করোনাভাইরাস মোকাবিলায় লকডাউন নীতির ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সতর্কবার্তা দিয়ে শুরু হওয়া বৈশ্বিক আন্দোলনে নতুন হাওয়া লেগেছে। রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী সংগঠনসহ ব্যক্তিপর্যায়েও বিশ্বের নানা প্রান্তে শুরু হয়েছে লকডাউনবিরোধী বিক্ষোভ। সেই দলে এবার যোগ দিয়েছেন প্রায় ৬ হাজার বিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লকডাউন সমাজে বিরূপ প্রভাব রাখার পাশাপাশি মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ‘ভয়াবহ প্রভাব’ ফেলছে বলে অভিমত দিয়েছেন এই ৬ হাজার বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে, করোনাভাইরাস সুরক্ষা নীতিতে এই রোগে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, আর স্বাস্থ্যবানরা স্বাভাবিক জীবনযাপন চালিয়ে যাবেন।
তবে তাদের এই অভিমত নিয়ে বিজ্ঞানী মহলে মতভেদ রয়েছে, অন্যরা এর ঝুঁকির দিকগুলো নিয়ে সতর্ক করেছেন। বিশেষজ্ঞদের দ্বিতীয় দলের মতে, লকডাউন তুলে নিলে অসহায় জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া করোনাভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার কারণে আরও অনেকে ঝুঁকিতে থাকবেন।
তবে ‘গ্রেট ব্যারিংটন ডিক্লারেশন’ নামে পরিচিতি পাওয়া এই আন্দোলনে যুক্ত যুক্তরাজ্যের একদল চিকিৎসকের লেখা একটি চিঠিতেও এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে ভিন্নভাবে। তারা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠি লিখেছেন যে, কভিড-১৯ মোকাবিলার নীতিনির্ধারণীতে কভিডবহির্ভূত ক্ষতির ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
বিবিসি জানাচ্ছে, ‘গ্রেট ব্যারিংটন ডিক্লারেশন’ আন্দোলন শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এখন বিশ্বের প্রায় ৬ হাজার বিজ্ঞানী এবং ৫০ হাজার সাধারণ মানুষ এই ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছেন। তারা বলছেন, টিকা না আসা পর্যন্ত লকডাউন চালিয়ে গেলে ‘অপূরণীয় ক্ষতি হবে’ এবং সুবিধাবঞ্চিতরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাদের দাবি, লকডাউন না থাকলে মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ায় বৃদ্ধ ও অসুস্থরাসহ সবার ক্ষেত্রেই সংক্রমণের ঝুঁকি কমবে। এখন এটাই অনেক বেশি ‘সমবেদনামূলক’ নীতি হবে।
ওই ঘোষণায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণদের সুরক্ষায় বেশ কয়েকটি পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে কেয়ার-হোম কর্মীদের নিয়মিত করোনাভাইরাস পরীক্ষা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ঘরে নিত্যপণ্যসহ অন্যান্য জরুরি জিনিসপত্র পৌঁছে দেওয়া, নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মতো বিষয়গুলো রয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব লিডসের স্কুল অব মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক স্টেফেন গ্রিফিন বলেন, এটা ঠিক যে এর ‘উদ্দেশ্য ভালো’। তবে এই ঘোষণার নৈতিক, লজিস্টিক ও বৈজ্ঞানিক ত্রুটি রয়েছে। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিরা সব শ্রেণিতে রয়েছে এবং তাদের সঙ্গে ‘সমান আচরণ’ করাটাও তাদের প্রাপ্য। এ ছাড়া মৃদু উপসর্গ দেখা দেওয়ার পরেও অনেকের ক্ষেত্রে কয়েক মাস ধরে মূর্ছা যাওয়া ও হাত-পায়ের গিঁটে ব্যথা হওয়ার মতো সমস্যা থেকে যাচ্ছে।
ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের সেলুলার বায়োলোজি বিশেষজ্ঞ ডা. সিমন ক্লার্ক বলছেন, ‘হার্ড ইম্যুনিটি’ অর্জন সম্ভব কি না তাও স্পষ্ট নয়। রোগটির বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক, স্থায়ী ও সুরক্ষামূলক ইম্যুনিটি দরকার। অথচ আমরা এখনো জানি না একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সেরে ওঠার পর কতটা কার্যকর ও স্থায়ী ইম্যুনিটি তার মধ্যে তৈরি হবে।
