পুঁজিবাজারে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ বাড়াতে উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। গতকাল সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংকের পাশাপাশি সরকারি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছে এসইসি। বৈঠকে পুঁজিবাজারে ব্যাংকগুলোর নিজস্ব ও সাবসিডিয়ারির পোর্টফোলিও ছাড়াও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ তহবিলের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছে কমিশন।
গতকাল বিকেলে এসইসির চেয়ারম্যান প্রফেসর শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বে কমিশনের সঙ্গে সরকারি পাঁচ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থ কর্মকর্তারা (সিএফও) বৈঠক করেন। ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরা পুঁজিবাজারে আরও বিনিয়োগ বাড়াতে সম্মত হয়েছেন। নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে এসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মোহাম্মদ রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে জানান, আইসিবিসহ ব্যাংকগুলো নিজস্ব ও সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের পোর্টফোলিওর মাধ্যমে কীভাবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়ানো যায় তা নিয়ে কাজ করবে। এ ক্ষেত্রে কমিশনের কোনো সহযোগিতা লাগলে, দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় করবেন জনতা ব্যাংকের সিএফও এ কে এম শরীয়ত উল্লাহ। তিনি আগামী দুই-তিন মাস সমন্বয় করে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর পর্যায়ক্রমে অন্যরা এ দায়িত্ব পালন করবেন। সমন্বয়ের অংশ হিসেবে আগামী বুধবার ব্যাংকগুলোর বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
এর আগে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকের বিশেষ তহবিলের অগ্রগতি জানতে গত ২৯ জুন তালিকাভুক্ত ৩০ ব্যাংকের কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠায় এসইসি। তবে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজারে ব্যাংকের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও তাতে খুব কম সাড়া মিলছে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, দেশের ৬০টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ সুবিধায় ১২ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনের সুযোগ দেওয়া হলেও অধিকাংশ ব্যাংকই তা করেনি। তফসিলি ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বিল ও বন্ড রেপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সর্বোচ্চ ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ তহবিল গঠনের সুযোগ থাকলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫টি ব্যাংক তা করেছে।
৭ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫টি ব্যাংকের বিশেষ তহবিলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। অধিকাংশ ব্যাংকই নিজেদের অর্থে তহবিল গঠন করেছে। আবার তহবিল গঠন করলেও পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অতিমাত্রায় সতর্কতা অবলম্বন করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে ওই বিশেষ তহবিল থেকে বিনিয়োগ হয়েছে মাত্র ৪৮৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রজ্ঞাপনের সুবিধা নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা ও অগ্রণী ব্যাংক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। এ তিনটি ব্যাংক ২০০ কোটি করে ৬০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করলেও রূপালী ব্যাংক কোনো তহবিল গঠন করেনি। এ ছাড়া তারল্যসংকটে থাকায় আইসিবি পুঁজিবাজারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
একসময়ে পুঁজিবাজারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান ভূমিকা ছিল। কিন্তু ২০১০-১১ সালের ধসের পর বিনিয়োগ সীমা কমিয়ে আনায় ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করেছে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের অংশগ্রহণ। পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করে গত কয়েক বছরে ব্যাংকগুলো বড় অঙ্কের লোকসান করেছে। এতে সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর নিট মুনাফায় প্রভাব পড়েছে। ব্যাংকের বিনিয়োগ কমে যাওয়ায় পুরো বাজারের লেনদেনে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ কমে গেছে। এতে করে দেশের পুঁজিবাজার হয়ে পড়েছে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীনির্ভর। মোট লেনদেনের প্রায় ৯০ শতাংশই আসছে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে। এতে বাজারের স্থিতিশীলতা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে।
এদিকে পুঁজিবাজারে কিছুদিন ধরেই অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বীমা খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতার কারণে অন্যান্য খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গতকাল পুঁজিবাজারে বেশিরভাগ শেয়ারের দরপতনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্যসূচক ৫৮ পয়েন্ট কমে ৪৮৫৮ পয়েন্টে নেমে এসেছে। যদিও আগের দিনের তুলনায় লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে।
গতকাল বীমা, মিউচুয়াল ফান্ড ও প্রকৌশল ছাড়া অন্য সব খাতে দরপতন হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ডে এসইসির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সংস্কারের আশ্বাসে গতকাল খাতটির বাজার মূলধন সাড়ে ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছে। আর সাধারণ বীমা খাতের শেয়ার দর বেড়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ। গতকাল ডিএসইর মোট লেনদেনের ৪২ শতাংশ এসেছে বীমা খাত থেকে। এর মধ্যে সাধারণ বীমায় ৩৭ শতাংশ লেনদেন হয়েছে।
