এইচএসসিতে অটোপাস

বিদেশে শিক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে উদ্বেগ

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২০, ০৩:২৩ এএম

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা বাতিল করে জেএসসি ও এসএসসির ফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কিন্তু দুই স্তরের ফল নিয়ে কোন পদ্ধতিতে এইচএসসির গ্রেড বা ফল নির্ধারণ করা হবে এবং তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বা বিদেশে শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনো অসুবিধা হবে কি-না তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। তাছাড়া এসব শিক্ষার্থী চাকরিজীবনে বৈষম্যের শিকার হবে কি-না, এ নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।

এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখনো ঠিক কোন পদ্ধতিতে ফল দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করা হয়নি। এটা নির্ধারণে ইতিমধ্যে পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে কমিটি কাজ শুরু করবে বলে জানা গেছে। কমিটির সদস্যরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের কিছু নেই। এ নিয়ে কোনো অসুবিধা হবে না। গ্রেডিং কীভাবে নির্ধারণ করা হবে তা নিয়ে প্রত্যেকে নিজ নিজ প্রস্তাবনা তৈরি করছেন।

অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা বলছেন, জেএসসি ও এসএসসির ফলাফলের গড়ের ভিত্তিতে এইচএসসির ফল নির্ধারণের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা তৈরি হতে পারে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিকেলে পড়তে চাইলে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিতের মতো কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে ন্যূনতম গ্রেড প্রয়োজন হয়। তাই পরীক্ষা না নিয়ে জেএসসি ও এসএসসির ফলের ওপর ভিত্তি করে এইচএসসির ফল দেওয়া হলে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিতে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা থেকেই যায়। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের দুই পরীক্ষায় যারা জিপিএ-৫ পেয়েছে তাদের চূড়ান্ত গড় ফল দেওয়া সহজ হবে। এ ধরনের শিক্ষার্থীদের জিপিএ-৫ দিলে আক্ষেপ হবে না। কিন্তু যারা এর নিচে বা কম জিপিএ পেয়েছিল, তাদের গড় কীভাবে তৈরি করা হবে সেটা বড় প্রশ্ন। কেননা অনেকেই ভালো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার লক্ষ্যে এইচএসসি পর্যায়ে ভালো প্রস্তুতি নিয়ে থাকে। এখন ‘গড়’ ফলের শিকার হতে পারে তারা। আবার জেএসসি আর এসএসসি একইরকম পরীক্ষা নয়। জেএসসিতে কোনো বিভাগ নেই। সেটার সঙ্গে এইচএসসির কোনো তুলনাই হতে পারে না। জেএসসি থেকে শিক্ষার্থীকে কেবল বাংলা ও ইংরেজি বাদে অন্য বিষয়ে মূল্যায়নের সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে বিষয়ভিত্তিক গ্রেড বা নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য ও সংকট তৈরি হতে পারে।

সৈয়দ ইশতিয়াক নামে এক অভিভাবক বলেন, “ইংরেজি মাধ্যম স্কুল বা কলেজ যে পন্থা নিয়েছিল সেটা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। তাতে ‘প্রেডিকটেড রেজাল্ট’ উল্লেখ থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশ যে ফল দিচ্ছে সেটাতে তো ‘প্রেডিকটেড’ লেখা যাবে না। প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষার্থীর ট্রান্সক্রিপ্টে তাহলে কী লেখা হবে, ‘আরোপিত’ না ‘অটোপাস’। যে পন্থা নেওয়া হয়েছে সেটা বৈজ্ঞানিক নয়।” তিনি আরও বলেন, ‘এসব শিক্ষার্থীর চাকরিজীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা অনেকখানি। এগুলোর সমাধান কীভাবে করবে সরকার, তা জানা প্রয়োজন।’

এ প্রসঙ্গে পরামর্শক কমিটির সদস্য ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক গতকাল রবিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঠিক কোন নীতি অনুসরণ করে ফলাফল নির্ধারিত হবে সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলেও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের কাজ করা হচ্ছে। কীভাবে জেএসসি পরীক্ষা ও এসএসসি পরীক্ষার বিষয়গুলো যুক্ত করে এইচএসসির বিষয়গুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যায়, তা নিয়ে পরামর্শক কমিটির পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব টেকনিক্যাল কমিটিও কাজ করছে। এসএসসি থেকে এইচএসসিতে যেসব শিক্ষার্থী বিভাগ পরিবর্তন করেছে, তাদের বিষয়টিও পর্যালোচনা করছে কমিটি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এমন একটা পদ্ধতিতে ফল চূড়ান্ত করা হবে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে কোনো অসুবিধা না হয়। এছাড়া বিদেশে পড়তে গেলেও কোনো অসুবিধা হবে না। কারণ বিদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এইচএসসির রেজাল্ট দেখে না। তারা দেখে শিক্ষার্থী টুয়েলভ গ্রেড পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে কি-না। এরপর শিক্ষার্থীর মেধা যাচাইয়ে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব পদ্ধতিই অবলম্বন করে।’

কীভাবে কোন কৌশলে ফল চূড়ান্ত হবে তা নিয়ে আগামীকাল থেকে পরামর্শক কমিটি বৈঠক শুরু করবে। এ বিষয়ে কমিটির প্রধান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাজমুল হক খান বলেন, ‘আমরা কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। বসলেই একটা পথ বের হবে। এ বিষয়ে উদ্বেগের কিছু নেই। সরকার অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে কাজ করছে।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে এ কমিটিতে ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানও থাকবেন। এ বিশেষজ্ঞ কমিটি নভেম্বর মাসেই তাদের পরামর্শ বা মতামত দেবে। এরপর ডিসেম্বরে এইচএসসির মূল্যায়নের ফল প্রকাশ করা হবে।

এদিকে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী মনে করেন, ‘বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত।’

বিদেশে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিদেশে পড়তে যান খুব কম সংখ্যক। তাদেরও চিন্তার কিছু নেই। কেননা সারা বিশ্বেই একই অবস্থা। ইতিমধ্যে গত জুনে ‘এ’ লেভেল (উচ্চ মাধ্যমিক) পরীক্ষার ফল একই প্রক্রিয়ায় হয়েছে। তাই এ বিষয়টি বিশ্বের কাছে একমাত্র দৃষ্টান্ত নয়। অন্যান্য দেশও তাই করেছে। তাছাড়া বিদেশে কেউ পড়তে যেতে চাইলে তাকে আইইএলটিএস, স্যাট, জিআরই, টোফেল ইত্যাদি পরীক্ষা দিতে হবে। সুতরাং মূল্যায়ন ছাড়া কেউ থাকবে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত