করোনার তাণ্ডবের মধ্যেও আরব আমিরাতে শুরু হচ্ছে ভ্রমণ ভিসার ফ্লাইট। তবে ওই দেশে শ্রমিক পাঠানোর বিষয়টি এখনো শুরু হয়নি। এ নিয়ে দুই দেশের কর্র্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, ১৫ অক্টোবর সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট দুবাইয়ের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। তাছাড়া সাত মাস বন্ধ থাকার পর ২০ অক্টোবর সিঙ্গাপুর থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশে উড়াল দেবে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইট। বিমান এয়ারলাইনসের ফ্লাইটও সিঙ্গাপুরে চলাচল করবে। এদিকে দুবাই থেকে ১০৪ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর ঘটনায় দায়িত্ব পালনে গাফিলতির দায়ে ফ্লাই দুবাইকে জরিমানা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত মার্চ থেকে করোনার কারণে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও কার্গো চলাচল সচল ছিল। চিকিৎসাসামগ্রী আদান-প্রদানের প্রয়োজনে ঢাকায় গড়ে প্রতিদিনই কর্গো ও স্পেশাল প্যাসেঞ্জার ফ্লাইট চলাচল করেছে। একপর্যায়ে তা আরও ব্যাপকতা পায়। করোনার উৎপত্তিস্থল চীনের সঙ্গে ঢাকা থেকে বেসরকারি ইউএস বাংলার কার্গো ও শিডিউল ফ্লাইট নিয়মিত অপারেট করা হয়। গত এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে ছিল স্পেশাল ফ্লাইটের ওঠানামা। এ সময়ে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজসহ বিশ্বের সব নামিদামি এয়ারলাইনসের স্পেশাল ফ্লাইট বিমানবন্দরে আসা-যাওয়া করে। ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিক ও অন্য নাগরিকরা নিজ দেশের এয়ারলাইনস ব্যবহার করে গন্তব্যে ফিরে যান। এমনকি রাশিয়ার বিখ্যাত অ্যারোফ্ল্যাট এয়ারের ফ্লাইট ঢাকায় এনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা দল বেঁধে বাংলাদেশ ছেড়ে যায়। আসে কোরিয়া ও জাপান এয়ারলাইনসের ফ্লাইটও। এরপর গত ১ জুন থেকে অভ্যন্তরীণ এবং ১৬ জুন থেকে আন্তর্জাতিক রুট খুলে দেয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ (বেবিচক)।
বেবিচক কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশে ‘লকডাউনের’ মধ্যেও আন্তর্জাতিক রীতিনীতি মেনে আইকাও গাইড লাইন অনুযায়ী সীমিত আকারে ফ্লাইট চালু করা হয়। এজন্য গত মে মাসে ঢাকায় হয়েছে আইকাওর সঙ্গে যুক্ত ব্রিফিং। এতে করোনা পরিস্থিতির মধ্যে ফের বিমান চলাচলের বিষয়ে আলোচনা করেন এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের সিভিল এভিয়েশন খাতের শীর্ষ ব্যক্তিরা। স্বাস্থ্যবিধি মেনে বর্তমানে চলছে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কিছু ফ্লাইট। শিগগির চালু হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশের ফ্লাইট। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফ্লাইট চলাচল শুরু করতে প্রথমবারের মতো চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। ঢাকা-সিলেট হয়ে লন্ডনের ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গেও ফ্লাইট চলাচল শুরু হয়েছে।
বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাড়াতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। সৌদি আরবে আরও ফ্লাইট বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। দুবাইয়ে টুরিস্ট ভিসার ফ্লাইট চলাচল শুরু হচ্ছে। সিঙ্গাপুরের ফ্লাইট চলাচলও শুরু হবে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট দিন দিন বাড়বে বলে আশা করছি।’
বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভ্রমণপিপাসুদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের দরজা। এখন থেকে টুরিস্ট বা ভিজিট ভিসায় দুবাই যেতে পারবেন যে কেউ। আর এ সুযোগে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনস বিমানও এগিয়ে এসেছে যাত্রীসেবায়। এখন থেকে বিমানে যেকোনো ধরনের ভিসা নিয়ে যাত্রীরা দুবাই যেতে পারবেন। তবে বর্তমান করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে দুবাইগামীদের দেশটির সরকারের কিছু নিয়মকানুন মানতে হবে। যেমন ভিজিট, ট্যুরিস্ট, রেসিডেন্ট ও ট্রানজিট ভিসাধারীদের সরকার নির্ধারিত পিসিআর ল্যাব থেকে যাত্রা শুরুর আগের ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে কভিড টেস্ট করিয়ে ‘কভিড-১৯ নেগেটিভ’ সার্টিফিকেট নিতে হবে এবং সঙ্গে আটটি প্রিন্টেড কপি রাখতে হবে। কভিড সার্টিফিকেটটি ইংরেজি বা আরবি ভাষায় হতে হবে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, দুবাই যাওয়ার আগে একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক ফরম পূরণ করতে হবে এবং ‘কভিড-১৯ ডিএক্সবি স্মার্ট অ্যাপ’ ডাউনলোড করতে হবে। বাংলাদেশ থেকে সবাইকে হেলথ ইন্স্যুরেন্স নিতে হবে। যাত্রীদের দুবাই এয়ারপোর্টে পৌঁছে ইমিগ্রেশনের আগেই পিসিআর টেস্ট করানো হবে। টেস্টের রেজাল্ট দেওয়ার আগপর্যন্ত যাত্রীদের সেলফ আইসোলেটেড অবস্থায় থাকতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে প্রতি সপ্তাহে বিমানের সাতটি ফ্লাইট যাচ্ছে দুবাই। তাছাড়া আরও আছে ফ্লাই দুবাই, এয়ার অ্যারাবিয়ান, আমিরাত ও ইতিহাদ।
২০ অক্টোবর শুরু হচ্ছে সিঙ্গাপুরের ফ্লাইট : করোনায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ২০ অক্টোবর থেকে ঢাকার উদ্দেশে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের ফ্লাইট চলাচল শুরু হবে। প্রথম ধাপে সপ্তাহে দুটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করবে এয়ারলাইনসটি। গত শুক্রবার সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে এ তথ্য জানানো হয়। তাছাড়া বিমানের ফ্লাইটও চলাচল করবে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, করোনা মহামারীর মধ্যে চলাচল বন্ধের পর সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের প্রথম ফ্লাইটটি ২০ অক্টোবর রাত ৮টা ৩৫ মিনিটে সিঙ্গাপুর থেকে ছেড়ে এসে ঢাকায় রাত ১০টা ৪০ মিনিটে অবতরণ করবে। এরপর ঢাকা থেকে যাত্রী নিয়ে ফ্লাইটটি ছাড়বে রাত ১১টা ৫৫ মিনিটে এবং সিঙ্গাপুরে পৌঁছবে পরের দিন স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৫ মিনিটে। সিঙ্গাপুর যেতে বাংলাদেশ থেকে করোনা নেগেটিভ সার্টিফিকেট লাগবে না। তবে সিঙ্গাপুর পৌঁছানোর পর করোনা পরীক্ষা করা হবে। প্রত্যেক যাত্রীকে বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ১৪ দিনের জন্য হোটেলে কোয়ারেন্টাইনে যেতে হবে। এজন্য ২ হাজার ২০০ সিঙ্গাপুরি ডলার (বাংলাদেশি ১ লাখ ৩৫ হাজার ৫৪২ টাকা) খরচ হতে পারে, যা যাত্রীকে দিতে হবে। ওয়ার্ক পারমিট বা দীর্ঘস্থায়ী ভিসাধারীদের জন্য দেশটির জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে। আর শিক্ষার্থী হলে দেখাতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতিপত্র।
১০৪ যাত্রীকে ফেরত পাঠানোয় ফ্লাই দুবাইকে জরিমানা : দুবাই থেকে ১০৪ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানোর ঘটনায় দায়িত্ব পালনে গাফিলতির দায়ে ফ্লাই দুবাইকে জরিমানা করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) সরকারের ইমিগ্রেশন পলিসি না মেনেই তাদের বোর্ডিং পাস দিয়ে দুবাই নিয়ে যায় ফ্লাই দুবাই। এতে সবাইকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায় দুবাই ইমিগ্রেশন পুলিশ। এ গাফিলতির কারণে সব যাত্রীর টিকিটের টাকা ফেরতসহ আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ অতিরিক্ত ৩ হাজার ৫০০ টাকা দেবে বিমান সংস্থাটি। গত রবিবার রাতে ফ্লাই দুবাইকে জরিমানা করেন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ম্যাজিস্ট্রেট শেখ হাফিজুর রহমান। গত ৯ অক্টোবর ফ্লাই দুবাইয়ের দুটি ফ্লাইটে ঢাকা থেকে ৫১ জন এবং চট্টগ্রাম থেকে ৫৩ জন যাত্রী দুবাই যায়। তাদের গত রবিবার দুবাই বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠানো হয়। তাদের দুবাই থেকে সড়কপথে ইউএইর আল আইন ও আবুধাবিতে যাওয়ার কথা ছিল। তবে শতাধিক যাত্রী ও এয়ারলাইনসের সঙ্গে কথা বলে ম্যাজিস্ট্রেট শেখ হাফিজুর রহমান নিশ্চিত হন, ফেরত আসার জন্য ফ্লাই দুবাইয়ের গাফিলতি দায়ী। ইউএইর ইমিগ্রেশন পলিসি অনুসরণ করলে যাত্রীদের দুবাইগামী ফ্লাইটে বোর্ডিং করানোর কোনো সুযোগ নেই। গত ৮ অক্টোবর ফ্লাইট থাকলেও এক দিন দেরি করে ৯ অক্টোবর ঢাকা ছাড়ে ফ্লাই দুবাই। দুবাই বিমানবন্দরে পৌঁছার পর অনুমতিপত্র না থাকায় পুলিশ তাদের আটক করে। দুদিন পর তাদের দেশে পাঠানো হয়। প্রবাসীরা ৭৪ ঘণ্টা দুবাই বিমানবন্দরে অবস্থান করেন। এ সময় তাদের খাবারও দেওয়া হয়নি।
