয়া বাড়ির শেখ আহমদ দুলালের ছেলে আবদুর রহিম (২২) ও একই এলাকার মোহর আলী মুন্সি বাড়ির মৃত আবদুর রহিমের ছেলে মো. রহমত উল্যাহ (৪১)। তাদের দুজনকে গতকাল আদালতের মাধ্যমে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই মামলায় তিন দিন করে মোট ছয় দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
গৃহবধূর করা মামলার আসামিরা হলো বাদল (২২), মো. রহিম (২০), আবুল কালাম (২২), ইস্রাফিল হোসেন (২২), সাজু (২১), সামছুদ্দিন ওরফে সুমন (৩৯), আবদুর রব ওরফে চৌধুরী মিয়া (৪৮), আরিফ (১৮) ও রহমত উল্যা (৪১)। এছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় আরও সাত-আটজনকে মামলার আসামি করা হয়েছে।
র্যাব-১১-এর কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল খন্দকার সাইফুর আলম জানান, গত রবিবার রাত ২টার দিকে ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে র্যাবের একটি দল বেলালকে এবং অন্য একটি দল রাত ৩টার পর নারায়ণগঞ্জের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে দেলোয়ারকে আটক করে। আটকের সময় দেলোয়ার একটি অস্ত্র বহন করছিল এবং তারা দুজনই পালানোর চেষ্টা করছিল বলেও জানান তিনি।
এদিকে দেলোয়ার বাহিনীর প্রধান দেলোয়ার, বাদল, কালাম ও আবদুর রহিমসহ পাঁচ তরুণ গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনা ঘটালেও আসামি তালিকায় নেই দেলোয়ারের নাম। এজাহারে বাদলকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। জানা গেছে, ঘটনার পর থেকে দেলোয়ার, বাদল, কালাম ও তাদের সহযোগীরা নির্যাতনের শিকার গৃহবধূর পরিবারকে কিছুদিন অবরুদ্ধ করে রাখে। একপর্যায়ে তার পুরো পরিবারকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করে।
তিন বছর আগে ওই নারীর বিয়ে হয়। স্বামী তাকে রেখে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এরপর থেকে তিনি বাবার বাড়িতে থাকতেন। দীর্ঘদিন স্বামীর সঙ্গে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। ২ সেপ্টেম্বর রাতে ওই নারীর স্বামী তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। রাত ১০টার দিকে দেলোয়ার তার লোকজন নিয়ে ওই নারীর ঘরে প্রবেশ করে অনৈতিক কাজের অভিযোগ এনে তাকে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে পিটিয়ে তাকে বিবস্ত্র করে ভিডিও করে।
গৃহবধূর করা মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, গত ২ সেপ্টেম্বর রাত ৯টার দিকে গৃহবধূর ঘরে ঢুকে তার স্বামীকে পাশের কক্ষে বেঁধে রেখে তাকে ধর্ষণের চেষ্টা করে বাদল ও তার বাহিনী। ওই সময় গৃহবধূ বাধা দিলে তারা তাকে বিবস্ত্র করে বেধড়ক মারধর ও মোবাইলে ভিডিও চিত্র ধারণ করে।
গৃহবধূর বাবা বলেন, ‘নির্যাতনের ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পাইনি। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’
বেগমগঞ্জ মডেল থানার ওসি হারুন অর রশীদ চৌধুরী বলেন, ‘পুলিশের পাঁচটি ইউনিট সাত ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে দুই আসামিকে আটক করে। এর মধ্যে রবিবার সন্ধ্যায় আবদুর রহিম এবং রাত ১১টায় রহমত উল্যাহকে আটক করে পুলিশ। বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ওই গৃহবধূকে সদর উপজেলার মাস্টারপাড়ার তার এক আত্মীয়ের বাসা থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।
রহিম-রহমত ৬ দিনের রিমান্ডে : গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনায় গ্রেপ্তার মো. আবদুর রহিম ও রহমত উল্যাহকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই মামলায় তিন দিন করে ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল বিকেলে নোয়াখালীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাসফিকুল হক এ আদেশ দেন। এদিন আদালতে রহিম ও রহমতের পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বেগমগঞ্জ থানার এসআই মোস্তাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে দুই আসামিকে আদালতে হাজির করে সাত দিন করে রিমান্ড আবেদন করা হয়। বিচারক ছয় দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।’
ঘটনার ৩২ দিন পর গত রবিবার দুপুরে গৃহবধূকে নির্যাতনের ভিডিও ফেইসবুকে ভাইরাল হয়। ওই ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, নির্যাতনকারীরা গৃহবধূর পোশাক কেড়ে নিয়ে তার বিরুদ্ধে কিছু একটা বলতে থাকে। তিনি প্রাণপণে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করেন এবং হামলাকারীদের ‘বাবা’ ডাকেন, তাদের পায়ে ধরেন। কিন্তু তারা ভিডিও ধারণ বন্ধ করেনি। বরং হামলাকারীদের একজন তার মুখমণ্ডলে লাথি মারে ও পা দিয়ে মুখসহ শরীর মাড়িয়ে দেয়। এরপর একটা লাঠি দিয়ে মাঝেমধ্যেই আঘাত করতে থাকে। এ সময় ঘটনাটি ফেইসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলে উল্লাস প্রকাশ করে ‘ফেইসবুক’ ‘ফেইসবুক’ বলে চেঁচায় আরেকজন।
